এরপর সে দ্রুত সবার প্রতি নজর বুলিয়ে বলে–“একে অপরকে দেখে বল, তোমাদের মধ্যে কে অনুপস্থিত।”
সকলে একে অপরের দিকে চায়। কিন্তু কেউ অনুপস্থিত আছে কিনা তা খেয়াল করে না। কয়েকটি চোখ খুদ্দামকে খোঁজে। সে গত তিন-চারদিন ধরে অনুপস্থিত ছিল। সকলে অবাক হয়ে দেখে যে, খুদ্দাম সেখানে বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। এতে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। এরপর অনেকগুলো কণ্ঠ একসাথে বলে ওঠে যে, তাদের কেউ অনুপস্থিত নেই।
ইরানী সৈন্য চলে গেলে যারা খুদ্দামের গায়েব হওয়ার কথা জানত তারা এক এক করে তার কাছে জিজ্ঞাসা করতে থাকে যে, সে কোথায় চলে গিয়েছিল।
খুদ্দাম সকল প্রশ্নকারীকে একই জবাব দেয়–“আমি শিমুরের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলাম।”
খুদ্দামের পিতা সবাইকে জানায় যে, গতকাল রাতের শেষ প্রহরে খুদ্দাম বাড়ীতে ফেরে।
সেদিন বাগিচায় কাজ করতে করতে খুদ্দাম আর জোহরা সকলের চোখ ফাকি দিয়ে হঠাৎ সরে পড়ে। তারা এমন স্থানে গিয়ে বসে তাদের দেখার সম্ভাবনা ছিল না। জোহরা আনন্দে দিশেহারা হয়ে যেতে থাকে। সে বারবার গভীর আবেগে খুদ্দামের নাম ধরে ডাকছিল।
সে হর্ষ-তরঙ্গায়িত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে–“এটা কিভাবে ঘটল খুদ্দাম? এটা হল কিভাবে?”
খুদ্দাম বলে–“এটাকে আল্লাহর সাহায্য বলো জোহরা। এখন আর বলতে পারবে না যে, আল্লাহ সাহায্য করে না।”
জোহরা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়, যেন সে জীবনে কখনো হাসেনি এবং তার ঠোঁট মুচকি হাসি কাকে বলে তাও চেনে না। খুদ্দামের চেহারায় গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিঞ্চিত চিন্তার স্বরে বলে–“সত্য করে বল খুদ্দাম! শিমুরের ঘাতক তুমি নও তো?…শুনেছি মরু ডাকাতের এক বিরাট দল রাতে শিমুরের ফাঁড়িতে ঐ সময় গেরিলা হামলা চালায় যখন সে মদ আর নৃত্য-গীতে মাতাল হয়ে গিয়েছিল। এমন তো নয় যে, তুমি ঐ ডাকাতদের সাথে মিলে…।”
খুদ্দামের আকস্মিক অট্টহাসি বিনতে সাউদের কথা শেষ করতে দেয় না। সে হাসতেই থাকে এবং জোহরার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়। এতে জোহরার শরীরে এমন উষ্ণ শিহরণ সৃষ্টি হয় যে, খুদ্দামকে সে কি বলতেছিল তা বেমালুল ভুলে যায়।
***
খুদ্দাম অট্টহাসির মাঝে একটি রহস্য লুকিয়ে ফেলে। জোহরাকে গভীর আবেগে ঠেলে দিয়ে স্পর্শকাতর রহস্যটি তার মনের মুকুর ও দৃষ্টিপথ হতে সরিয়ে নেয়। খুদ্দাম অসাধারণ সাহসী, আত্মমর্যাদাশীল এবং দৈহিক দিক দিয়েও শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা হওয়ায় জোহরার নারী হৃদয়ে এই আতঙ্ক দোলা দেয় যে, প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে শিমুরকে হত্যার জন্য দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্রের সাথে হাত মেলায়নি তো! সেকালে মরু ডাকাতরা বড়ই দুঃসাহসী হত। ইরানী সৈন্যদের মত তারা বিভিন্ন স্থানে ঝড়-তুফান উঠাত। পথচারীদের সম্পদ লুট করাই ছিল তাদের পেশা। ফৌজের সাথেও তারা লিপ্ত হত এবং যুদ্ধ করতে করতে এমনভাবে গায়েব হয়ে যেত, যেন মরুভূমির বালু এবং টিলা তাদের আস্ত গিলে ফেলেছে।
জোহরা কিছুদিন ধরে গভীরভাবে লক্ষ্য করে যে, তাদের এলাকায় কয়েকজন অপরিচিত লোক এসে নিজেদেরকে অনেক দূরের মুসাফির পরিচয় দিয়ে কোন এক মুসলমানের বাড়ীতে রাতে অবস্থান করে এবং অতি প্রত্যুষে উঠে চলে যায়। তারা যখনই আসে খুদ্দাম এবং তার মত আরো ৩/৪জন যুবক তাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করে। মুসাফিররা তাদের এলাকা ছেড়ে চলে গেলে এই যুবক গ্রুপটিকে ভীষণ তৎপর দেখা যায়।
জোহরা আরো লক্ষ্য করে যে, ভীন দেশীরা চলে গেলে মুসলমানদের বয়োবৃদ্ধ নেতাকে গভীর চিন্তামগ্ন এবং কানাকানি করে কথা বলতে দেখা যায়। এরপর যখন মুসলমানরা নিজেদের ক্ষেত-খামার, বাগ-বাগিচাসহ অন্যান্য কাজে লিপ্ত হয় তখন তাদের মাঝে ঘুরাফেরা করে এবং উপদেশ দানের ভাষায় কথা বলে।
মুরুব্বী মানুষের মাঝে এই জাতীয় কথা বলে–“স্বীয় ধর্মচ্যুত হবে না। যে মহান খোদার প্রেরিত রাসূলের আদেশ মান্য করে, তোমরা চল তাঁর সাহায্য আসছে।… অগ্নিপূজারীরা শক্তিশালী, খুব বলবান; কিন্তু তাই বলে তারা আল্লাহর চেয়ে অধিক শক্তিশালী নয়।…দৃঢ় অবিচল থাকবে।… জালিমের দিন শেষ প্রায়।… মজলুমদের সাথে আল্লাহ্ আছেন।”
“কবে?…সাহায্য কবে নাগাদ আসবে শুনি?”–একদিন এক ব্যক্তি ঝাঁঝালো কণ্ঠে উপদেশদাতা মুরুব্বীর কাছে জানতে চায়–“আপনি তো এটাই চান যে, আমরা মুখ বুজে শত জুলুম-নির্যাতন সহ্য করতে থাকি এবং আপনার আশ্বাস বাণী শুনে ব্যথা-বেদনার কথা ভুলে যাই। আজ যদি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেই যে, আমরা মুসলমান নই; ইসলামের সাথে আমাদের কোনই সম্পর্ক নেই, তাহলে এই দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে সাথে সাথে মুক্ত হয়ে যাব।… আল্লাহর সাহায্য আসছে…কবে নাগাদ আসছে?” “তাকে বল” মুরুব্বী তার পাশে কর্মরত আরেক লোককে বলেন “তাকে ভালভাবে বুঝাও… তাকে জানাও যে, অত্র এলাকায় শত বছর পূর্বের যে সমস্ত জরাজীর্ণ ও বিধ্বস্ত প্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহ তা‘য়ালার পরাশক্তির বহিঃপ্রকাশ এর মধ্য হতে ঘটবে এবং তা জালিমের শক্তি নিশ্চিন্ন করে দেবে।” বয়োবৃদ্ধ লোকটির অন্তরে ঐ রহস্য লুক্কায়িত ছিল, যা খুদ্দাম জোহরা বিনতে সাউদ থেকে গোপন রেখেছিল।
ইরানী কমান্ডার শিমুরের সেনাচৌকিতে যে দুর্ধর্ষ গেরিলা হামলা চালানো হয় তা নতুন কোন ঘটনা ছিল না। অবশ্য উবলা এলাকায় এমন ঘটনা এই প্রথম। এ ফাঁড়িটি বসতি এলাকার সন্নিকটে থাকায় মুসলমানরা আক্রমণের খবর জানতে পারে। এই ঘটনার পরে মুসলমানদের বাড়ী-ঘর তল্লাশী না করা হলে হয়ত এ ঘটনাও তাদের অজানা থেকে যেত। ইরাকের সীমান্ত এলাকায় দ্বিতীয়, তৃতীয় রাতে কোন না কোন ফাঁড়িতে নিয়মিত গেরিলা হামলা চলতে থাকে। হামলাকারীরা মুহূর্তে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও রক্তপাত ঘটিয়ে সেখানে যা কিছু পেত তা নিয়ে উধাও হয়ে যেত।
