অতঃপর সন্দেহ বিশ্বাসে রূপ নেয়। তার পিতার সম্ভাবনাই সকলের কাছে একমাত্র সত্য বলে মনে হয়। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু জোহরা। খুদ্দামের সাথে তার সর্বশেষ যে আলোচনা হয়েছিল তার আলোকে সে এই বিশ্বাসই লালন করে যে, খুদ্দামকে কেউ গায়েব করেনি; বরং সে নিজেই কোথাও চলে গেছে। কেননা, সে তাকে বলেছিল, কয়েকদিনের জন্য সে লাপাত্তা হয়ে যাবে। জোহরা এ রহস্য কারো কাছে ফাঁস করে না; বরং উল্টো সে এ কথার উপর জোর দেয় যে, ইরানীরাই খুদ্দামকে গায়েব করে দিয়েছে। জোহরা প্রাণের সখীর কাছে পর্যন্ত মুখ খুলে না। বরং তাকে এ কথা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, সে আগামী দু’তিন দিন খুদ্দামের অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে সে না এলে দরিয়ায় ডুবে মরবে।
***
তিন-চার দিন পরের ঘটনা। এক রাতে শিমুর নিকটস্থ একটি ফাঁড়িতে বসে মনের আনন্দে দুই উঠতি তরুনীর চোখ ধাঁধানের নৃত্য দেখছিল। সুন্দর, সুশ্রী এবং আকর্ষণীয় তরুণীদের এমন নাচ-গান ইরানের শাহী দরবারের সাধারণ ব্যাপার ছিল। এদেরকে নর্তকী বলা হত। বিবস্ত্র প্রায় পোশাকে সাজানো হত তাদের। পাতলা এবং সংক্ষিপ্ত পোশাকে তাদের যৌনাঙ্গগুলো দর্শকের চোখে মাদকতা জাগাত। প্রতিটি পুরুষের পৌরুষ চাঙ্গা ও উৎকীর্ণ হয়ে উঠত।
শিমুর শাহী বংশের লোক ছিল। ঘটনার দিন রাতে সিপাহীদের চিত্তবিনোদনের জন্য সে এই নর্তকী দ্বয়কে ভাড়া করে এনেছিল। মদ পানের পর্ব চলতে থাকে। সিপাহীরা নর্তকী দ্বয়কে চিৎকার করে করে সাবাস দিচ্ছিল। নেশায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দু’তিন সিপাহী মঞ্চে উঠে নর্তকীদের সাথে নাচতে শুরু করে দেয়। শিমুরের নির্দেশে অন্য সিপাহীরা এই মাতাল সিপাহীদের ধরে ফাঁড়ির বাইরে ছেড়ে দিয়ে আসে।
ছোট আকারের এই ফাঁড়িটি একটি মিনি কেল্লা ছিল। কিন্তু কেল্লার দ্বার রাতেও উন্মুক্ত থাকত। অপর কোন শত্রুর আক্রমণের আশংকা তাদের ছিল না। তারা নিজেদেরকে হামলার ঊর্ধ্বে জ্ঞান করত। একদিকে নৃত্য-গীত যখন তুঙ্গে পৌঁছে এবং অপরদিকে মদের নেশা শিমুর ও তার সাথীদের চেতনা লোপ করতে থাকে, তখন শা শা আওয়াজ তুলে বিদ্যুৎ বেগে একটি তীর এসে শিমুরের গর্দানের এক দিক দিয়ে ঢুকে অপর দিকে তার ফলা বেরিয়ে যায়। শিমুর দুই হাত গলায় চেপে ধরে উঠে পড়ে। সিপাহীদের মাঝে হুলস্থূল আর ছুটোছুটি পড়ে যায়। যে যেখানে ছিল সবাই শিমুরের পাশে এসে জমা হয়। আবার তিন চারটি তীর ছুটে আসে। সাথে সাথে তিন-চারবার আর্তচিৎকারও ওঠে। যারা তীরবিদ্ধ হয় তারা লুটিয়ে পড়ে। এরপর ইরানীদের মাঝে কেয়ামতের বিভীষিকা সৃষ্টি হয়। অস্ত্রহীন থাকায় তারা মোকাবিলার মোটেও সুযোগ পায় না। প্রাণ রক্ষারও সুযোগ তাদের ছিল না। তীব্র আক্রমণে তারা শুধু আহত আর নিহত হতে থাকে। যারা পালিয়ে দরজার দিকে ছুটে গিয়েছিল তারা দরজাতেই মৃত্যুর শিকার হয়।
ফাঁড়ির সিপাহীদের সাহায্যের সকল পথ রুদ্ধ ছিল। কারো পক্ষে দরজা গলিয়ে বাইরে বের হওয়া সম্ভব হয় না। অস্ত্রাগার হতে অস্ত্র আনার সুযোগও তারা পায় না।
এটি একটি মরুঝড় ছিল, যা হঠাৎ উত্থিত হয়ে মুহূর্তে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়। প্রস্থানকালে ফাঁড়িস্থ সকল মালামাল সাথে নিয়ে যায়। শুধু রয়ে যায় লাশের সারি, অসংখ্য আহত এবং কতক অক্ষত সিপাহী। যারা প্রলয়ের সময় জীবন বাঁচাতে লাশ আর আহতদের সাথে মাটি কামড়ে পড়েছিল।
॥ তিন ॥
পরের প্রভাত। স্নিগ্ধ সকাল। প্রাত্যহিক কাজ শেষে মুসলমানরা অন্যান্য দিনের মত নিজ নিজ ক্ষেত বা বাগিচায় যাবার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এরই মধ্যে ইরানী সৈন্য এসে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। অজ্ঞাত হামলাকারীরা হামলা শেষে যখন নিরাপদে ফিরে যায় তখন অন্যান্য ফাঁড়ির সৈন্যরা আক্রান্ত ফাঁড়ি সম্পর্কে অবগত হয়। কিন্তু ততক্ষণে অজ্ঞাত শত্রু বহুদূরে চলে যায়। কাছে মুসলিম বসতি থাকায় প্রধান সন্দেহ ভাজনের টার্গেটে অটোমেটিক তাদের নাম চলে আসে। তাই সকালের পাখি না ডাকতেই ঘোড়া ছুটিয়ে ইরানী ফৌজ হাজির। তারা এলাকা সিল করে মুসলমানদেরকে কর্মস্থলে যেতে বাধা দেয়। পুরুষদের আলাদা স্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। ঘর থেকে মহিলাদের বের করে এনে তাদেরও পুরুষদের অদূরে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। কিছু সৈন্য তাদের পাহারায় থেকে বাকীরা ঘরে ঘরে ঢুকে ব্যাপক তল্লাশী চালায়। তারা ঘরের বিছানা, বেডসীড পর্যন্ত উল্টিয়ে দেখে।
তাদের চিরুণী অভিযান ব্যর্থ হয়। এমন কোন জিনিস উদ্ধার করতে পারে না, যা তাদের সন্দেহের উদ্রেক করে। অবশ্য তল্লাশী চালাবার সময় তাদের পছন্দসই বস্তু পকেটস্থ করতে তারা ভুলে না। এরপর তারা পুরুষ-মহিলাদের জমা করে কড়া হুমকি-ধমকি দেয়। মুসলমানদের সাথে তাদের এই ব্যবহার কোন নতুন ঘটনা নয়। যে কোন তুচ্ছ বাহানায় যখন তখন তাদের বাড়ী ঘরে এভাবে তল্লাশী চলত। অন্য সময়ে কৃত্রিম ইস্যু নিয়ে এলেও এবার তাদের হাতে বাস্তব ইস্যু ছিল।
এক ইরানী কমান্ডার মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলে–“উবলার সীমান্তবর্তী সেনাফাঁড়িতে গতরাতে অজ্ঞাত অস্ত্রধারীরা গেরিলা হামলা চালিয়েছে। উক্ত হামলায় আমাদের এক কমান্ডার এবং ষাটজন সিপাহী মারা গেছে। আর আহতের সংখ্যা অসংখ্য। তোমাদের কোন পুরুষ বা মহিলা তাদের একজনকেও যদি ধরিয়ে দিতে পার, তবে বিরাট অঙ্কের নগদ পুরস্কার দেয়া হবে। এ ছাড়া আগত ফসলের অর্ধেক তাকে দিয়ে দেয়া হবে।”
