বিষয়টির গভীরতা ও স্পর্শকাতরতা সকলেই অনুধাবন করতে সক্ষম হয়। এমন বিশ্বাসঘাতকতা তাদের কেউ করতে পারে বলে তাদের বিশ্বাস হতে চায় না। গাদ্দারকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে-এমন দৃঢ় প্রত্যয় সকলের চোখে মুখে। হয়ত প্রত্যেকেই এর সুরাহা নিয়ে ভাবছিল। সকলের মাঝে পিনপতন নিরবতা। পুরুষের পিছনের সারিতে দাঁড়ানো এক আধা বয়সী মহিলার জবান চলমান নিস্তব্ধতাকে খান খান করে দিয়ে সরব হয়ে ওঠে।
মহিলা সবাইকে চমকে দিয়ে উপস্থিত সকলের চেহারায় নজর বুলায়। “আমি বলছি সে কে। সেখানে উপবিষ্ট এক ব্যক্তির প্রতি মহিলার সন্ধানী দৃষ্টি আটকে যায়। হঠাৎ সে হাত লম্বা করে তর্জনী উঁচিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞাসা করে–“আবু নসর! তুমি ওখানে টিলার পশ্চাতে দাঁড়িয়ে কি করছিলে?”
আবু নসর থতমত খেয়ে যায়। সে সন্দেহ এড়াতে মুখ খুলে। কিন্তু কিছু বলতে পারে না। এতে সবাই বুঝতে পারে যে, ইরানী কমান্ডারের গোয়েন্দা সেই। কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় এবং অপরাধ স্বীকার করে না।
মহিলাও নাছোড় বান্দা সে অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ পেশ করে।
মহিলা বলে–“আমি তোমাকে ফলো করতে থাকি। তুমি হঠাৎ কাজ ছেড়ে উঠে গেলে আমার সন্দেহ হয়। টিলার আড়ালে চলে গেলে সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। এরপর আমার কাছে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে যায় যখন ঐ স্থান থেকে শিমুরকে বেরিয়ে আসতে দেখি।”
এক বৃদ্ধ বলে–“শোন আবু নসর! আমরা এ ভয় করি না যে, তুমি শিমুরকে এ কথাও জানিয়ে দিবে যে, আমরা তোমাকে গোয়েন্দা এবং গাদ্দার বলেছি। কিন্তু মনে রেখ ঐ অগ্নিপূজক তোমাকে মর্যাদার চোখে দেখবে না; বরং সে বলবে, তুমি তাদের গোলাম বিধায় তাদের হয়ে গোয়েন্দাবৃত্তি ও গাদ্দারী করা ফরজ।”
আবু নসরের মস্তক অবনত। সত্যের কাছে তার মিথ্যার দেয়ালের এক একটি ইট খুলে খুলে তার চোখের সামনে পড়তে থাকে। এদিকে ভর্ৎসনা আর গালির শত তীরও চতুর্দিক থেকে এসে তার সারা দেহে বিদ্ধ হতে থাকে। যার মুখে যা আসে তাই ফেলতে থাকে তার ঘাড়ে। বিদ্রূপ আর গালির তীর বর্ষণের মাধ্যমে জনতার ক্ষোভ আর ঘৃণা খতম হলে আবু নসর ধীরে মাথা উঁচু করে। তার চেহারা অশ্রুস্নাত ছিল এবং বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মত দু’চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে বেয়ে যাচ্ছিল। অনুতাপ-অনুশোচনা আর দগ্ধ বিজরিত এ অশ্রুর ফোয়ারা দেখে সবার মাঝে আবার নীরবতা নেমে আসে। সকলেই মনে করে, আবু নসর এখন মুখ খুলবে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হলেও আবু নসরের কণ্ঠ কারো কানে ভেসে আসে না। থমথমে পরিবেশ। বাকরুদ্ধ কণ্ঠ। অবনত চাহনী।
মুরুব্বী পর্যায়ের এক লোক জিজ্ঞাসা করে–“তুমি কত মূল্য পেতে?”
দীর্ঘশ্বাস নেয়ার ভঙ্গিতে আবু নসর বলে–“কিছুই নয়। আমার জীবনে এটাই প্রথম গোয়েন্দাগিরি। তোমরা এর জন্য আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চাইলে আমি প্রস্তুত।”
একজন বলে–“আমরা জানতে চাচ্ছি, কেন? শেষ মেষ তুমি এমনটি কেন করতে গেলে?”
আবু নসর জবাবে বলে–“বাধ্য হয়ে। গত পরশুর ঘটনা। ইরানী কমান্ডারের সাথে রাস্তায় আমার দেখা হলে সে আমাকে জোহরার বাড়ীর উপর নজর রাখার নির্দেশ দেয়। এ নির্দেশের অর্থ ছিল জোহরা যেন বাড়ী ছেড়ে পালাতে না পারে এবং তার সাথে কোন যুবক একাকী কথা বললে আমি যেন তাকে অবহিত করি।…আমি তাকে বলি যে, জোহরার উপর নজর রাখতে আমার কোন সমস্যা নেই কিন্তু প্রশ্ন হল আমার দুই মেয়েকে কে নজরে রাখবে? আমি তাকে বুঝিয়ে বলি যে, শাহী ফৌজের কমান্ডার এবং সেপাইরা আমাদের মেয়েদের প্রতি কুনজরে তাকায়।…
শিমুর আমার মনের ভাব বুঝতে পারে। সে বলে ভবিষ্যতে কোন কমান্ডার বা সৈন্য তোমার মেয়েদের প্রতি চোখ তুলে তাকাবে না। সে আমাকে পাক্কা ওয়াদা দেয় যে, আমার কন্যাদের সম্ভ্রম রক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থা সে করবে।…
বৃদ্ধ মন্তব্য করে–“খোদার কসম! তুমি মুসলমান কথিত হওয়ারও যোগ্য নও। তুমি নিজ কন্যাদের ইজ্জত বাঁচাতে গিয়ে অপর ভাইয়ের কন্যার ইজ্জতের ব্যাপারটি চিন্তা করনি।”
আরেকজন ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে তোমার উপর খোদার গযব পড়ুক আবু নসর! তুমি জাননা, এই অগ্নি পূজকদের ওয়াদার কোন দাম নেই। তাদের একজনও খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যে মুসলমানদের সাথে কৃত ওয়াদা রক্ষা করেছে।” আরেকজন বলে–“কন্যাদের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য আমরা নিজেরা প্রস্তুত। তোমার কন্যা আমাদের সকলেরই কন্যা।”
জোহরার পিতা সাউদ বলে–“আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।”
খুদ্দাম বলে–“আমিও তাকে ক্ষমা করে দিলাম। খোদার কসম! আমি শিমুর হতে কড়ায়-গণ্ডায় প্রতিশোধ নিব।”
মুরুব্বী তাকে সতর্ক করে বলে–“আবেগে অধীর হয়ো না বৎস! কিছু করতে চাইলে বাস্তবে করে দেখাও। কিন্তু সাবধান! আবেগতাড়িত হয়ে মুখে কিছু বলো না। মাথা ঠাণ্ডা করে ভাব।”
পরদিন সকালে বাগিচার-শ্রমিকদের মাঝে খুদ্দাম ছিল না। প্রায় প্রত্যেকেই খুদ্দামের পিতার কাছে জানতে চায়, খুদ্দাম কোথায়? পিতা নিজেও চিন্তিত ছিল। সকালে ঘুম ভাঙ্গলে সে জানতে পারে যে, খুদ্দাম গায়েব।
খুদ্দামের পিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে–“জরথুস্ত্রের এই পূজারী আমার পুত্রকে উধাও করে দিয়েছে। হয়ত সে ধোঁকা দিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে।”
