কি চিন্তা করছ? জোহরা তার পক্ষ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বলে–“তুমি লোকটিকে হত্যা তো করতে পার! আমাদের সামনে পথ এখন এই একটিই খোলা।
খুদ্দাম তাকে আশ্বস্ত করে বলে–“আল্লাহ্ পরিস্থিতি উত্তরণের পথ দেখিয়ে দিবেন।”
জোহরা বলে–“আরেকটি পথের সন্ধান তোমাকে আমি দিতে পারি। নিজের তলোয়ার দ্বারা আমাকে মেরে ফেলে তুমি বেঁচে থাক।”
খুদ্দাম বলে–“একটু কুরবানী তো করতেই হবে। শিমুর প্রতি তোমার অন্তরে পুঞ্জীভূত ঘৃণার অনুমান আমি ঠিকই করছি। কিন্তু আপাতত তুমি তার সাথে কৃত্রিম এই আচরণ করে যাও যে, তুমি তাকে ভালবাস। কটা দিন তাকে প্রতারণায় ফেলে ঠেকিয়ে রাখ। কিছুদিনের জন্য আমি গায়েব হয়ে যাব।”
জোহরা চমকে জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাবে? আর কি করতেই বা যাবে?
খুদ্দাম সতর্ক হওয়ার ভঙ্গিতে বলে–সব কথা জানতে চেয়ো না জোহরা! খোদায়ী সাহায্য লাভ করতে আমি যাচ্ছি।
জোহরা তার কাঁধে হাত রেখে বলে–“খোদার কসম খুদ্দাম! তুমি আমাকে ধোঁকা দিলে আমার প্রেতাত্মা তোমাকে নিশ্চিত বেঁচে থাকতে দিবে না। আমৃত্য তোমাকে পেরেশান করতে থাকবে। একদিনের জন্য আমি ঐ কাফেরের স্ত্রী হতে পারব না। তার সাথে বিবাহ হওয়ার অর্থ আমার থেকে শুধু তুমিই নও, আমার ধর্মবিশ্বাসও হারিয়ে যাবে।”
খুদ্দাম দৃঢ়তার সাথে বলে–“ধর্মের প্রতি তুমি এত আস্থাশীল ও মজবুত হয়ে থাকলে নিঃসন্দেহে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।”
জোহরা নিরাশ কণ্ঠে বলে–“খুদ্দাম! ধর্মের প্রতি আমি ঠিকই মজবুত কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে আমার বিশ্বাস ক্রমেই শিথিল হয়ে যাচ্ছে।”
খুদ্দাম আরো কিছু বলতে মুখ খুলেছিল কিন্তু এরই মধ্যে বাগিচায় কর্মরত শ্রমিকদের মাঝে হুটোপুটি শুরু হয়ে যায়। তিন-চার সাথী শ্রমিক খুদ্দামকে ডাক দেয়। জোহরা দ্রুত উঠে পড়ে ঘন গাছ-গাছালির মধ্য দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। খুদ্দাম দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি জানতে চেষ্টা করে। কিছু দূরে ইরানী কমাণ্ডারকে ঘোড়ায় চড়ে আসতে দেখে। সে দূর থেকেই শ্রমিকদের লক্ষ্য করে হাঁক ছাড়ে যে, খুদ্দামকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। খুদ্দাম শম্ভুক গতিতে শিমুরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
খুদ্দামকে ধীরগতিতে আসতে দেখে শিমুর ঘোড়া থামিয়ে দূর থেকে বলে–“দ্রুত আস।”
খুদ্দামের চলনে পরিবর্তন আসে না। যথারীতি শ্লথ। শিমুর পুনরায় গর্জে ওঠে তাকে দ্রুত পা চালাতে বলে। খুদ্দাম নিজ গতিতেই চলতে থাকে। শিমুর ঘোড়া থেকে লাফিয়ে কোমড়ে হাত রেখে দাঁড়ায়। বাগিচার অসহায় শ্রমিকরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আজ শিমুর খুদ্দামের হাড়-গোড় ভেঙ্গে এক করে দিবে। কিন্তু পরক্ষণে সবাই রাজ্যের বিস্ময় চোখ করে অবলোকন করে যে, খুদ্দাম তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালে শিমুর তাকে আক্রমণ করা তো দূরের কথা তার প্রতি হাত পর্যন্তও তোলে না।
শিমুর অবজ্ঞার কণ্ঠে খুদ্দামকে বলে–“শোন্ ইতর প্রাণী! আমি তোর বাপ এবং তোর যৌবনের উপর রহম করছি। এর পরে আর কোনদিন যেন তোকে ঐ মেয়ের সাথে না দেখি।”
খুদ্দাম সাহসে ভর দিয়ে জানতে চায়–“দেখলে কি করবেন?”
শিমুর বলে– তাহলে তোর মুখে কেবল এক-দুই থাপ্পড়ই মারব না। তোকে গাছের সাথে উল্টে ঝুলিয়ে বেঁধে রাখব। দূর হয়ে যা আমার সামনে থেকে।”
শিমুর এ কথা বলে আর অপেক্ষা করে না। এক লাফে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসে এবং ঘোড়া হাঁকিয়ে দেয়। খুদ্দাম সেখানেই দাঁড়িয়ে তাকে দেখতে থাকে। যতক্ষণ তার ঘোড়া চোখের আড়াল না হয়ে যায় অপলক নেত্রে তার গমন পথে চেয়ে থাকে।
তাকে এভাবে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটি কণ্ঠ ডেকে বলে–“খুদ্দাম! এদিকে এস।”
এদিক-ওদিক থেকে আরো ৩/৪টি কণ্ঠের আহবান তার কানে পৌঁছে–“এসে পড় খুদ্দাম! চলে আস।”
সে উল্টো পায়ে পিছনে ঘোড়ে এবং আহবানকারী সাথী শ্রমিকদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। শিমুর তাকে কি বলে গেল তা সবাই জানতে চায়। খুদ্দাম সব খুলে বলে। ইরানী কমান্ডার খুদ্দামের প্রতি কেন এত বিরাগ তা সকলের জানা ছিল। যদি তারা পরাধীন না হয়ে স্বাধীন জাতি হত, ইসলামী রাষ্ট্র হত এবং সামাজিক কালচার মুসলিম ঐতিহ্যবাহী হত, তবে এক তরুণীকে এভাবে কাছে বসিয়ে আলাপচারিতার জন্য অবশ্যই তারা খুদ্দামকে ভর্ৎসনা করত। কিন্তু এখানকার পরিবেশ ছিল ভিন্ন। বিধর্মী কালচার গড়ে উঠেছিল এবং চলত সবকিছু। জোহরার সাথে খুদ্দামের প্রণয় চললেও সকলের কাছে খুদ্দাম একজন সচ্চরিত্রবান যুবক ছিল। সবাই তাকে ভাল বলেই জানত। তাই খুদ্দামের প্রতি ইরানী কমান্ডারের অন্যায় আচরণে সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তাদের মাঝে ক্ষোভ দানা বেঁধে ধূমায়িত হতে থাকে। ইরানীর বিপক্ষে সকল মুসলমান ছিল ঐক্যবদ্ধ। হঠাৎ কর্মরত এক শ্রমিক আলোচনার টেবিলে এই বলে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে মারে যে, এই অগ্নিপূজক এ অসময়ে এখানে কি কাজে এসেছিল?
এই প্রশ্নে আলোচনা জমে ওঠে এবং কেঁচো খুড়তে সাপ বেরুনোর মত অবস্থা সৃষ্টি হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে অনেক রহস্য।
এক বিজ্ঞ কণ্ঠ বলে–“নিশ্চয়ই তাকে আনা হয়েছে। আর যে নিয়ে এসেছে সেও আমাদেরই লোক হবে নির্ঘাত।”
অভিজ্ঞ এক বয়োঃবৃদ্ধ আহবান করে বলে–“তদন্ত করে বের কর সে কে? এটি একটি ছেলে কিংবা মেয়ের প্রশ্ন নয়, জালিম আর মজলুমের ব্যাপার। এটা আজ রীতিমত আমাদের স্বাধীনতা এবং ঐতিহ্য-স্বকীয়তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সামান্য বিষয়ে আজ যে গোয়েন্দাগিরি করেছে সে ভবিষ্যতে বড় গাদ্দারী করতে পারে।”
