বান্ধবী জোহরাকে বলে–“তুমি বলেছিলে সে তোমাকে ধোঁকা দিবে না। আল্লাহ্ না করেন, সে যেন ঐ নরপিশাচ ইরানীর খপ্পরে আবার না পড়ে।”
জোহরা বিনতে সাউদ বলে–আল্লাহ্ পাক না করুন, সে নিশ্চয়ই আসবে।… চারদিন পার হয়ে গেছে।…ঐ ইরানীর সাথে যাওয়া আমার পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব না। মৃত্যুকে বরণ করে নিব তবুও তাকে গ্রহণ করব না। খুদ্দাম আমাকে ধোঁকা দিতে পারে না।”
বান্ধবী বলে–জোহরা। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ইরানী কমান্ডারকে মেনে নেওয়াই কি সঙ্গত নয়? তোমার পরিবারের জন্যও এটা মঙ্গলজনক হবে। মূল সমস্যা যেটা তাহলো তোমার ধর্ম-বিশ্বাস পরিবর্তন করতে হবে, তবে সারাটা জীবন কিন্তু বেশ আয়েশেই কাটিয়ে দিতে পারবে।”
জোহরা দৃঢ় কণ্ঠে বলে–“আমি যে আল্লাহ্র পরিচয় পেয়েছি কেবল তারই ইবাদত করে যাব। অগ্নি আল্লাহ তায়ালাই সৃষ্টি করেছেন। সে নিজে সৃষ্টি হয়ে আবার স্রষ্টা হয় কিভাবে? আমি আল্লাহ্র বর্তমানে অন্য কোনকিছুর পূজা করব না।”
“ভেবে দেখ জোহরা!” বান্ধবী বলে–তুমি স্বেচ্ছায় তাকে বরণ না করলে সে তোমাকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাকে বাধা দেয়ার সাধ্য কারো নেই। শাহী ফৌজের কমান্ডার সে। তোমার পরিবারের শিশুদেরও পর্যন্ত সে বন্দী করাতে পারে। আমিও তো মুসলিম কন্যা। আমি আল্লাহরই ইবাদত করি এবং তার নামেই শপথ করি। কিন্তু আল্লাহ আমাদের কোন সাহায্যে এলেন? তুমি নিশ্চিত বলতে পার যে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবেন?
শেষ পর্যন্ত আল্লাহর সাহায্য না পেলে নিজের প্রাণ নিজে হরণ করব” জোহরা বলে– এবং আল্লাহকে বলব, এই নিন। আমার দেহে আপনি প্রাণ সংহার করে থাকলে তা ফিরিয়ে নিন। এরপর অঝোর ধারায় তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে।
জোহরা তার মত এক সুন্দর নবযুবক খুদ্দাম বিন আসাদের প্রতি আসক্ত ছিল। খুদ্দামও তাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসত। তাদের বিবাহ হতে পারত কিন্তু শিমুর নামে এক ইরানী কমান্ডার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি জোহরা বিনতে সাউদের উপর পড়েছে। সে তাকে বিবাহ করার ইচ্ছা করে। শিমুর জোহরার পিতাকে বলেছে, সে চাইলে যে কোন সময় তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সে এমনটি করতে চায় না।
শিমুর বলেছে–“তোমার মেয়েকে মালে গণিমত হিসেবে নিয়ে যাব না। দু’ঘোড়া বিশিষ্ট গাড়ীতে করে নিয়ে যাব, যাতে বর বধূকে নিয়ে যায়। তুমি বুক ফুলিয়ে মানুষকে বলবে, তোমার কন্যা এক ইরানী কমান্ডারের স্ত্রী।”
“কিন্তু কমান্ডার সাহেব। সাধ্যানুযায়ী আপনার যত্ন খায়ের করা আমাদের কর্তব্য। মেয়ে আপনার বধূ হতে চাইলে আমরা বাধা দিব কেন? জোহরার পিতা বলে।
ইরানী কমান্ডার ঘৃণার দৃষ্টি হেনে স্বভাবজাত কণ্ঠে বলে–“তোমরা বর্বর আরব। কন্যা জীবিত গ্রোথিতকারী জাতি তোমরা। অথচ বলছ, মেয়ে তার নিজের বিবাহের সিদ্ধান্ত নিজেই নিবে। বাহ্! চমৎকার। জরথুস্ত্রের শপথ! তোমার কন্যা যদি আমাকে বরণ না করে তবে তোমাকে এবং তোমার কন্যাকে কুষ্ঠরোগী যেখানে আবদ্ধ থাকে সেখানে বন্দী করে রাখব।…দ্রুত সিদ্ধান্ত নাও। বেশী সময় তোমাকে দিব না বুড়ো!”
কমান্ডারের সাথে আরো তিন অশ্বারোহী সৈন্য ছিল। তারা বিকট আওয়াজে অট্টহাসি হেসেছিল।
এক সেপাই তাকে ধাক্কা দিয়ে বলেছিল–“মদীনা অনেক দূর অপদার্থ বুড়ো! তোমার আমীরুল মু‘মিনীন তোমাকে সাহায্য করতে আসবে না।”
জোহরার পিতা আর তার ভাই ভাল করেই জানত যে, ইরানের এক সামান্য সেপাইয়ের নির্দেশ লঙ্ঘন করার ক্ষমতা তাদের নেই। আর এ তো এক কমান্ডার। বড় মাপের লোক। তারা এও জানত যে, শিমুর তাদের আদরের দুলালীকে জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে গেলেও তাদের করার কিছু থাকবে না। কিন্তু অত্র এলাকার মুসলমানদের অন্তরে অগ্নিপূজকদের প্রতি যে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছিল সংখ্যালঘু হিসেবে তারা ইরানী সরকারের গোলাম হলেও এই নরপিশাচদের গোলামী না করতে তারা তাদের জোর বাধা দিচ্ছিল। তাই এর পরিণাম যতই ভয়াবহ হোক না কেন, আল্লাহর উপর তাদের অগাধ আস্থা ছিল।
***
জোহরা এবং খুদ্দামের প্রীতি সাক্ষাৎ রুখবার কোন উপায় ছিল না। তারা উভয়ে ক্ষেতে কাজ করত। যেদিন শিমুর জোহরাদের বাড়ীতে গিয়েছিল তার আগের দিন জোহরা খুদ্দামের সাথে দেখা করে এবং ভীতকণ্ঠে খুদ্দামকে জানায় যে, ইরানী কমান্ডার তাকে ও তার পিতাকে বিভিন্ন হুমকি প্রদান করছে।
জোহরা জিজ্ঞাসা করে–“আমরা এখান থেকে পালিয়ে যেতে পারি?”
খুদ্দাম গম্ভীরভাবে জবাব দেয়–“না। আমরা দু’জন অজানার পথে পাড়ি দিলে এই ইরানী নরপিশাচ তোমার এবং আমার পরিবারের ছোট-বড় সকল সদস্যকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করবে।”
জোহরা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করে–“তাহলে উপায় কি হবে?”
জোহরা দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায় এবং বলে–“খোদা! খোদা! যে খোদা আমাদের সাহায্য করতে পারে না…।”
খুদ্দাম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে–“জোহরা! খোদা অনেক সময় বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলেন, বান্দা কখনো খোদার পরীক্ষা নিতে পারে না।” এরপর খুদ্দাম গভীর চিন্তায় ডুবে যায়।
জোহরা উদাস কণ্ঠে বলে–“এটা তো সম্ভব নয় যে, তুমি এই অগ্নিপূজকদের মোকাবিলা করবে।”
খুদ্দাম গভীর চিন্তায় ডুবে থাকে। কোন উত্তর দেয় না। যেন জোহরার কথা তার কর্ণকুহরে প্রবেশই করেনি।
