মুসলিম সংখ্যালঘুরা যুবতী কন্যাদেরকে গৃহে লুকিয়ে রাখত। কারণ, কোন ইরানী সৈন্যের দৃষ্টি যদি কোন মেয়ের উপর পড়ত আর তাকে তার ভাল লাগত তবে যে কোন বাহানা দিয়ে অথবা সে পরিবারের প্রতি কোন অপবাদ আরোপ করে তাকে সাথে নিয়ে চলে যেত। কোন বাহানা ছাড়াই ইরানী সৈন্যরা মুসলিম যুবতীদের জোরপূর্বক উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু গোলামীর জিঞ্জিরে শৃঙ্খলিত এবং নির্যাতনের পাত্রে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ ঠিকই জাগ্রত ছিল। প্রথম দিকে জোরপূর্বক অপহরণের ঘটনা ঘটতে থাকলে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধভাবে দু’তিন সৈন্যকে ধরে হত্যা করে ফেলে। কন্যা বাঁচাতে গিয়ে ফৌজ হত্যার মত গুরুতর অপরাধের জন্য তারা কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হলেও জোরপূর্বক অপহরণের প্রক্রিয়া এখানেই থেমে যায়।
অগ্নি উপাসক ইরান সম্রাট ফৌজদেরকে ষাঁড়ের মত পালত। প্রতিটি সৈন্য বর্মাচ্ছাদিত হত। মাথায় ইস্পাতের শিরস্ত্রাণ এবং বাহুতে লোহার পোষাক এমনভাবে ফিট করত যে, বাহু নাড়াতে কোনরূপ অসুবিধা হত না। তাদের হাঁটুর নিম্নাংশও ভারী চামড়া অথবা অন্য কোন ধাতুর মাধ্যমে হেফাজত করত।
অস্ত্র-শস্ত্র ছিল বিপুল। প্রতিটি সৈন্যের কাছে একটি তলোয়ার, একটি বর্শা এবং একটি লৌহগদা অবশ্যই থাকত। লৌহগদা চালনায় ইরানীরা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। এছাড়া প্রত্যেক সৈন্যের কাছে একটি ধনুক আর ৩০টি তীর সমৃদ্ধ একটি তূণীর থাকত। আয়েশী জীবন-যাপন, যথেচ্ছা পানাহার ও লুটতরাজের অবাধ অনুমতি ছিল তাদের। বীরত্ব এবং রণযোগ্যতায় তারা বাস্তবিকই প্রশংসার উপযুক্ত ছিল। তাদের দুর্বলতা বলতে যা ছিল তা হলো, তারা সামনা-সামনি যুদ্ধ করতে বেশ পারঙ্গম ছিল এবং যুদ্ধও করত প্রাণপণে। কিন্তু এত যুদ্ধাস্ত্র সাথে থাকায় তারা স্বাচ্ছন্দে নড়াচড়া করতে পারত না। একটি ইউনিট কিংবা একটি বাহিনী তড়িৎ এক স্থান হতে অপর স্থানে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে তারা কাঙ্ক্ষিত সময়ে সেখানে পৌঁছতে পারত না। এত অস্ত্রপাতির বোঝা তাদেরকে অতি দ্রুত ক্লান্ত করে ফেলত। কিন্তু সৈন্য সংখ্যার বিপুলতার দরুণ তাদের এই দুর্বলতা ধরা পড়ত না।
দজলা এবং ফোরাতের মোহনার দক্ষিণে ইরাক এবং আরবের সীমান্তবর্তী এলাকা ছিল ‘উবলা’। তৎকালে উবলা একটি বড় নগরী ছিল। এর আশেপাশের অঞ্চল অত্যন্ত শস্য-শ্যামল ও উর্বর ছিল। সেখানে সুন্দর-সুন্দর গাছপালা এবং আকর্ষণীয় পাহাড়ও ছিল। ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থান এটা। আজও সেখানে বিধ্বস্ত ভবনের অংশ বিশেষ কালের ইতিহাস আগলে ধরে অসহায়ভাবে দাড়িয়ে আছে। এ সমস্ত বিরান ধ্বংসাবশেষ নীরব ভাষায় ইতিহাস বর্ণনা করে শোনায়। প্রত্যেকটি ইতিহাস শিক্ষনীয় ছবকে ভরপুর।
যারা ভোগ-বিলাসকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছিল এবং প্রজাদেরকে মানুষের কাতার থেকে বের করে দিয়েছিল এ এলাকায় সে সমস্ত জাতির ধ্বংস এবং বিপর্যয়ের নিদর্শনও আছে। আল্লাহ তাদের হেদায়েতের উদ্দেশ্যে রাসূল প্রেরণ করলে তারা তাদেরকে বিদ্রূপের পাত্র বানায় এবং বলে, তুমি তো আমাদের মতই একজন মানুষ বৈ নও। দুনিয়ায় তোমার কোন প্রতিপত্তি বা সামাজিক মর্যাদাও নেই। তাহলে কিভাবে তুমি আল্লাহ্র পয়গম্বর হয়ে গেলে?
পরিশেষে আল্লাহপাক তাদেরকে এমনভাবে পাকড়াও ও ধ্বংস করেছেন যে, তাদের মহল আর বসতি এলাকা লণ্ডভণ্ড এবং ভগ্ন প্রাসাদে পরিণত হয়েছে। আল্লাহপাক তাদের কথা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। এক স্থানে এসেছেঃ
“তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করেনি? করলে দেখত, তাদের পূর্ববর্তীদের কি পরিণাম হয়েছে। তারা তাদের চেয়ে সংখ্যায় বেশি এবং কীর্তিতে অধিক প্রবল ছিল…।”(সূরা মুমিন-৮২)
“বলুন, পৃথিবী পরিভ্রমণ কর এবং দেখ অপরাধীদের পরিণতি কি হয়েছে।” (সূরা নমল-৬৯)।
“তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে অযথা নিদর্শন স্থাপন করছ এবং বড় বড় প্রাসাদ নির্মাণ করছ, যেন তোমরা চিরকাল থাকবে?” (সূরা শোআরা-১২৮-১২৯)
সেদিন তাদের অবাধ্যতার কারণে গযব নাযিল হওয়ায় তাদের যে প্রাসাদ ও মহল ভূতলে ধসে গিয়েছিল আজ সে সমস্ত জীর্ণ মহল ও বিধ্বস্ত স্মৃতিসৌধ জ্বলন্ত ইতিহাস হয়ে বের হচ্ছে।
তাদের পরেও অনেক অর্বাচীন সম্রাট এসেছে এবং একের এক ভগ্ন প্রাসাদ উপহার দিয়ে প্রস্থান করেছে। ড়গাবেল প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভূখণ্ডে অতীতে আশুরী এসেছে, সামানী এসেছে। তারা দোর্দান্ত প্রতাপে রাজত্ব করে ইতিহাস হয়ে গেছে। বর্তমানে মদীনায় হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খেলাফত চলাকালে দজলা এবং ফোরাতের এই অপরূপ নৈসর্গ ও ঐতিহ্যবাহী ভূখণ্ডে ইরানীদের একচ্ছত্র দাপট চলছিল। অগ্নি উপাসক এই অর্বাচীন জাতিও প্রাগুক্ত জাতিদের মত বিদ্যমান ঐশ্বর্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তিকে চিরস্থায়ী জ্ঞান করতে থাকে। ক্ষণস্থায়ী দাপটে তাদের মাঝে অহমিকার সৃষ্টি হয়। প্রজাদের রীতিমত খোদা বনে যায়।
॥ দুই ॥
এক তরুণী স্বীয় বান্ধবীকে জিজ্ঞাসা করছিল–“বিনতে সাউদ! খুদ্দাম এখনও আসেনি?”
জোহরা বিনতে সাউদের চোখ অশ্রুতে ভরে যায়। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
