স্যাটেলাইটের মত খালিদের দৃষ্টিতে বিষয়টি সাথে সাথে ধরা পড়ে যায়। তার কাছে এটা স্বপ্নের মত মনে হয়। তিনি এমনই একটি সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু তা যে এত তাড়াতাড়ি অতি সহজে হাতের মুঠোয় এসে যাবে তা ছিল কল্পনাতীত।
তিনি অবস্থান ছেড়ে যাওয়া তীরন্দাজদের উপর গভীর দৃষ্টি রাখেন। যখন তিনি নিশ্চিত হন যে, তারা কুরাইশ বাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছে গনিমতের মাল সংগ্রহে ব্যাস্ত তখন তিনি অশ্বারোহী দল নিয়ে গিরিপথে অবস্থানরত হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর অধীনস্থ নয় তীরন্দাজের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করেন। খালিদ ইচ্ছা করলে তাদের এড়িয়েও যেতে পারতেন, কিন্তু প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে উন্মাদ করে তুলে। তার অশ্বারোহী দলটি পাহাড়ের উপরে উঠতে থাকলে উপর থেকে তীরন্দাজগণ তাদেরকে তীর মেরে আহত করতে থাকে।
খালিদকে গিরিপথে আক্রমণ করতে দেখে ইকরামা নিজেও বাহিনী নিয়ে উদ্দেশ্যস্থলে এসে পৌঁছে। তার অশ্বারোহী বাহিনীও চতুর্দিক দিয়ে উপরে উঠতে থাকে। তাদের কাছেও তীর ছিল। তারাও তীরের জবাব তীর দ্বারাই দিতে থাকে। মাত্র ৯ জনের পক্ষে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনীর গতিরোধ করা সম্ভব ছিল না। অশ্বারোহীরা এক সময় সুড়ঙ্গ মুখে চলে যায়। তীর রেখে এবার তারা তরবারি নেয়। কিছুক্ষণ পাল্টা-পাল্টি হামলা চলে। এক সময় সবাই আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। খালিদ আহতদেরকে পাহাড়ের উপর থেকে নিচে নিক্ষেপ করে। তীরন্দাজ কমান্ডার আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহুও শহীদ হয়ে যান।
গিরিপথ দখলের পর খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ও ইকরামা নিজ নিজ বাহিনীকে নিচে অবতরণ করায়। মুসলিম বাহিনী যেখান থেকে যুদ্ধের সূচনা করে সেখানে গিয়ে তারা একত্রিত হয়। খালিদের নির্দেশে উভয় কমান্ডার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলা চালায়। এ সময় মুসলমানরা মূলত যুদ্ধের অবস্থায় ছিল না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কিছু সংখ্যক মুজাহিদ তখনও ছিলেন। এ জানবাজ মুজাহিদগণ ঈগলের মত ছুটে গিয়ে অশ্বারোহীদের মোকাবিলায় তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
কুরাইশদের সাথে আহত নারীরাও পালাচ্ছিল। কিন্তু উমরা নাম্নী মহিলা পলায়ন করতে না পেরে নিকটবর্তী এক স্থানে আত্মগোপন করেছিল। মুসলিম বাহিনীর উপর কুরাইশ অশ্বারোহী বাহিনীর পুনঃ আক্রমণ করতে দেখার সময় কুরাইশদের ভূলুণ্ঠিত পতাকার উপর তার নজর পড়ে। এক সুযোগে সে পতাকাটি উঠিয়ে উঁচু করে তুলে ধরে।
এদিকে আবু সুফিয়ানও পলায়নপর পদাতিক সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিল। হঠাৎ সে পেছন দিকে তাকালে পত পত করে বাতাসে উড়া কুরাইশদের পতাকাটি সে দেখতে পায়। “হুবল জিন্দাবাদ, উযযা জিন্দাবাদ” শ্লোগানে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে সে পদাতিক সৈন্যদেরকে সংগঠিত করে রণাঙ্গনে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এসে মুসলমানদেরকে ঘিরে ফেলে।
খালিদের আরেকটি কথা আজ ভীষণভাবে মনে পড়ে। সেদিন তিনি হত্যার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তালাশ করে ফিরেন। আর আজ চার বছর পর সে তাঁরই নিকট মদীনা যাচ্ছে। এ মুহূর্তে তার মন-মস্তিষ্ক জুড়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয় সত্তা বিরাজমান।
♣♣♣
পাহাড়ের বাহিনী আকাশ ভেদ করে বের হতে থাকে। অশও চলছিল শ্লথ গতিতে। খালিদ বাস্তব জগৎ ছেড়ে ভাবের জগতে চলে যান। এই ভাবরাজ্যে কখনো তাঁর চলার গতি হয়ে পড়ছিল মন্থর আবার কখনো বা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন খুব কষে। তিনি আপন মনে চলতে থাকেন। অথচ গন্তব্য তার নিকট এখনো স্পষ্ট নয়, গন্তব্যস্থল অনির্ধারিত। কখনো তার মনে হয়, এক মোহনী শক্তি তাকে সম্মুখপানে টেনে নিয়ে চলছে আর সে মন্ত্রমুগ্ধের মত তার অনুসরণ করছে। আবার কখনো অনুভব করেন যে, দেহের ভিতর থেকে সৃষ্ট একটি শক্তি যেন তাকে পশ্চাতে হটিয়ে দিচ্ছে।
“খালিদ!” একটি আওয়াজ তার কর্ণকুহরে তরঙ্গের মত আঘাত হানে এটা তাঁর ভেতরের-ই একটি কাল্পনিক আওয়াজ। কিন্তু তার নিকট এটা বাস্তব মনে হয়। তিনি ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে সম্মুখে দৃষ্টি বুলিয়ে আওয়াজের উৎস খোঁজ করেন। অথচ সেখানে বালুরাশি বিনে আর কিছুই ছিল না। আবারো তিনি শুনতে পান–“খালিদ! যা শুনেছি তা কি সত্য?” এবার তিনি কণ্ঠ চিনে ফেলেন। নিশ্চিত হয়ে যান যে, এটা তার সাথি ইকরামার কণ্ঠস্বর। মাত্র একদিন আগে ইকরামা তাকে বলেছিল–“তুমি যদি মনে কর যে, মুহাম্মাদ আল্লাহর প্রেরিত নবী, তাহলে এই ধারণা মন থেকে মুছে ফেল। সে আমাদের অসংখ্য আত্মীয়-স্বজনকে নিধনকারী। তোমার গোত্রের মানসিকতা অনুভব কর। তারা সূর্যাস্তের পূর্বেই মুহাম্মাদকে হত্যা করতে চায়।”
খালিদ লাগাম মৃদু টান দেন। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়া ইঙ্গিত মোতাবেক অগ্রসর হয়। চার বছর পূর্বের স্মৃতিতে তিনি পুনরায় ফিরে যান। মনে পড়ে যায়, উহুদ ময়দানে তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন। দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, যে কোন মূল্যে সূর্যাস্তের পূর্বে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করে কুরাইশদের শপথ তিনি পূরণ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জানবাজ মুজাহিদদের অসীম সাহসের কারণে তার ইচ্ছা আর পূরণ হল না।
