আগন্তুকের উচ্চ পরিচয় পেয়ে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারা আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। এবার তিনি হযরত মুসান্না বিন হারেস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকান। এ দৃষ্টি ছিল সম্মান নিংড়িত শ্রদ্ধা বিজড়িত। সাথে সাথে তার চোখে ভেসে ওঠে আরব মুসলমানের ঐ সমস্ত গোত্র যারা এক সময় ইরানীদের প্রজা ছিল। ইরাক অঞ্চল জুড়ে ছিল এদের আবাদ-বসতি। বনূ লাখাম, বনূ তাগাল্লুব, বনূ আয়াদ, বনূ নাম্বার এবং বনূ শায়বান ছিল তাদের অন্যতম। এক তথ্য অনুযায়ী তারা আদি আরব ছিল। এক যুদ্ধে ইরানীরা তাদেরকে যুদ্ধবন্দী করে এখান থেকে নিয়ে গিয়ে দজলা এবং ফোরাতের মোহনাবর্তী এলাকায় পুনর্বাসিত করে।
তারা ইরানীদের গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হলেও নিজেদের সনাতন আকীদা-বিশ্বাস এই নতুন আবাসেও আঁকড়ে ধরে রেখেছিল। আরব ভুখণ্ডে ইসলামের জাগরণ শুরু হলে তারাও ইসলামে দীক্ষিত হয়ে যায়। ইরাক থেকে সায্যাহ এর মত লোক নবুওয়াতের মিথ্যা দাবী তুললে এই আরব প্রজারা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা এ ফিৎনার মোকাবিলায় সোচ্চার হয়ে ওঠে। ইসলাম রক্ষায় তারা নিজ উদ্যোগে পৃথক রণাঙ্গন সৃষ্টি করে।
এদিকে ক্রমে মুসলিম বাহিনী এমন এক সমর শক্তিতে রূপ নেয় যে, তাদের সামনে মুরতাদ এবং কুফরীবাদের সম্মিলিত শক্তিও টিকে থাকতে পারে না। রণাঙ্গনের বাইরেও মুসলমানরা যে অমায়িক আচরণ ও কালজয়ী আদর্শ পেশ করত তা যে কোন ব্যক্তির অন্তরে রেখাপাত এবং গভীর প্রভাব সৃষ্টি করত। এভাবে মুসলমানরা দিকে দিকে সমর ও আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রভাব বিস্তার করে চলছিল। কিন্তু তখনও পর্যন্ত তারা অগ্নিপূজারী তৎকালীন পরাশক্তি ইরানীদের বিরুদ্ধে লড়ার উপযুক্ত হয়েছিল না। তৎকালীন বিশ্বের শীর্ষ শক্তিধর এক বিশাল সাম্রাজ্য ছিল ইরান। এ সাম্রাজ্য এতই বিস্তীর্ণ ছিল যে, তার আয়তন বা সীমানার কোন হিসাব ছিল না। সেনা সংখ্যা এবং অস্ত্র-শস্ত্রের আধিক্যে তারা সমকালীন পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইরান শক্তির মোকাবিলা করার মত তৎকালে কেবল রোম শক্তিই ছিল। রোম শক্তির সাথে নিয়মিত সংঘর্ষের ফলে শেষের দিকে এসে ইরান শক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
বিপুল সমর শক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরান সাম্রাজ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পয়গাম পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ইরানীরা ইসলাম গ্রহণে কেবল অপ্রস্তুতই ছিল না; বরং তারা ইসলাম নিয়ে রীতিমত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। মুসলিম কোন দূত তাদের শাসনাধীন কোন এলাকার গভর্নরের কার্যালয়ে প্রবেশ করলে তাকে অপমান করত এবং কাউকে বন্দী করে রাখত।
রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনায়কদের চিন্তাধারাই ভিন্ন প্রকৃতির। বড় বৈচিত্র্যময় তাদের স্বভাব। তাদের চিন্তা-ভাবনার গতি সমঝোতা ও পরিস্থিতি কেন্দ্রীক হয়ে থাকে। যে কোন মুহুর্তে তারা সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে। কিন্তু আপামর জনতার চিন্তাজগৎ নিয়ন্ত্রণ করে তাদের জযবা-অনুপ্রেরণা। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির বিরুদ্ধেও তারা বুক টান-টান করে দাঁড়িয়ে যায়।
৪.০১ ইরাক ছিল ইরানের একটি প্রদেশ
সে সময় ইরাক ছিল ইরানের একটি প্রদেশ। প্রখ্যাত যুদ্ধবাজ এবং নির্ভীক সেনাপতি হুরমুজ ছিল তার গভর্নর বা শাসক। জালেম এবং দুশ্চরিত্রবাজ হিসেবেও সে সমান কুখ্যাতি লাভ করেছিল। জুলুম এবং অভদ্রতার প্রবাদে পরিণত হয় তার নাম। সমাজে কেউ অভদ্রতা কিংবা অসদাচারণ করলে মানুষ তাকে এই বলে ভর্ৎসনা করত যে, “সে হুরমুজ থেকেও অভদ্র ও জঘন্য।”
দজলা এবং ফোরাতের মোহনায় পুনর্বাসিত সংখ্যালঘু মুসলমানরাই ছিল হুরমুজের অকথ্য নির্যাতনের করুণ শিকার। মুসলমান হওয়াটাই ছিল হুরমুজের দৃষ্টিতে তাদের অপরাধ। কোন ইরানীর হাতে কোন মুসলমান নিহত হওয়া কিংবা কোন মুসলিম নারীকে অপহরণ হুরমুজের কাছে কোন অপরাধই ছিল না। মুসলমানদের কষ্ট দিয়ে, সামান্য বাহানায় তাদের ঘর-বাড়ী লুট এবং জ্বালিয়ে দিয়ে খ্রিস্টানদের মত ইরানীরাও পৈশাচিক স্ফুর্তি করত। মুসলমানদের জীবন কাটত ভীতি আর আতংকের মধ্য দিয়ে।
মুসলমান অধ্যুষিত এলাকার জমি স্বর্ণ প্রসব করত। তরি-তরকারী এবং ফল-মূল উৎপাদনে এলাকাটি বড়ই উর্বর ও উপযোগী ছিল।
সবুজের সমারোহ, বৈচিত্র্য ফুলের বাহার, ফলের মিষ্টি সুবাস, পাখিদের কলকাকলি, আকাশের নিলীমা, মৃদুমন্দ হাওয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দজলার কলতান, ফোরাতের উর্মিমালা ছাড়াও প্রাকৃতিক অপূর্ব শোভার কারণে ৩০০ মাইল আয়তনের সেই এলাকাটি নয়নাভিরাম নৈসর্গিক একটি ভূখণ্ড ছিল। মানুষ রাজধানীতে বাস করলেও তাদের হৃদয়ে গাঁথা থাকত এই এলাকার ভূবনমোহিনী রূপ। তাই শাসকশ্রেণী সুযোগ পেলেই এই এলাকায় অবকাশ যাপন করতে আসত এবং দীর্ঘদিন তার মায়ায় কাটিয়ে দিত। আরাম-আয়েশ আর স্বাচ্ছন্দময় জীবনযাপন করতে মুসলমানদের এখানে পুনর্বাসিত করা হয় নাই; বরং চাষাবাদের মাধ্যমে এলাকাকে সজীব ও প্রাণবন্ত রাখতে তাদের এখানে রাখা হয়। তারা রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম আর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মাটির বুক চিরে সোনার ফসল ফলাত, তরি-তরকারি আর ফল-মূল উৎপাদন করত। কিন্তু এ ফসল তাদের বাড়ী-ঘরে যেত না। জীবিত থাকার জন্য যতটুকু না হলে নয় ঠিক ততটুকুই তারা লাভ করত মাত্র। অবশিষ্ট ফসলের সবই চলে যেত শাসকের ঘরে এবং ইরানী ফৌজের পেটে। মুসলমান চাষীদের জন্য দরিদ্রতা এবং ইরানীদের ঘৃণাই শুধু রয়ে যেত।
