লায়লা বলেন—“সেটা তো আপনি পেয়েই গেছেন। আপনি আল্লাহ্র তরবারী। আমি পার্থিব একটি উপঢৌকনের কথা বলছিলাম। আপনি আসলে ভীষণ ক্লান্ত।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করেন—“তা সে উপঢৌকন কি জানতে পারি?”
লায়লা বলেন—“মুযাআ বিন মুরারার কন্যা। আপনি তাকে দেখেননি। আমি তাদের বাড়ীতে গিয়েছিলাম। অপূর্ব সুন্দরী। ইয়ামামার হীরা। সে আপনাকে ভালবাসে। সে আপনার প্রশংসা করে বলে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন বড় মাপের মানুষ। তিনি আমাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েও ঘোষণা করেছেন যে, কোন নারীকে বাঁদী বানানো হবে না। অথচ এই নারীরাই তাকে ধোঁকা দিয়েছিল।”
তৎকালীন আরবে সতীন কালচার ছিল না। একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা গর্বের বিষয় ছিল। স্ত্রীরাও স্বামীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে নিজেরাই সুন্দরী-রূপসী পাত্রী খুঁজে বিবাহ করিয়ে দিত। তাদের মধ্যে বর্তমানের সংকীর্ণতার নাম-গন্ধও ছিল না। লায়লার প্ররোচনা ও পীড়াপীড়িতে হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিবাহ করতে রাজী হন। তিনি মুযাআ বিন মুরারার কাছে গিয়ে সরাসরি প্রস্তাব পেশ করেন যে, তিনি তার কন্যার পাণিপ্রার্থী। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অতর্কিত এ প্রস্তাবে মুযাআ এত বিস্মিত হয় যে, সে নিজের কানকে পর্যন্ত বিশ্বাস করাতে পারে না। সে এটাকে কর্ণভ্রম কিংবা দিবাস্বপ্ন বলে অগ্রাহ্য করে। কিন্তু পরক্ষণে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর উপর চোখ পড়তে স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লক্ষ্য করে কি যেন বলছেন। কিন্তু কি বলছেন সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায় সে।
মুযাআ জিজ্ঞাসা করে—“কি বললেন জনাব খালিদ!”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পূর্বের প্রস্তাব আওড়ান—“তোমার কন্যাকে আমি বিবাহ করতে চাই।”
মুযাআ বলে—“এতে খলিফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের উভয়ের প্রতি রুষ্ট হবেন না?”
মুযাআ প্রথমে আপত্তি করলেও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আগ্রহ দেখে তিনি রাজি হয়ে যান। অতঃপর এক শুভক্ষণে মুযাআর যুবতী রূপসী কন্যার সাথে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শুভ পরিণয় হয়ে যায়। এই নতুন বিবাহের খবর মদীনায় পৌঁছলে খলিফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাবর পত্র লিখেন”
“উহ্ ওলীদের পুত্র! তোমার হলোটা কি? তুমি এ কি শুরু করলে? একের পর এক বিবাহ করে যাচ্ছ। অথচ তোমার তাঁবুর বাইরেই তো বারশ মুসলমানের রক্ত ঝরেছে। শহীদদের রক্তও তুমি শুকাতে দিলে না।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পত্র পড়েই মন্তব্য করেন—এটা হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাজ।”
মোটকথা, ব্যাপারটা বেশী দূর গড়ায় না। পত্রযোগে ভর্ৎসনার মাধ্যমেই শেষ হয়ে যায়। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে এ পয়গামও প্রেরণ করেছিলেন যে, তিনি ইয়ামামাতেই অবস্থান করবেন এবং হেড কোয়ার্টার থেকে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষা করবেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফার নির্দেশ মোতাবেক মুযাআর কন্যা এবং লায়লাকে নিয়ে ইয়ামামার নিকটবর্তী ওবার উপত্যকায় যান এবং সেখানে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান করতে থাকেন। দীর্ঘ দু’মাস পরে তিনি পরবর্তী নির্দেশ পান।
৬৩৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ। ১১ হিজরীর জিলক্বদ মাসের শেষ লগ্ন। এ সময়ে খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাতে মদীনায় এক ব্যক্তির আগমন হয়। তিনি নিজেকে মুসান্না বিন হারেস নামে পরিচয় প্রদান করেন। খোদ খলীফা এবং মদীনাবাসীর নিকট তিনি অতি সাধারণ বরং একজন অপরিচিত বলে প্রতিপন্ন হন। এ জাতীয় লোক কোন বাদশাহর দরবারে গেলে নিঃসন্দেহে তাকে সেখান থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হত। কিন্তু মহামতি হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোন নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সাধারণ বাদশা ছিলেন না, বরং তিনি দোজাহানের সম্রাট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খলীফা ছিলেন, যার দ্বার যে কোন ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ত থাকত।
খলীফার দরবারে প্রবেশের সময় আগন্তুকের চেহারায় ক্লান্তি আর বিনিদ্র রজনীর গভীর ছাঁপ ছিল। পোষাক-পরিচ্ছদ ধুলিময় এবং তিনি নিজ শক্তিতে কথাও বলতে পারছিলেন না।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন—“এই ভিনদেশী অতিথির পরিচয় কেউ বলতে পারে কি?”
“মুসান্না বিন হারেস নামে নিজেকে পরিচয় দানকারী কোন সাধারণ ব্যক্তিত্ব নন”—হযরত কায়েস বিন আসেম আল মুনকিরী রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন—“আমিরুল মু‘মিনীন! লোকটির এখানে আসার পেছনে কোন দুরভিসন্ধি নেই। আল্লাহর পক্ষ থেকে সে ইতোমধ্যে যে খ্যাতি ও সম্মান লাভ করেছে তা রীতিমত ঈর্ষণীয়। ইরাকের পারস্য সেনাপতি হুরমুজ এবং সর্বত্র খ্যাতি অর্জনকারী তার সৈন্যরা পর্যন্ত এই মুসান্না ইবনুল হারিস এর নাম শুনে কেঁপে ওঠে।”
আরেকজন বলেন—“আমীরুল মু‘মিনীন! আপনার ভিনদেশী মেহমান বাহরাইনের বকর বিন ওয়ায়েল গোত্রের একজন সম্মানিত সদস্য। যারা ইসলাম গ্রহণ করে কুফর ও মুরতাদের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের মাঝেও ইসলামের চেরাগ জ্বালিয়ে রেখেছেন ইনি তাদের অন্যতম। আমাদের সেনাপতি হযরত আলা ইবনে হাযরমী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনি ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকায় মুরতাদদের বিরুদ্ধে অসংখ্য রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন।”
