ইয়ামামা ও তার আশে-পাশের অঞ্চলের লোকেরা এত বিপুল প্রাণহানির কথা ইতোপূর্বে কখনো শুনেনি এবং দেখেনি। এটা গযব নাযিল হওয়ার মত ছিল। ঘরে ঘরে শোক আর মাতম চলে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতে মানুষ সেই অদৃশ্য শক্তির উদ্দেশে সেজদাবনত হতে আকুলি-বিকুলি করছিল যিনি তাদের উপর এভাবে গযব নাযিল করেছেন। মুসলিম বাহিনীর মাঝে তখনও অনেক হাফেজ ও কারী সাহাবা ছিলেন। তারা লোকদেরকে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করে বুঝিয়ে দিতে থাকেন যে, তাদের বিনাশকারী গায়েবী শক্তির উৎস কি বা কোথায়?
ঐতিহাসিকদের অভিমত, বনূ হানীফার যারা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে পলায়ন করেছিল তাদের সংখ্যা ২০ হাজারের মত ছিল। তারা এদিক-ওদিক আত্মগোপন করার মাধ্যমে লাপাত্তা হয়ে যায়। মুসলমানরা খুঁজে খুঁজে তাদের ধরে আনতে থাকে। তারাও ছিল রীতিমত ভীত ও আতংকিত। অনেকে অনুতাপ এবং অনুশোচনায় দগ্ধও হতে থাকে। কেননা তারা এমন এক ভণ্ড নবীর হাতে বাইয়াত হয়ে নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যে তাদেরকে এই কথা বলে প্রতারিত করেছিল যে, খোদা তাকে এমন এক শক্তি দান করেছেন যার ফলে বিজয় তাদেরই হবে আর মুসলমানরা নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস হয়ে যাবে। দ্বীনের তাবলীগ এবং ইসলামের ব্যাপক পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন হয় না তাদের। অধিকাংশই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।
বনূ হানীফার নেতৃত্বের প্রশ্নে মুযাআ বিন মুরারা মুসাইলামার স্থলাভিষিক্ত ছিল। গোত্রের লোকদের গণহারে মুসলমান হতে দেখে সে এটা ভেবে আশ্বস্ত হয় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অন্তরে তার প্রতি যে অসন্তুষ্টি রয়েছে এতে নিশ্চয় তার অবসান হবে।
বনূ হানীফার লোকেরা বানের ঢলের মত হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে বাইয়াত হতে আসতে থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের মধ্য হতে নেতৃস্থানীয় কিছু লোকের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধি দল গঠন করেন এবং খলিফাতুল মুসলিমীনের হাতে বাইয়াত হওয়ার জন্য তাদের মদীনায় প্রেরণ করেন।
এ যুদ্ধে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে চড়া মূল্য দিতে হয়। প্রাচীন নথিপত্র এবং অন্যান্য সূত্রের বরাতে অনুমিত হয় যে, বিশাল এক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভের আশা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অত্যন্ত ক্ষীণ ছিল। তিনি সম্পূর্ণ আল্লাহ তা’আলার উপর আস্থা এবং নিজের সমর যোগ্যতার বলে লড়েছিলেন। তার মেরুদণ্ড ক্লান্তিতে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল।
ইয়ামামা যুদ্ধের ভয়াবহতার অনুমান এভাবে করা যেতে পারে যে, এ যুদ্ধে বনূ হানীফার ২১ হাজার সৈন্য প্রাণ হারিয়েছিল। আহতদের সংখ্যা ছিল গণনার বাইরে। এর বিপরীতে মুজাহিদ বাহিনীর শহীদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২ শত। শহীদদের মধ্যে ৩০০ ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেয।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইয়ামামা যুদ্ধে ৩০০ হাফেযে কুরআন সাহাবীর শহীদ হওয়ার সংবাদ শুনে খলিফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। প্রতি রণাঙ্গনে এভাবে হাফেয সাহাবা শহীদ হতে থাকলে পবিত্র কুরআনের ভবিষ্যৎ কি হবে—এই প্রশ্ন তাকে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তিনি লিখিত আকারে কুরআন সংরক্ষণের প্রতি মনোযোগী হন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে কাতেবে ওহী হযরত যায়েদ বিন সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাঁধে এ গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন যে, তিনি পবিত্র কুরআনের অরক্ষিত ও বিক্ষিপ্ত মূল কপি এক ফাইলে জমা করে সংরক্ষণ করবেন। ভলিউম আকারে আজ যে কুরআন আমাদের কাছে শোভা পাচ্ছে, তা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঐ ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তিতে হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কৃতিত্ব ও অবদানের ফল।
ইয়ামামা যুদ্ধের পর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ ভেঙ্গে পড়েন। তার দৈহিক ও মানসিক শক্তি লোপ পেয়েছিল প্রায়। লায়লা তাঁর অবসন্ন শরীরে শক্তি যোগাতে চেষ্টা করেন। তাকে প্রবোধ দেন। ভেঙ্গে পড়তে দেন না। তার মানসিক শক্তি জাগিয়ে তোলেন। অকল্পনীয় প্রাণহানিতে তিনি সাময়িকভাবে মুষড়ে পড়লেও দ্রুত নিজেকে সামলে নেন। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ইতিপূর্বের কোন যুদ্ধে মুসলমানদের এত প্রাণহানি ঘটেনি। কেবল এই একটি যুদ্ধই তাদের ১ হাজার ২ শত সাথীকে কেড়ে নেয়। সাথীদের এহেন ব্যাপক শাহাদাতে অবশিষ্ট মুজাহিদগণের উপর দুঃখের পাহাড় নেমে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শোকাহত হলেও দ্রুত সে শোক কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেন। অন্যদের মত শোকে পাথর হয়ে গেলে কিংবা বিলাপচারিতায় নিজেকে হারিয়ে ফেললে নেতৃত্ব দান অব্যাহত রাখতে পারতেন না। অথচ তাঁর সামনে ইরাক এবং সিরিয়া বিজয়ের হাতছানি ছিল। ধর্মান্তরিতের ফিৎনার মূলোৎপাটন করে দূর দিগন্তে ইসলামের ঝাণ্ডা উড়াতে কুদরত তাঁকে আহ্বান করছিল। ফলে তিনি নিজেকে শোকে পাথর হতে দেননি। দুঃখ-বেদনা হতে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
একদিন লায়লা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন—“ওলীদের পুত্র! এই মহান বিজয়ে আমি আপনাকে একটি উপঢৌকন দিতে চাই।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আল্লাহর সন্তুষ্টিই কি আমার জন্য যথেষ্ট নয়?”
