মুযাআ সন্ধিপত্র চূড়ান্ত করে ফিরে যায়। ঐ দিনই মুযাআ ইয়ামামার দরজা খুলে দেয় এবং হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শহরের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করতে আহ্বান জানানো হয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অধীনস্ত সেনাপতি ও কমান্ডারদের নিয়ে ইয়ামামার নগর প্রাচীরের প্রধান ফটকের সামনে এসে পৌঁছান। তারা প্রাচীরের উপরে নজর বুলান। সেখানে একটি সৈন্যও ছিল না। কেল্লাও ছিল জনশূন্য। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ধারণা করছিলেন, মুযাআ তাদেরকে যে সৈন্যের ভয় বারবার দেখায়, তারা হয়ত কেল্লার অভ্যন্তরে আছে। কিন্তু কেল্লায় পা দিয়ে তিনি অবাক হয়ে যান। সেখানে সৈন্যের কোন নাম-নিশানা ছিল না। ইতস্তত মহিলা, বাচ্চা এবং বৃদ্ধরা ছিল মাত্র। একজন যুবককেও দেখতে পাওয়া যায় না। মহিলারা নিজ নিজ বাড়ীর সামনে দাড়িয়ে ছিল। কতক আশে-পাশের বাজারে বসা ছিল। অধিকাংশ মহিলা কাঁদছিল। তাদের কারো পিতা, কারো ভাই, কারো পুত্র, কারো স্বামী যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুযাআকে জিজ্ঞাসা করেন—“সৈন্যরা কোথায় গেল?”
বিভিন্ন দরজা ও ঘরের ছাদে অসহায়ভাবে দাঁড়ানো মহিলাদের প্রতি ইশারা করে মুযাআ বলে—“আপনি সৈন্যদের দেখতে পারছেন জনাব খালিদ! এই ঐ সৈন্য যারা তীর-কামান আর বর্শায় সুসজ্জিত হয়ে প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়েছিল।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিস্মিত হয়ে বলেন—“এই নারীরা?”
মুযাআ বলে—“হ্যাঁ, জনাব খালিদ। শহরে সৈন্য বলতে কেউ নেই। এখানে কেবল যুদ্ধাক্ষম বৃদ্ধ, নারী আর শিশু রয়েছে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান—“এরা আমাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারত?” নারীরা প্রতিরোধে নেমে আসত?”
মুযাআ বলে—“না ইবনে ওলীদ! এটা আমার একটি চাল ছিল মাত্র। শহরের সকল পুরুষ মূল লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করতে চলে গিয়েছিল। শহরে যুবক বলতে কেউ ছিল না। আমি নিজের গোত্রকে কৌশলে বাঁচাতে চেয়েছি মাত্র। আমিই সকল নারী, বৃদ্ধ এবং বালকদের বর্মাচ্ছাদিত এবং মাথায় শিরস্ত্রাণ পরিয়েছিলাম। অতঃপর তাদের হাতে তীর-তূণীর এবং বর্শা দিয়ে প্রাচীরের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলাম। আমি নিজে বাইরে গিয়ে তাদের কৃত্রিম সৈন্যের অভিনয় দেখেছিলাম। খোদার কসম ইবনে ওলীদ। আমি নিজেও ধরতে পারছিলাম না যে, এরা নারী, বৃদ্ধ এবং বালকের সমন্বয়ে গঠিত কৃত্রিম বাহিনী; বরং আমার চোখেও এদেরকে নিয়মিত সৈন্যের মত মনে হয়েছে। আমি এদের এভাবে প্রস্তুত করে আপনাকে এক নজর দেখার জন্য সুযোগ দিয়েছিলাম। যাতে আপনি আমার ফাঁদে পা দেন এবং আপনার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, ইয়ামামায় বাস্তবেই অনেক সৈন্য রয়েছে।…এরপর আমার পরিকল্পনা মত সবকিছু চলে। আপনি দেখে শুনে এবং যাচাই করে আমার ফাঁদে পা দিলেন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। তিনি মুযাআকে এই চরম প্রতারণার সমুচিত শাস্তি দিতে পারতেন। কিন্তু যে চুক্তিপত্রে তিনি একবার স্বাক্ষর করেছেন তার কোন শর্ত ভঙ্গ করতে তিনি রাজি ছিলেন না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুযাআকে বলেন—“খোদার কসম! তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ।”
মুযাআ বলে—“আমি আপনাকে ধোঁকা দিতে পারি কিন্তু আমার গোত্রের সাথে গাদ্দারী করতে পারি না। আপনার তলোয়ার থেকে তাদের বাঁচানই ছিল আমার উদ্দেশ্য। আমি তাদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তোমার কপাল ভাল যে আমি মুসলমান। ইসলাম কৃত চুক্তি ভঙ্গের অনুমতি দেয় না। সন্ধিপত্রে আমার স্বাক্ষর হয়ে গেছে। নতুবা আমি তোমার গোত্রের এই সকল নারীকে বাঁদীতে পরিণত করতাম।”
মুযাআ বলে—“আমার জানা ছিল যে, সন্ধিপত্রে স্বাক্ষরের পর আপনি এমনটি করবেন না।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“কিন্তু একটি কথা মনে রেখ ইবনে মুরারাহ। আমার সন্ধি কেবল ইয়ামামা শহরবাসীদের জন্য। আশ-পাশের অঞ্চলের লোক এর আওতাধীন নয়। ইয়ামামা শহরের কোন ব্যক্তিকে আমি যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়ে হত্যা করব না ঠিকই কিন্তু ইয়ামামার বাইরে যাকে আমি হত্যার যোগ্য বলে মনে করব তার মস্তক ধরায় লুটাতে আমি সন্ধিপত্রের তোয়াক্কা করব না।
॥ বাইশ ॥
ধর্মান্তরিতের হেড কোয়ার্টার ছিল ইয়ামামায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুজাহিদ বাহিনীর বুলডোজার দিয়ে তা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে ধুলিস্যাৎ করে দেন। ভণ্ড নবীকে নিপাত করে তার মরদেহ শহরের অলি-গলিতে প্রদর্শন করা হয়। মুসাইলামার ভক্তদের বলা হয়, সত্যিকার অর্থে তোমাদের নবীর কাছে অলৌকিক শক্তি কিংবা মোজিযা থাকলে ৪০ হাজারেরও বেশী সৈন্যের এমন শোচনীয় পরাজয় মাত্র ১০ হাজার সৈন্যের হাতে হত না।
মুসলমানরা ইয়ামামার অলি-গলিতে ঘোষণা করতে থাকে—“বনূ হানীফা। নারীদের ভয় নেই। তাদেরকে বাঁদী বানানো হবে না। শহরের অভ্যন্তরের কোন পুরুষ, শিশু কিংবা নারীর উপর হাত তোলা হবে না। মুসাইলামা আস্ত ভণ্ড এবং প্রতারক ছিল। সে তোমাদেরকে ধোঁকার জালে বন্দী করে তোমাদের ঘর-বাড়ী আজ বিরান করে গেছে।”
ভয়, আতংক আর মৃত্যু ইয়ামামাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। মহিলারা শহর থেকে বাইরে বের হতে রীতিমত ভয় পাচ্ছিল। এ ভয় ও আতংক মুসলমানদের কারণে ছিল না। স্বজনদের বিভৎস লাশ চোখে পড়ার ভয়ে তারা আতংকিত ছিল। নগর প্রাচীরে দাঁড়িয়ে তারা শহরের বাইরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছিল। চিল, শকুন আর নেকড়ে বাঘের ভয়ংকর আওয়াজ তারা শুনতে পাচ্ছিল। হিংস্র ও বন্যপ্রাণীগুলো রণাঙ্গনে পড়ে থাকা মৃত সৈন্যদের লাশ খাচ্ছিল।
