হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গভীর চিন্তা হতে মাথা উঠিয়ে বলেন—“ইবনে মুরারাহ” তোমার হয়ত জানা নেই, যে সমস্ত নেতা এই যুদ্ধে শরীক ছিল তাদের কাছ থেকে জেনে নিও যে, বনূ হানীফার কত অর্থ-সম্পদ আমাদের হস্তগত হয়েছে এবং কত বাগ-বাগিচা ও কয়েদী আমাদের হাতে বন্দী। ফিরে যাও এবং ঐ নেতাদের গিয়ে বল, মুসলমানরা অর্ধেক মালে গনিমত, অর্ধেক বাগ-বাগিচা এবং অর্ধেক বন্দী ফিরিয়ে দিবে। তাদেরকে বুঝাবে, গোয়ার্তুমি করে যেন ইয়ামামা ও তার আশপাশের অঞ্চলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয়।”
ইবনে মুরারাহ চলে যায়। এরই মধ্যে ধৃত কয়েদীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মুযাআ সন্ধ্যার কিছু পূর্বে ফিরে এসে জানায় যে, বনূ হানীফার কোন সর্দার মুসলমানদের শর্ত মানতে রাজি নয়। মুযাআ এটাও উল্লেখ করে যে, বনূ হানীফা তাদের পরাজয় ও হাজার হাজার নিহতের প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলেন—“আমার কথা কান খুলে শোন ইবনে মুরারাহ। যদি বনূ হানীফা এটা মনে করে থাকে যে, সংখ্যায় স্বল্পতার কারণে আমরা ভীত হয়ে পড়ব, তবে তাদের গিয়ে বল, মুসলমান জানের বাজী দিবে তবুও তোমাদের প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ দিবে না।”
মুযাআ বলে—“ক্রোধে ফেটে পড়বেন না। জনাব! আমাদের থেকে লব্ধ মালে গনিমত, বাগ-বাগিচা এবং কয়েদীদের এক-তৃতীয়াংশ আপনারা রাখুন আর বাদ বাকী আমাদের ফিরিয়ে দিয়ে সন্ধি করে ফেলুন। সন্ধিপত্র অবশ্যই লিখিত হতে হবে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় চিন্তার জগতে চলে যান।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে গভীর চিন্তামগ্ন দেখে তাকে আরো প্রভাবিত করতে মুযাআ নড়েচড়ে বসে এবং সন্ধির পেছনে তার অবদানের কথা তুলে ধরে।
মুযাআ বলে—“আমি আপনাকে আরেকবার সতর্ক করছি ওলীদের পুত্র। এটা বলতে আপত্তি নেই যে, বনূ হানীফাকে সন্ধিতে রাজী করানোর কৃতিত্ব আমারই। এর জন্য তাদের অগণিত অভিসম্পাত আর অভিশাপ আমাকে মাথা পেতে নিতে হয়েছে। তারা আমাকে গাদ্দারও বলেছে। তারা বলছে, তুমি মুসলমানদের থেকে অর্থ খেয়ে আমাদেরকে তাদের গোলাম বানাতে চাও। তারা আরও বলে, আমাদের সংখ্যা কম হলেও আমরা সন্ধি করতাম না। যুদ্ধ সামগ্রী, খাদ্য কোন কিছুরই আমাদের কমতি নেই। কমতি থেকে থাকলে তা মুসলমানদেরই আছে। তারা বলছে, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মাঝে মুসলমানরা কতদিন পর্যন্ত অবরোধ করে বসে থাকবে? রাতের বরফ পড়া শীতে তারা খোলা আকাশের প্রচণ্ড ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারবে না। তারা এটাও জানে যে, আপনার ক্ষুদ্র বাহিনীর নিকট রাত যাপনের তাঁবুও নেই।…ভাবুন, গভীরভাবে বুঝার চেষ্টা করুন। আমার কথায় আপনার সন্দেহ হলে একটু এগিয়ে গিয়ে ইয়ামামার প্রাচীরের উপর দিয়ে একটিবার নজর বুলান। সেখানে দু’টি দুর্ভেদ্য প্রাচীর দেখতে পাবেন। একটি হলো কেল্লার প্রাচীর। আর দ্বিতীয়টি হলো ঐ প্রাচীরের উপরে মানব দেহের তৈরী আরেকটি প্রাচীর।”
এটা ঠিক যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের দুর্বলতা সম্পর্কে পুরো অবগত ছিলেন। কিন্তু তাই বলে শত্রুর প্রতিটি শর্ত তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি তাবু হতে বাইরে বেরিয়ে আসেন। সহ সেনাপতিগণ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখে তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। অত্যন্ত অস্থিরচিত্তে তারা জানতে চান যে, সন্ধির আলোচনা কতদূর গড়ালো!
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমার সাথে এস।”
সেনাপতিগণ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে রওয়ানা হন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে ব্রিফিং দিতে থাকেন এবং মুযাআ সর্বশেষে সন্ধির যে শর্ত উল্লেখ করেছে তাও তাদেরকে অবহিত করেন। তারা ইয়ামামা অভিমুখে চলতে থাকেন। এমন স্থানে গিয়ে তারা দাড়িয়ে পড়েন যেখান থেকে ইয়ামামা শহরের প্রাচীর দেখা যাচ্ছিল। তারা দেখতে পান যে, সমগ্র প্রাচীর সৈন্যে সুসজ্জিত। তারা নিশ্চিত হয়ে যান যে, শহর প্রাচীরের উপরে আরেকটি মানব প্রাচীর আছে বলে মুযাআ যে তথ্য দিয়েছে তা সম্পূর্ণ সত্য। প্রাচীরের এই অবস্থা থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, শহরের অভ্যন্তরে বিপুল সৈন্য রয়েছে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য সেনাপতিদের লক্ষ্য করে বলেন—“আমার ধারণা, এমতাবস্থায় শহর অবরোধ করলে আমরা বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হব। প্রাচীরের উপরে যাদের দেখলাম তাদের তীর আমাদেরকে প্রাচীরের ধারে-কাছে পৌঁছতে দিবে না। ব্যাপক মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়ার জন্য এত লোক আমাদের নেই।”
এক সেনাপতি বলেন—“আমি সন্ধির পক্ষেই রায় দিব।”
আরেক সেনাপতি বলেন, “যে ফিৎনার মূলোৎপাটন করতে আমরা এসেছিলাম তা চিরতরে খতম হয়ে গেছে। এখন আমরা সন্ধি করলে কে আমাদের সম্মুখে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলবে?
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য সেনাপতিদের সাথে মতবিনিময় করে নিজের তাঁবুতে ফিরে আসেন এবং মুযাআকে জানান যে, তিনি সন্ধির জন্য প্রস্তুত। তৎক্ষণাৎ সন্ধিনামা লেখা হয়। এতে বনূ হানীফার পক্ষ হতে মুযাআ বিন মুরারাহ এবং খেলাফতের পক্ষ হতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সই করেন। এ সন্ধির একটি পয়েন্ট এই ছিল যে, ইয়ামামায় কোন লোককে যুদ্ধাপরাধী আখ্যা দিয়ে মুসলমানরা তাকে হত্যা করতে পারবে না।
