“আমি এই শর্তের উপর সন্ধির করাতে চেষ্টা করব।” মুযাআ বলে—কিন্তু ইবনে ওলীদ। নিজের বাহিনীর নাজুক অবস্থার কথা চিন্তা করুন।”
“অতিরিক্ত রক্তপাত থেকে আমি দূরে থাকতে চাই।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তুমি কি চাওনা, আমাদের এবং তোমাদের যারা এখনও জীবিত আছে তারা জীবিত থাকুক। নিজ গোত্রে গিয়ে দেখ, আজ কত হাজার বধূ বিধবা এবং কত হাজার সন্তান ইয়াতিম হয়েছে এবং এটাও মাথায় রেখ যে, বনূ হানীফার কত মহিলা আমাদের বাঁদী হতে চলেছে।”
সে যুগের পাণ্ডুলিপি হতে জানা যায় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এই কথা শুনে মুযাআর ঠোঁটে এমন মুচকি হাসি খেলে যায়, যার মধ্যে ঠাট্টা কিংবা বিদ্রূপের আভাস ছিল। সে আর কথা বাড়ায় না। ইয়ামামায় যেতে উঠে দাঁড়ায়।
মুযাআ বলে—“আমি তাহলে চলি। ইবনে ওলীদ! আপনার অভিলাষ পূরণ করতে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুযাআকে বিদায় দিয়ে নিজের তাঁবুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তিনি পথিমধ্যে লাশ এবং তাঁবু নিরীক্ষণ করতে করতে চলছেন। লায়লা দূর থেকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একা দেখে দৌড়ে চলে আসেন।
“আপনি তাকে ছেড়ে দিয়েছেন?” লায়লা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে জানতে চান।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বুঝিয়ে বলেন যে, তিনি কোন উদ্দেশ্যে মুযাআকে ছেড়ে দিয়েছেন।
লায়লা বলেন—“ইবনে ওলীদ! এত মানুষের হত্যার দায়-দায়িত্ব কার উপর বর্তাবে? একসাথে এত লাশ আমি ইতোপূর্বে দেখিনি।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গভীর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন—“পৃথিবীতে যতদিন পর্যন্ত মানুষের মাঝে ব্যক্তি হীনস্বার্থ হাসিলের মানসিকতা বিদ্যমান থাকবে ততদিন পর্যন্ত মানুষের রক্ত এভাবে ঝরতেই থাকবে। আমি নিজেও একত্রে এত লাশ দেখিনি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর চেয়েও অধিক লাশ দেখবে। সত্য মিথ্যার সংঘর্ষ চলতেই থাকবে।…আমি এ জন্যই সন্ধির চেষ্টা করছি। যেন আর রক্তপাতের ঘটনা না ঘটে।…তুমি আর সামনে এগিয়ো না। সামনের দৃশ্য তুমি বরদাশত করতে পারবে না।”
ইতোমধ্যে আকাশের বুক চিরে শকুনের পাল বিমানের মত নেমে এসে লাশের দেহ খাবলি দিয়ে খেতে শুরু করে। কতক মুসলমান লাশের স্তূপের মাঝে আহত সাথীদের তল্লাশী ও উদ্ধার কাজ করছিল। আহতদের উদ্ধার করে ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাকী সৈন্যরা বনূ হানীফার লুকানো লোকদের গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল।
রাতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সংবাদ পেতে থাকেন যে, বনূ হানীফার লোকদের আনা হচ্ছে। অনেকের সাথে স্ত্রী-সন্তানও ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মহিলা এবং বাচ্চাদেরকে ঠাণ্ডা ও ক্ষুধা হতে রক্ষা করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু পূর্বেই তাঁবু লুণ্ঠনের শিকার হওয়ায় সেখানে খাদ্যের মারাত্মক সংকট ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বন্দী নারী ও শিশুদের উদরপুর্তি করার এবং নিজেদের উপবাস থাকার নির্দেশ দেন।
খাদ্য সংকট সাময়িকভাবে কাটিয়ে উঠতে এই প্রক্রিয়া অবলম্বন করা হয় যে, শহীদ মুজাহিদদের দেহের সাথে বাঁধা খেজুর ইত্যাদির থলে খুলে এনে তা দ্বারা বন্দী নারী-শিশুদের আপ্যায়ন করবে। যুদ্ধের সময় প্রত্যেক সৈন্য পানাহারের হাল্কা ব্যবস্থা সাথে রাখতেন।
পর প্রভাতে মুযাআ ইয়ামামা থেকে ফিরে আসে এবং সোজা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তাবুতে গিয়ে হাজির হয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান, “কি সংবাদ নিয়ে এলে ইবনে মুরারাহ।”
মুযাআ জবাবে বলে, “খবর মন্দ নয়। কিন্তু তা হয়ত আপনার মনঃপুত হবে না।…বনূ হানীফা পূর্বোক্ত শর্তে সন্ধি করতে প্রস্তুত নয়। তারা আপনাদের গোলামী করতে রাজি নয়।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “খোদার কসম! আমি তাদেরকে আমার গোলাম বানাতে চাই না। আমরা সবাই আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারী। আমি তাদেরকে এই সত্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আকীদা-বিশ্বাসের গোলাম বানাতে চাই।”
মুযাআ বলে, “তারা এ শর্তও মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এ কথাও বিবেচনায় রাখবেন যে, আপনার সৈন্য মুষ্টিমেয় বৈ নয়। আমি ইয়ামামায় ঢুকে সুসজ্জিত একটি বাহিনী দেখেছি, যারা আপনার এই ক্ষুদ্র বাহিনীকে রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দিতে প্রস্তুত হয়ে আছে। ইয়ামামায় গিয়ে অবরোধ করার মত বোকামী করবেন না। তাহলে আস্ত ফিরবেন না। আবেগ ছেড়ে বাস্তবে আসুন। বিচক্ষণতার পরিচয় দিন। শর্ত নমনীয় করুন। আমি বনূ হানীফাকে অনেকটা ম্যানেজ করে ফেলেছি। সেখানকার প্রতিটি সৈন্যের চোখে প্রতিশোধের রক্ত টগবগ করছে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গভীর চিন্তায় ডুবে যান। মুযাআ তাকে নতুন কোন কথা বলে না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও দেখেছিলেন যে, তার বাহিনীর যারা বর্তমানে বেঁচে আছে তারা যুদ্ধের জন্য মোটেও উপযোগী নয়। তাদের যথেষ্ট আরামের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা রাতভর লুকিয়ে থাকা শত্রুদের অনুসন্ধান এবং বন্দী করতে থাকে। দীর্ঘ পরিশ্রম আর অনিদ্রায় রাত যাপনের দরুণ সকালে মুজাহিদদের মাথা রীতিমত ঢুলতে থাকে।
