“আপনি আমার একটি প্রস্তাব মেনে নিলে আমি কেল্লায় গিয়ে সন্ধির আলোচনা করতে পারি”—মুযাআ বলে—“আশা করি আমার গোত্র আমার কথা ফেলবে না।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ্য সেনাপতি ছিলেন। সমর নেতৃত্বে তার উপমা তিনি নিজেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তিনি আবেগ দ্বারা পরিচালিত হতেন না। বড়ই চৌকস এবং বাস্তববাদী লোক ছিলেন। দুশমনকে কেবল ময়দানে হারিয়ে দেয়াকেই তিনি বিজয় মনে করতেন না, বরং পলায়নপর শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করে তাদের এলাকা করায়ত্ত করতে পারাই ছিল বিজয়ের পূর্ণাঙ্গতা। তার নীতি ছিল, দুশমনকে জ্যান্ত সাপ মনে কর। তার মস্তক পিষ্ট করেও একবার চেয়ে দেখ যে, মৃদু নড়াচড়াও সে করে কি-না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাঝে নেতৃত্ব দানের যোগ্যতা ছিল স্বভাবজাত। কিভাবে দক্ষ হাতে সৈন্য পরিচালনা করতে হয় তা তিনি ভাল করেই বুঝতেন। নিয়মতান্ত্রিকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত কট্টর। এতদসত্ত্বেও কোন জটিল পরিস্থিতি সামনে এলে তিনি সহ সেনাপতিদের ডেকে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। মুযাআ বিন মুরারাহ সন্ধির প্রস্তাব তুললে তিনি একদিকে শত্রুদের পিছুহটা এবং অপরদিকে মুজাহিদদের লড়াইয়ের অনুপযুক্ততার বিষয়টি সামনে রেখে বাস্তবসম্মত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে নায়েব সালারদের ডেকে পাঠান। তারা জমা হলে তাদের সামনে উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং সকলকে জানান যে, বনূ হানীফার এক সর্দার-মুযাআ বিন মুরারাহ-সন্ধির প্রস্তাব পেশ করছে।
“আসল ফিৎনা শেষ”—হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “মুসাইলামার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বনূ হানীফার মনোবল ভেঙ্গে গেছে। দুশমনকে কোন প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে এখনই ইয়ামামার কেল্লা অবরোধ করাকে আমি ভাল মনে করছি।”
“কেবল ইয়ামামা নয়”—হযরত আব্দুর রহমান বিন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“বনূ হানীফা যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ছোট ছোট কেল্লায় আত্মগোপন করেছে। প্রথমে তাদের বন্দী করা জরুরী। এরপরে সন্ধির আলোচনায় বসা যেতে পারে।”
“সন্ধির শর্তাবলী অবশ্যই আমাদের হতে হবে”—হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
‘সৈন্যদের দৈহিক নাজুক অবস্থার কথা তোমরা ভেবেছ কি?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“শহীদ এবং আহত সৈন্যের গণনা এখনও চলছে। খোদার কসম! এ পর্যন্ত কোন যুদ্ধ আমাদের এত রক্ত পান করেনি, এ যুদ্ধ পান করল এবং হয়ত সামনে আরও রক্ত দিতে হতে পারে।…এটা কি ভাল হয় না যে, পরাজিত শত্রুরা যারা এখানে ওখানে লুকিয়ে আছে তাদের খুঁজে বন্দী করা হোক, যাতে তারা ইয়ামামার কেল্লায় গিয়ে আমাদের মোকাবিলা করার সুযোগ না পায়?”
“অবশ্যই এটা যথোচিত প্রস্তাব”—হযরত আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তাদের বন্দী করতে পারলে সন্ধিরও বিশেষ কোন যৌক্তিকতা থাকবে না।”
“মুযাআ দাবী করছে যে, যাদের সাথে আমাদের লড়াই হয়েছে তাদের চেয়ে আরো বেশী সৈন্য নাকি ইয়ামামার অভ্যন্তরে বিদ্যমান।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তোমরা আমার এই কথা সত্য বলে মনে কর যে, আমাদের সৈন্যরা ক্লান্ত-শ্রান্ত; লড়াইয়ের উপযুক্ত নেই। তোমরা আরো দেখেছ, আমাদের মুজাহিদরা ক্লান্তিতে এতই ভেঙ্গে পড়েছে যে, তারা যেখানেই জায়গা পাচ্ছে সেখানেই বসে পড়ছে এবং গভীর নিদ্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রিজার্ভ কোন বাহিনীও নেই। সৈন্য চেয়ে পাঠালেও তাদের আসতে অনেক দিন লেগে যাবে। ইতোমধ্যে শত্রুপক্ষ পুরোদমে সুসংগঠিত ও ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। ফলে তাদের মানসিকতায় আমরা যে চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি তা আর বাকী থাকবে না। তারা নয়া শক্তিতে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারে।”
“ইবনে ওলীদ!” হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আপনি নিজেও হয়ত এ ব্যাপারে কিছু চিন্তাভাবনা করেছেন।”
“হ্যাঁ, ইবনে উমর।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন—“আমার পরিকল্পনা ছিল প্রথমে এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের বন্দী করা হবে এরপর গিয়ে আমরা ইয়ামামা কেল্লা অবরোধ করব। এর মধ্যে মুযাআ ইয়ামামায় গিয়ে অন্যান্য নেতাদের সাথে সন্ধির ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করবে। সন্ধির মধ্যে এই শর্ত অবশ্যই থাকবে যে, বনূ হানীফা পরাজয় স্বীকার করে আমাদের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করবে।”
“এটাই ভালো।” হযরত আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
“আমার কাছেও এ প্রস্তাব যথোচিত মনে হয়।” হযরত আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তাহলে এ পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ এখনই শুরু করে দাও।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“সৈন্যদের এদিক-ওদিক পাঠিয়ে দিয়ে বল, বনু হানীফার পুরুষ, মহিলা, বাচ্চা যাকেই যেখানে দেখবে বন্দী করে নিয়ে আসবে।”
বিভিন্ন প্লাটুন চতুর্দিকে পাঠিয়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুযাআকে নিজের সামনে এনে বসান।
“ইবনে মুরারাহ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুযাআকে বলেন—“তোমার উপর আমার আস্থা আছে। আর আমি তোমাকে এ কাজের যোগ্যও মনে করি। যাও, অন্যান্য নেতাদের গিয়ে বল, আমরা সন্ধির জন্য প্রস্তুত। কিন্তু শর্ত হলো, তোমাদের হাতিয়ার পূর্ণ সমর্পণ করতে হবে।”
