“ওহ্, ওলীদের পুত্র।” মুযাআ বিন মুরারাহ বলে—“আমি মুসাইলামার নবুওয়াতকে আন্তরিকভাবে কখনো স্বীকৃতি দিই নি। সে বাকশক্তির জোর এবং যাদুর কারসাজি ও ভেল্কিবাজি দেখিয়ে নবী হয়ে গিয়েছিল। আপনি তার মুরীদ ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যাও দেখেছেন। আমি তাকে নবী বলে মেনে না নিলে সে আমার পুরো গোত্রকে জীবন্ত পুড়ে মারত। গোত্র থেকে আমি নিজেকে বিচ্ছিন্নও করতে চাইনি। এখন যদি আপনি আমাকে হত্যার নির্দেশ দেন, তবে এটা সম্পূর্ণ অন্যায় হত্যা হবে।”
“যারা আমাদের তাঁবু লুটতে এবং ধ্বংস করতে এসেছিল এ লোকটি তাদের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়েছে”—লায়লা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানান—“লোকটি লুটেরাদের এই বলে নিবৃত্ত করেছিল যে, আগে পুরুষদের পশ্চাদ্ধাবন কর…। তারা চলে যায়। লোকটি তাদেরকে এ কথাও বলে না যে, আমার পায়ের বেড়ি খুলে দাও।”
“এ নারীর প্রতি তোমার অনুগ্রহের কারণ কি মুযাআ?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন।
“কারণ, আমার গোত্র আমাকে যে সম্মান করে একজন যুদ্ধবন্দী হওয়া সত্ত্বেও ইনি আমার সাথে তদ্রূপ সম্মানজনক আচরণ করেছেন।” মুযাআ বলে—“তিনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন আমি তার বদলা দিতে চেষ্টা করেছি মাত্র।…আমি চাইলে এমনটি করতে পারতাম যে, আমার লোকদেরকে পায়ের বেড়ি খুলে দিতে বলতাম অতঃপর আপনার এই অপরূপ সুন্দর স্ত্রীকে নিয়ে নিজের বাঁদী করে রাখতাম?”
“নিঃসন্দেহে তুমি সম্মানের উপযুক্ত মুযাআ।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কৃতজ্ঞতার স্বরে বলেন—“আমি নিজেই তোমার পায়ের বেড়ি খুলে দিচ্ছি। তুমি আমার সাথে যাবে এবং মুসাইলামার লাশ শনাক্ত করে আমাকে দেখাবে।”
॥ একুশ ॥
মুযাআ বিন মুরারাহ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে তাবু হতে বের হওয়ার সময় তার পায়ে বেড়ি ছিল না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইরে এসে দেখেন যে, তার দুই নিরাপত্তা কর্মী দাঁড়ানো। তিনি তাঁবুতে আসার সময় তাদের অবগত করানোর সুযোগ পান নাই। এদিকে নিরাপত্তাকর্মীরা শুধু এতটুকুই জানতেন যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এদিকে কোথাও এসেছেন। কিছুক্ষণ পর নিরাপত্তা বাহিনী জানতে পারে যে, সেনাপতি এদিকে নেই। তিনি অন্য পথে কোথায় যেন চলে গেছেন। তারা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। দুই নিরাপত্তাকর্মী এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে তার তাবু পর্যন্ত এসে পৌঁছান। তাঁবুর অভ্যন্তরে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আওয়াজ শুনে তারা নিশ্চিত হয় যে, তিনি এখানেই আছেন। ফলে তারা তাঁবুর বাইরে অবস্থান গ্রহণ করে। সেনাপতিকে শত্রু সমৃদ্ধ এলাকায় এভাবে একাকী ছাড়ার পক্ষপাতী তারা ছিল না।
মুযাআ স্বচক্ষে রণাঙ্গনের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে। তারই গোত্রের সারি সারি লাশ ছাড়া তার চোখে আর কিছু পড়ে না।
“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না”—মুযাআ বিস্ময়কর কণ্ঠে বলে—“চাক্ষুষ দেখেও আমার বিশ্বাস হতে চাচ্ছে না।…মুষ্টিমেয় মুসলমান এক বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে?”
“এটা মানুষের বিজয় নয়”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“এটা সত্য আকীদা-বিশ্বাস এবং আল্লাহ্র সত্য রাসূলের বিজয়। বনূ হানীফা ভ্রান্ত বিশ্বাস লালন করে ময়দানে নেমেছিল। আমাদের তরবারী ঐ ভ্রান্ত আকীদাকে কেটে কুচিকুচি করেছে। ফলে সংখ্যায় তারা বিশাল হওয়া সত্ত্বেও পালিয়ে গেছে।”
তারা লাশের স্তুপ এবং অসংখ্য আহতদের ডিঙিয়ে বাগিচায় গিয়ে পৌঁছে। ভেতরে ঢুকলে সেখানেও লাশের পর লাশ পড়ে ছিল। মুসলমানরা নিহতদের অস্ত্র জমা করছিল। বনূ হানীফার মধ্য হতে যারা জীবিত ছিল তারা এদিক-ওদিক পালিয়ে গিয়েছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত ওয়াহশী বিন হারব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন যে, মুসাইলামা মনে করে যাকে সে ঘায়েল করেছে তার লাশ কোথায়? হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ঘটনাস্থলে নিয়ে যান। মুসাইলামার লাশের কাছে গিয়ে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু ইশারা করে দেখান।
“না”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে বলেন—“এই খর্বাকৃতির এবং কুৎসিত লোক কখনো মুসাইলামা হতে পারে না। এর চেহারা বড়ই কদর্য।”
“এটাই”—মুযাআ বলে—“এটাই মুসাইলামার লাশ।”
“যে ব্যক্তি হাজার হাজার লোককে ভ্রষ্টতার গোলক ধাঁধায় নিক্ষিপ্ত করেছে এটা তারই লাশ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“লোকটি আপাদ-মস্তক এক ফেৎনাই ছিল।”
“ইবনে ওলীদ!” মুযাআ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সম্বোধন করে বলে—“বিজয় লাভে আত্মতুষ্ট হবেন না। আপনার জন্য আসল মোকাবিলা সামনে অপেক্ষমাণ।”
“কার সাথে?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করেন।
“বনূ হানীফার সাথে”—মুযাআ জবাবে বলে—“যারা ময়দানে এসে লড়াই করেছে তারা বনূ হানীফার এক ক্ষুদ্রাংশ মাত্র। আরো বিশাল বাহিনী ইয়ামামায় কেল্লার অভ্যন্তরে প্রস্তুত হয়ে আছে। নিজেদের প্রাণহানি দেখুন এবং চিন্তা করুন যে, আপনার এই মুষ্টিমেয় সৈন্য কি কেল্লার তেজোদ্যম বিশাল বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারবে? তদুপরি আপনার সৈন্য ক্লান্তিতে ভেঙ্গে পড়েছে।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লাশে আটা পূর্ণ বাগিচায় নজর ফিরান। তার সৈন্যরা বাস্তবেই লড়ার উপযোগী ছিল না। জানবাজি রাখার মত পরিস্থিতি বর্তমানে ছিল না বললেই চলে। আহত সৈন্যের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। যারা অক্ষত ছিল তারাও এমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল যে, যেখানেই খালি জায়গা পায় সেখানেই শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তিনগুণ বেশী সৈন্যের সাথে তারা সারাদিন বীর-বিক্রমে লড়েছে। তাদের রেস্টের খুবই প্রয়োজন ছিল।
