মুসাইলামার নিহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে মুরতাদ বাহিনী প্রাণ রক্ষার্থে পলায়নের পথ খোঁজে। তারা ইতোপূর্বেও পালিয়ে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। প্রথম থেকেই মুসলমানরা তাদের কাছে ভয়ংকর দানব ছিল। বাগিচায় এসে আরো এক হাজার মুরতাদ প্রাণ হারায়। তারা এখানে এসে এমনভাবে যুদ্ধ করে যেন পূর্ব থেকেই হেরে বসে আছে। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও তারা শেষ রক্তবিন্দু উজাড় করে লড়াই জারী রাখে। কিন্তু নবী নিহত হওয়ার সংবাদ কানে গেলে তাদের সর্বশেষ শক্তিটুকুও লোপ পেয়ে যায়। হাতে অস্ত্র থাকলেও বাহুর শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তারপরেও অনেকে পলায়নের পথ পরিষ্কার করতে তরবারী হেলাতে-দুলাতে থাকে। পরাজয় তাদের দেমাগে এঁটে গিয়েছিল।
রণাঙ্গনের অনতিদূরে মুসলমানদের লুণ্ঠিত ও ধ্বংসপ্রায় ছাউনীর মাঝে মাত্র একটি তাঁবু বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন একটি পরিচিত ঝড় এসে সেনাপতি ব্যতীত বাকী ছাউনীতে ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। অক্ষত তাবুটি ছিল সেনাপতি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর। বনূ হানীফা প্রথম দিকে জয়লাভ করে মুসলিম সেনাছাউনীতে এভাবে টর্নেডোর মত আঘাত হেনে সব চুরমার করে দিয়েছিল। তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তাঁবুতেও গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাদের সর্দার মুযাআ লোহার বেড়ি পরিহিত অবস্থায় বন্দী ছিল। তাঁবুতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর স্ত্রী লায়লাও ছিল। সৈন্যরা লায়লাকে হত্যা করতে কিংবা ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল কিন্তু মুযাআ তাদেরকে এই বলে ক্ষান্ত করেছিল যে, আগে পুরুষদের দিকে ধাবিত হও। নারীদের প্রতি চোখ তুলে তাকাবার সময় এখনও আসেনি। তারা সর্দারের নির্দেশে তাবু ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। এভাবে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তাবু অক্ষত থেকে যায়।
হযরত খালিদ পত্নী লায়লা তাঁবুর বাইরে একটি উটে বসা ছিলেন। কোথাও যাবার ইচ্ছা তার ছিল না। তিনি উঁচু হয়ে রণাঙ্গনের অবস্থা নিরীক্ষণ করছিলেন। ময়দান ছিল জনশূন্য। বাগিচার উঁচু প্রাচীর আর গগনমুখী বৃক্ষের অগ্রভাগ তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন কিন্তু বাগিচার অভ্যন্তরের দৃশ্য ছিল তার দৃষ্টির বাইরে। তিনি উট থেকে নেমে আসেন এবং সোজা তাঁবুর ভিতরে চলে যান।
“ইবনে মুরারাহ!” লায়লা মুযাআকে বলেন—তোমাদের নবী রণাঙ্গন ফেলে চলে গেছে। খোদার কসম। বনু হানীফা পলায়ন করেছে।”
“আমি কোনদিন শুনিনি যে ১৩ হাজার সৈন্য ৪০ হাজার সৈন্যকে পরাস্ত করেছে।” মুযাআ বলে, “রণাঙ্গণ ছেড়ে যাওয়াটা মুসাইলামার নয়া কৌশল হতে পারে, পিছপা নয়।”
“উভয় পক্ষ এখন বাগিচার অভ্যন্তরে।” লায়লা মুযাআকে জানান—“সবাই বাগিচায় ঢুকে থাকলে সেখান থেকে বনূ হানীফাই কেবল প্রাণ নিয়ে বের হবে।” মুযাআ বিন মুরারাহ আশ্চর্যের ভঙ্গিতে বলে—“আমার গোত্রের পিছু পিছু মুসলমানরা সত্যই যদি বাগিচায় ঢুকে থাকে, তাহলে নিশ্চিত মনে রেখ, মৃত্যুই তাদেরকে ওখানে টেনে নিয়ে গেছে। বনূ হানীফা জয়ের ঊর্ধ্বে।
“আজ চূড়ান্ত ফায়সালা হয়ে যাবে”—লায়লা বলে—অপেক্ষা কর…ঘোড়ার ঘণ্টাধ্বনি আমি শুনতে পাচ্ছি। আমার স্বামীর দূতই হবে”—এই বলে লায়লা তাবু হতে বেরিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ায় এবং একটু পরে আনন্দচিত্তে বলেন—“দূত নিশ্চয় বিজয়ের খবর আনছে…এই তো সে এলো!”
॥ বিশ ॥
ঘোড়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে একেবারে লায়লার নিকটে এসে দাঁড়ায়। ঘোড়া থামতেই আরোহী লাফিয়ে নীচে নেমে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই ছিলেন এই আরোহী। লায়লা তাকে একা দেখে প্রথমত খুব ঘাবড়ে যান। কারণ, সেনাপতির এভাবে ফিরে আসা এটাই প্রমাণ করে যে, তার অধীনস্ত সৈন্যরা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে হারিয়ে পালিয়ে গেছে।
“রণাঙ্গনের কি খবর?” লায়লা উদ্বেগের সাথে জানতে চায়—আপনি একা এসেছেন কেন?”
“খোদার কসম! আমি বনূ হানীফাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছি।” হযরত খালিদ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন—মুসাইলামা কাজ্জাব মারা গেছে।…সে কয়েদী কোথায়?”
লায়লা বিজয়ের সুসংবাদে হস্তদ্বয় উপরে তুলে আকাশ পানে তাকায় এবং প্রশান্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলেন—“মুযাআ বলছিল, বনূ হানীফা না-কি জয়ের ঊর্ধ্বে।”
“আমি জানতে চাচ্ছি সে এখন কোথায়? হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হাফ ফেলতে ফেলতে জিজ্ঞাসা করেন—তারা তাকে মুক্ত করে নিয়ে গেছে।”
“আমি এখানে ওলীদ পুত্র!” তাঁবুর অভ্যন্তর হতে মুযাআর কণ্ঠ ভেসে আসে—“আমি আপনার এ দাবী সত্য বলে বিশ্বাস করি না যে, মুসাইলামা নিহত হয়েছে।”
“আমার সাথে চল মুযাআ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁবুর মধ্যে প্রবেশ করে বলেন—“তোমার কথা সত্যও হতে পারে। আমি মুসাইলামাকে চিনি না। তোমার গোত্রই এই চিৎকার করতে করতে পালিয়ে গেছে যে, মুসাইলামা মারা গেছে। আমার সাথে এস। অসংখ্য লাশের মাঝে তার লাশ চিহ্নিত করে আমাকে বল যে, এটা তার লাশ।
তার কি হবে? মুযাআ জিজ্ঞাসা করে—“আমাকে মুক্ত করে দিবেন?”
“খোদার কসম!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমি ঐ গোত্রের এক নেতাকে স্বাধীন ছেড়ে দিব না, যে আমার দ্বীনের দুশমন। রেসালাতের মধ্যে অংশীর দাবীদার এবং এ দাবী সমর্থনকারীকে আমি কিভাবে ক্ষমা করতে পারি? আল্লাহ ছাড়া কেউ তোমাকে ক্ষমা করতে পারে না।”
