হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাঁটি অনুরাগী ও ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরেও তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যথা মুছে তার হৃদয় জয় করতে পারেন নি। এতে তিনি চরম মর্মাহত ও আত্মবিদগ্ধ হন। সারা জীবন তিনি এই দুঃখের বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়ান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিস্পৃহ আচরণ তাঁকে মর্মে মর্মে পুড়িয়ে মারে। তিনি সহ্য করতে পারেন না। মক্কা ছেড়ে চলে যান এবং দীর্ঘ দুই বছর পর্যন্ত তায়েফের এখানে-ওখানে কাটান। এ সময় নিরবতা তাকে গ্রাস করে নেয়। সর্বদা গভীর চিন্তায় ডুবে থাকেন। তিনি আন্তরিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। শত বেদনার মাঝেও তিনি ঈমান আঁকড়ে থাকেন।
দু’বছর পর অশান্ত হৃদয় শান্ত করতে তিনি মুসলিম বাহিনীতে শামিল হয়ে যান। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন। ইয়ামামা যুদ্ধ চলাকালে তিনি জানতে পারেন যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসাইলামাকে হত্যার চেষ্টায় রত। তিনি সেনাধ্যক্ষের ইচ্ছাকে নিজের কর্তব্য নির্ধারিত করেন এবং আল্লাহর ফজলে সে কর্তব্য যথাযথ পালন করে দেখান।
এরপর হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীতে নিয়মিত থাকেন এবং পরপর কয়েকটি রণাঙ্গনে অভূতপূর্ব শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন করেন। সিরিয়া বিজয়ের পর তিনি ইসলামী বাহিনী হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে হিমসে গিয়ে কোলাহলমুক্ত জীবন-যাপন করতে শুরু করেন। ঐতিহাসিকগণ তার এ হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ সম্বন্ধে লেখেন যে, হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হত্যার অপরাধ পাহাড়ের মত রূপ ধারণ করে তাঁর অন্তরে চেপে বসেছিল। তিনি শরাব পান করতে শুরু করেন। কিন্তু তা বিলাসিতার কারণে ছিল না; বরং নিজেকে ভুলে যেতেই তিনি এ পন্থা বেছে নেন। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজ শাসনামলে শরাব পানের অপরাধে তাকে ৮০ দোররা মেরে ছিলেন। কিন্তু এতে তার মাঝে কোন পরিবর্তন সাধিত হয় না। তিনি রীতিমত শরাব পান করতে থাকেন।
জীবনের শেষের দিকে এসে তার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ দলে দলে শ্রদ্ধাভরে তার সাক্ষাতে আসতে থাকে। কিন্তু তিনি বেশিরভাগ সময় অস্বাভাবিক থাকতেন। স্বাভাবিক হলে মানুষকে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুসাইলামার হত্যার কিস্সা শোনাতেন। মানুষ দলে দলে এই কিস্সা শুনতেই তার কাছে ভীড় জমাত। তিনি অনেকবার বর্শা হাতে নিয়ে বলেন—“অমুসলিম থাকা অবস্থায় এই বর্শাঘাতে আমি এক সর্বোত্তম ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। অতঃপর মুসলমান হয়ে এই বর্শাঘাতেই এক সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তিকে জাহান্নামে পাঠিয়েছি।”
॥ উনিশ ॥
এক বিশিষ্ট ভদ্র মহিলার নাম উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা। উহুদ যুদ্ধে তিনি ঐ মুসলিম নারীদের একজন ছিলেন, যারা আহতদের সেবা-শুশ্রূষার উদ্দেশ্যে সৈন্যদের সাথে গিয়েছিলেন। যুদ্ধ এক পর্যায়ে কুরাইশদের অনুকূলে চলে গিয়েছিল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লক্ষ্য করে প্রবল বেগে হামলা করে বসে। সাহাবায়ে কেরাম মানববর্ম রচনা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঘিরে রেখেছিলেন। কিন্তু শত্রুর আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিরাপত্তা বাহিনীর বৃত্ত ভেঙ্গে যায়। ইবনে কুময়া নামক এক কুরাইশ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ডানে হযরত মুছআব রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন। এ সময় হযরত উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা নিকটে কোথাও ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বিপদের মুখে দেখে আহতদের সেবা ও পানি পান ছেড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পানে দৌড়ে আসেন। তিনি যাবার পথে কোন লাশ বা মারাত্মক আহত কোন ব্যক্তির হাত হতে তলোয়ার উঠিয়ে নিয়ে যান।
ইবনে কুময়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আক্রমণ করার পরিবর্তে তার দেহরক্ষী হযরত মুছআব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে ধাবিত হয়। হযরত মুছআব রাযিয়াল্লাহু আনহু বীরত্বের সাথে তার মোকাবিলা করেন। উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা ইবনে কুময়ার কাঁধ লক্ষ্য করে তরবারীর আঘাত হানেন। কিন্তু সে বর্মাচ্ছাদিত থাকায় তরবারীর আঘাত ব্যর্থ হয়। ইবনে কুময়া ঘুরে পাল্টা হামলা চালায়। আঘাত এত জোরাল ছিল যে, তা হযরত উম্মে আম্মারার কাঁধে গিয়ে লাগলে তিনি মারাত্মক আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান। ইবনে কুময়া দ্বিতীয় আঘাত করে না। কেননা তার লক্ষ্য ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আক্রমণ করে তাকে ধরাশায়ী করা।
উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা নিজ পুত্রের সাথে ইয়ামামা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে আসেন। এ যুদ্ধেও তিনি দুঃসাহসিকতার পরিচয় দেন যে, নারী হয়েও তিনি মুসাইলামাকে হত্যার মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এতে তিনি মারাত্মক আহত হন। তার একটি হাত কাটা যায়।
৬৩২ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের শেষ লগ্ন। অন্যান্য বছর এ সময় ‘হাদীকাতুর রহমান’ সবুজ-শ্যামলিমা ও রঙ-বেরঙের মাঝে সুসজ্জিত একটি মায়াকানন থাকত। অকৃপণ হাতে সে এ সময় লোকদেরকে ফল-মূল উপহার দিত। ক্লান্ত পথিকবর এখানে এসে নির্ভয়ে বিশ্রাম নিত। নানা ফুলের সুগন্ধে কাননটি মুখরিত ও সুরভিত ছিল। কিন্তু এতদিনের সে জীবন্ত কাননটি এখন মৃত্যুকাননে পরিণত। তার সৌন্দর্যচ্ছটা আর রূপের বাহার মানুষের তাজা রক্তে ডুবে গিয়েছিল। তার লাবণ্য লাশের নীচে চাপা পড়েছিল। মোহিনী সৌরভ রক্ত আর ছিন্ন-ভিন্ন গোশতের উৎকট গন্ধে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। যেখানে পাখিরা কিচির-মিচির ধ্বনি তুলে গান করত সেখানে আজ আহতদের আর্তচিৎকার। আহত ঘোড়াগুলো বল্গাহীন হয়ে উদভ্রান্তভাবে দৌড়ে ফিরছিল। তাদের ব্যথাদীর্ণ হ্রেষারব ছিল মৃত্যুর ভয়ঙ্কর অট্টহাসির মত।
