হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু সামনে যেতে তৎপর। এরই মধ্যে ওয়াহশী পূর্ণ শক্তিতে বর্শা নিক্ষেপ করে। ব্যবধান খুবই কম ছিল। বর্শা পেটের এত গভীরে প্রবেশ করে যে, তার ছুঁচালো মাথা পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে যায়। অতর্কিত এ ভয়ানক আক্রমণে তিনি সাথে সাথে লুটিয়ে পড়েননি। এদিক-ওদিক নজর ঘুরিয়ে হত্যাকারীকে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করেন। নজর ঘুরিয়ে ওয়াহশীকে দেখতে পান। পেটের বর্শা নিয়েই তিনি তার দিকে ছুটে যান। ওয়াহশী নিজ স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকে। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু বেশি দূরে যেতে পারেননি চার-পাঁচ কদম গিয়েই জমিনে লুটিয়ে পড়েন। ওয়াহশী দূরে দাঁড়িয়েই তার শরীরের নড়াচড়া প্রত্যক্ষ করতে থাকে। নিথর হয়ে গেলে ওয়াহশী তাঁর মৃতদেহের নিকটে আসে। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়ে যান। ওয়াহশী তাঁর শরীর থেকে বর্শা খুলে চলে যায়। সে ফিরে গিয়ে হিন্দা এবং মনিব জুবাইর বিন মুতঈমকে তালাশ করতে থাকে।
♣♣♣
উহুদের বিভিন্ন চিত্রগুলো খালিদের স্মৃতিপটে যতই ভাসতে থাকে তার অন্তর ততই ভারাক্রান্ত হয়। অশ্ব তাকে নিয়ে চলছিল আপন মনে। নিম্নাঞ্চল অতিক্রম করায় উহুদের পর্বতশৃঙ্গ দৃষ্টি থেকে আড়াল হয়ে গিয়েছিল। তাঁর গোত্রের নারীদের কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। তারা কুরাইশ ও সমমনা গোত্রের মধ্যে বীরত্ব ও রক্তে ত্যাজ সরবরাহ করছিল। খালিদের আরো মনে পড়ে যে, তিনি যুদ্ধের পুরো দৃশ্য নিজচক্ষে দেখার জন্য নিকটবর্তী একটি উঁচু টিলায় আরোহণ করেন। এখান থেকে তিনি মুসলিম নারীদের দেখতে পান। রণাঙ্গন থেকে আহতদের নিয়ে এসে তাদের হাতে সোপর্দ করা হত। তারাই তাদের সেবা যত্ন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করত। তৃষ্ণার্তদের পানি পান করাত। এ ধরনের মহিলার সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ চৌদ্দজন। নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন তাদের মধ্যে।
তীব্র সংঘর্ষ কিছুক্ষণ উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ চলে। কুরাইশদের জোশ ক্রমেই স্তিমিত হতে থাকে। এক সময় স্বল্পসংখ্যক মুজাহিদ বিশাল কুরাইশ বাহিনীর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। কুরাইশদের পতাকাধারী একজন নিহত হলে আরেকজন এসে পতাকা তুলে ধরত। এভাবে কয়েকবার পতাকা ভূলুণ্ঠিত হয়। শেষদিকে এক গোলাম এসে পতাকা তুলে ধরে, কিন্তু সেও নিহত হয় এরপর মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের আর কাউকেই পতাকা তোলার সুযোগ দেয়নি। কুরাইশরা রণে ভঙ্গ দেয়।
খালিদ কুরাইশ বাহিনীর পৃষ্ঠ প্রদর্শনের দৃশ্য চেয়ে চেয়ে দেখেন। মুসলিম বাহিনী কর্তৃক তাদের পিছু ধাওয়াও তার নজরে আসে। কুরাইশরা রণে ভঙ্গ দিয়ে সেনা ক্যাম্পেও দাঁড়ায়নি। জিনিসপত্র ফেলে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সকলেই পলায়ন করে। মুসলমানরা বিজয়ের আনন্দে এবং প্রতিশোধের স্পৃহায় কুরাইশদের ক্যাম্পের উপর চড়াও হয়। আনন্দ-শ্লোগান আর বিজয়-উল্লাসে চারদিক মুখরিত করে তোলে মুসলমানরা। কুরাইশরা এমন ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পলায়ন করে যে, ভাগার সময় মহিলাদের ব্যাপারে চিন্তা করার সুযোগও তারা পায়নি। বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটেই তারা পালাতে থাকে কিন্তু মুসলমানরা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি।
অশ্বারোহী দু’দলের কমান্ডার ইকরামা। আর অপর দলের কমান্ডার খালিদ নিজে। তাদের লক্ষ্য ছিল, পার্শ্ব-বাহিনীকে আক্রমণ করে পর্যদস্ত করে দেয়া। তারা সুযোগ খুঁজতে ছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে যুদ্ধের গতি অন্য দিকে মোড় নেয়। যুদ্ধ কুরাইশদের সম্পূর্ণ প্রতিকূল অবস্থানে চলে যায়। তারপরেও ইকরামা ও খালিদ নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে পূর্বের জায়গায় অবস্থান করতে থাকে। চরম নৈরাশ্যজনক এ অবস্থার মধ্যেও খালিদের আশা ছিল যে, তিনি শেষ পর্যন্ত পরাজয়কে বিজয়ে বদলে দিতে পারবেন। তিনি সম্মুখ দিক হতে নয়; বরং এক পার্শ্ব দিয়ে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে অপেক্ষমাণ ছিলেন। কিন্তু এটা মোটেও সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। এর জন্য মরণ ফাঁদের ন্যায় এক সংকীর্ণ সুড়ঙ্গ অতিক্রম করা আবশ্যক ছিল। সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে যেতে একবার উদ্যেগও নিয়েছিলেন, কিন্তু আগে প্রস্তুত মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী তাদের অগ্রযাত্রা রুখে দেয়। তা সত্ত্বেও খালিদ এখনও এই সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহারের অপেক্ষায় প্রহর গুণতে থাকেন। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলনা। মোক্ষম সুযোগ এসে গেল।
তীরন্দাজ বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে কুরাইশদের পলায়নের দৃশ্য দেখতে থাকেন। পলায়নপর বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করে তাদের ধন-সম্পদ হস্তগত করাটাও তাদের নজর এড়ায় না। গনিমতের আশায় তীরন্দাজরা এক এক করে তাদের অবস্থান ছেড়ে চলে যায়। কমান্ডার আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। আমার দ্বিতীয় নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত কেউ স্থান ত্যাগ করবে না’– রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশটি দ্বিতীয়বার স্মরণ করিয়ে দেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেনি।
১.২ গনিমতের মাল
‘যুদ্ধ শেষ।” একথা বলতে বলতে তীরন্দাজ দলটি পাহাড়ের ঘাঁটি থেকে নিচে নেমে আসে–“গনিমতের মাল আমাদের। আমরা বিজয়ী হয়েছি”
কমান্ডারের সাথে থাকে মাত্র নয়জন তীরন্দাজ।
