বর্শার আঘাত এত মারাত্মক ছিল যে, পেট থেকে বর্শা বের করার শক্তি পর্যন্ত মুসাইলামার হাতে ছিল না। রক্তঝরা গভীর বর্শাঘাতে সে জমিনে লুটিয়ে পড়ে। এ আঘাতেই সে মারা যেত। কিন্তু হযরত আবু দাযানা রাযিয়াল্লাহু আনহু এর তলোয়ারের আঘাত তাকে ধুকে ধুকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে। তিনি মুসাইলামাকে জমিনে লুটিয়ে ছটফট করতে দেখে ঘাড়ে তলোয়ারের এমন এক আঘাত হানেন যে, এক আঘাতে তার মস্তক ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
হযরত আবু দাযানা রাযিয়াল্লাহু আনহু মস্তক বিচ্ছিন্ন লাশের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকেন। ইতোমধ্যে মুসাইলামার এক বডিগার্ড পশ্চাত হতে হযরত আবু দাযানার উপর এত জোরে আঘাত করে যে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং শাহাদাত বরণ করেন।
“বনূ হানীফা!” এক মুরতাদ চিৎকার করে বলে—“আমাদের নবীকে জনৈক কালো মোটা হাবশী হত্যা করেছে।”
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম লেখেন, বাগিচার অভ্যন্তরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাঝে এই আওয়াজ প্রতিধ্বনি হতে থাকে—“নবী নিহত…মুসাইলামা মারা গেছে।”
॥ আঠার ॥
মুসাইলামা কাজ্জাবের হত্যার সমুদয় কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর। তিনি এর কাঙ্ক্ষিত হত্যার মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় নিশ্চিত করেছিলেন। হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবন বড় বৈচিত্র্যময়। পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, তিনি মুসাইলামাকে যে অপূর্ব কৌশল ও দক্ষতার মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে উহুদ যুদ্ধে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শহীদ করেছিলেন। মক্কা বিজয় হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেও কয়েকজন নর-নারীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ঘোষণা করে তাদের সাধারণ ক্ষমার আওতাবহির্ভূত রাখেন। যুদ্ধাপরাধীদের লিস্টে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নামও ছিল। তিনি বিশেষ কোন সূত্রে টের পেয়েছিলেন যে, মুসলমানরা তাকে কিছুতেই জীবিত রাখবে না। তিনি প্রাণভয়ে তায়েফ গিয়ে সাকীফ গোত্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে মুসলিম বাহিনী সাকীফ গোত্রকে যে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল তার বিবরণ পাঠকবর্গ ইতোপূর্বে অবগত হয়েছেন। সাকীফ গোত্র পরাজিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে সেখানে আশ্রয়রত হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহুও ইসলামের সত্যতা মেনে নেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি বাইয়াত হতে এবং প্রাণভিক্ষা চাইতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে হাজির হন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কয়েক বছর পূর্বে দেখেছিলেন বিধায় সম্ভবত ভালভাবে চিনতে পারেন না। “তুমি সেই ওয়াহশী!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করেন।
“জী হুজর! আমি সেই ওয়াহশী” —তিনি জবাবে বলেন—“এখন আমি আপনাকে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস করি।”
“ওহ্, ওয়াহশী!” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে চান—বলতো তুমি কিভাবে হামযাকে হত্যা করেছিলে?
ঐতিহাসিকরা লেখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরোধে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হত্যার পুরো বিবরণ এমনভাষা ও ভঙ্গিতে বর্ণনা করেন, যেন তিনি শ্রোতাদের অন্তরে নিজের বীরত্ব আর রণদক্ষতার গভীর প্রভাব বিস্তার করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম গ্রহণের সুবাদে তাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু ইবনে হিশামের এক ভাষ্যে জানা যায় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন, তিনি যেন কখনো তার সামনে না আসেন। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কেবল চাচাই ছিলেন না; উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে তিনি বিরাট মর্যাদার অধিকারী এবং সামাজিক পর্যায়েও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মহৎপ্রাণ এবং ক্ষমার আধার হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ক্ষমা করে দিলেও অন্তরের অন্তঃস্থলে গভীর ক্ষত ঠিকই বিদ্যমান ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি যে ধরনের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন, ঠিক তেমনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ঐ হিন্দার প্রতিও, যার ইঙ্গিতে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু রক্তঝরা গভীর বর্শাঘাতে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শহীদ করেছিলেন। এরপরে গিয়ে হিন্দা ঐ লাশের সাথে অমানবিক আচরণ করেছিল। তাদের দু’জনের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসন্তুষ্টি ব্যক্তি বিদ্বেষ কিংবা শত্রুতার কারণে ছিল না; আর তা তার মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যশীলও নয়; বরং একজন মর্যাদাবান মুসলমানের মরদেহের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করাই ছিল তার সমস্ত বেদনা ও অসন্তুষ্টির মূল কারণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত হিন্দা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে বলেছিলেন, তোমরা আমার সামনে আসবে না। কারণ তোমাদের দেখলে আমার প্রিয় চাচা ও তার লাশের সাথে তোমাদের দুর্ব্যবহারের কথা মনে পড়ে যায়। মোটকথা, হৃদয়ের গহীনে ব্যথা থাকলেও তিনি হযরত ওয়াহশী ও হযরত হিন্দা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
