ঐতিহাসিকরা লেখেন, হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন অবিশ্বাস্যভাবে প্রচুর সংখ্যক মুরতাদকে নিহত ও আহত করে অবশেষে দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। কোন কোন ঐতিহাসিক অবশ্য এটাও লেখেন যে, হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুকরণে আরো কতিপয় মুজাহিদ দেয়াল টপকিয়ে বাগিচায় ঢুকে পড়েছিলেন। তারা তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে মুরতাদদের দূরে ভাগিয়ে দেয় এবং হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু দরজা খুলে দেন। এ ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক একমত যে, হযরত বারা বিন মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহুই সর্বপ্রথম দেয়াল টপকিয়ে বাগিচার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন।
দরজা খুলতেই মুজাহিদ বাহিনী বাধভাঙ্গা স্রোতের মত ভিতরে প্রবেশ করে। অনেক মুজাহিদ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশে প্রাচীরে উঠে পড়ে। তারা শত্রুদের উপর তীর বর্ষণ শুরু করে। যাতে তারা মুজাহিদদের অনুপ্রবেশে বিঘ্নতা সৃষ্টি করার সুযোগ না পায়। মুজাহিদরা অনায়াসে ভিতরে প্রবেশ করে বনূ হানীফার উপর বজ্রের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুরতাদরা পাইকারী হারে হত্যা হতে থাকে। তাদের পলায়নের পথ ছিল রুদ্ধ। তারা এখন প্রাণ বাঁচাতে লড়ে চলে। যদিও মিথ্যা নবী তবুও সে এখন তাদের সাথে। সে সৈন্যদের উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করে চলছিল আর সৈন্যরা প্রাণপণে লড়ছিল।
মুরতাদদের সংখ্যা প্রচুর হলেও দ্রুত সে সংখ্যা কমে আসতে থাকে। বাগিচা খুনের দরিয়ায় ভেসে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাথায় একটি চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, কিভাবে মুসাইলামাকে হত্যা করা যাবে। কারণ, সে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত লড়াই বন্ধ হবে না। কিন্তু মুসাইলামার কোন পাত্তা ছিল না। তার দৃষ্টি মুসাইলামাকে খুঁজে পায় না।
মুসাইলামা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারলেও আরেক মুজাহিদের দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারে না। তার অনুসন্ধানী দৃষ্টি মুসাইলামাকে ঠিকই খুঁজে বের করে। তিনি ছিলেন হাবশী গোলাম হযরত ওয়াহশী বিন হারব রাযিয়াল্লাহু আনহু। টার্গেটে বর্শা ছোঁয়াতে হযরত ওয়াহশীর সমকক্ষ সে যুগে আরবে কেউ ছিল না। তিনি ইতোপূর্বে তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এক নর্তকীর মাথায় একবার মিডিয়াম সাইজের একটি কড়া চুলের সাথে এমনভাবে বেঁধে দেয়া হয় যে, কড়াটি তার মাথার উপরে সোজা স্থাপিত থাকে। নর্তকী নাচতে থাকে আর হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েক কদম দূরে বর্শা হাতে নিয়ে দাঁড়ান।
তিনি হাতে বর্শা উঁচিয়ে পজিশন ঠিক করেন। নর্তকী নিজস্ব ভঙ্গিমায় নাচতে থাকে। নর্তকী নাচতে নাচতে যখনই পজিশন বরাবর আসে ঠিক তখনই তিনি কড়া লক্ষ্যে বর্শা ছুড়ে মারেন। বর্শা নর্তকীর মাথায় স্থাপিত কড়ার মধ্য দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।
উহুদ যুদ্ধে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ঠিক এমনিভাবে বর্শার আঘাতে শহীদ করেছিলেন। তিনি বাজি জিতে হযরত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হযরত হিন্দা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর থেকে পুরস্কার লাভ করেছিলেন। অবশ্য ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন মুসলমান ছিলেন না। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
মুসাইলামার বিপক্ষে অনুষ্ঠিত যুদ্ধে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সৈন্যদের অন্তর্গত ছিলেন। বাগিচায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলাকালে তিনি মুসাইলামাকে দেখে ফেলেন। তিনি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মুখে শুনেছিলেন যে, মুসাইলামাকে হত্যা করা ছাড়া এ যুদ্ধ থামবে না। তিনি মুসাইলামার অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। শত্রুর তলোয়ার-বর্শা, সাথীদের নিক্ষিপ্ত তীর এড়িয়ে এবং নিহত-আহতদের শরীরের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে তিনি সমস্ত বাগিচা পায়চারী করতে থাকেন। এক পর্যায়ে মুসাইলামা তাঁর চোখে পড়ে যায়। সে নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্ভেদ্য বেষ্টনির মধ্যে ছিল এবং নিরাপত্তা কর্মীরা এমন বীরত্ব প্রদর্শন করতে থাকে যে, তারা কোন মুসলমানকে ধারে-কাছে পর্যন্ত আসতে দিচ্ছিল না।
ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য মুসাইলামার নিকটে যাবার প্রয়োজন ছিল না। মুজাহিদ বাহিনী মুসাইলামার নিরাপত্তাকর্মীদের সাথে তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। এদিকে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসাইলামার প্রতি বর্শা নিক্ষেপের মোক্ষম সুযোগ বের করতে সংঘর্ষরত সৈনিকদের চারদিকে ঘুরছিলেন। তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু উম্মে আম্মারা নামক এক মুসলিম মহিলার দরুণ সুযোগটি হাতছাড়া হয়ে যায়। মহিলা নিজেও মুসাইলামা পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করছিলেন। তিনি স্বীয় পুত্রের সাথে সাথে ছিলেন। তিনি মুসাইলামার নিরাপত্তার দেয়াল ভাঙতে চেষ্টা করলে এক মুরতাদের তলোয়ার তার গতিরোধ করে। উম্মে আম্মারা নিজের তলোয়ার দ্বারা তাকে ধরাশায়ী করার প্রাণান্তক চেষ্টা করেন কিন্তু মুরতাদের হঠাৎ এক আক্রমণে তার হাত সম্পূর্ণ কেটে যায়। তাঁর পুত্র তলোয়ারের এক কোপে ঐ মুরতাদকে জাহান্নামে পাঠায়। অতঃপর তিনি মাতাকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে সরে যান।
হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকটি সুযোগ পেয়ে যান। তিনি সুযোগ হাত ছাড়া করতে রাজি নন। বর্শা হাতে তুলে নেন এবং পজিশন ঠিক করে টার্গেটে পূর্ণশক্তিতে বর্শা ছুড়ে মারেন। অব্যর্থ নিশানা। কেল্লা ফতে। বর্শা মূসাইলামার ইয়ামোটা ভূড়িতে গিয়ে আমূল বিদ্ধ হয়। সে দ্রুত বর্শা ধরে ফেলে। কিন্তু ততক্ষণে বর্শা তার কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছিল।
