অল্প সময়ের মধ্যে ময়দান মুরতাদশূন্য হয়ে যায়। কিন্তু রণাঙ্গনের দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। স্রোতের গতিতে মানব খুন নদী সৃষ্টি করে বেয়ে যেতে থাকে। যেখানে মূল যুদ্ধ হয় তা একটি সংকীর্ণ ঘাঁটির মত স্থান ছিল। ইতোপূর্বে এর কোন নাম ছিল না। এই যুদ্ধ তাকে একটি নতুন নাম উপহার দেয়। ‘শায়িবুদ্দাম’ অর্থাৎ রক্তাক্ত প্রান্তর। এখানে উভয় পক্ষের এত প্রাণহানি ঘটে যে, ময়দানে লাশের উপর লাশ পড়ে লাশের স্তুপ হয়ে যায়। আহতের সংখ্যা ছিল হাজার-হাজার। মুসাইলামার সৈন্যসংখ্যা বেশী থাকায় প্রাণহানির ঘটনাও তাদের মধ্যে বেশীঘটে। মুসলমানদের প্রাণহানির সংখ্যাও কম ছিল না। কতক ঘোড়া নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে আহত-নিহতদের পিষ্ট করে ফিরছিল। অনেক সুস্থ লোকও তাদের পদতলে পিষ্ট হতে থাকে।
মুসাইলামার সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে পালিয়ে গেলে মুজাহিদ বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। মুহকাম বিন তুফাইল নামক মুসাইলামার এক সেনাপতি সৈন্যদেরকে আহ্বান করে বলছিল—“বনূ হানীফা! বাগিচায় গিয়ে আশ্রয় নাও।”
একমাত্র বাগিচাই ছিল তাদের আশ্রয়স্থল। এই বাগিচার নাম ছিল হাদীকাতুর রহমান। বাগিচাটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে অত্যন্ত প্রশস্ত ছিল। চতুর্দিক দিয়ে উঁচু প্রাচীর ছিল। মুসাইলামা রণাঙ্গন ছেড়ে এখানে এসে ওঠে। বাগিচাটি রণাঙ্গনের সন্নিকটেই ছিল। মুসাইলামার স্পেশাল ব্রাঞ্চের অনেক সৈন্য বাগিচায় ঢুকে গিয়েছিল। মুজাহিদরা মুরতাদদের তাড়িয়ে বাগিচার কাছে এলে ততক্ষণে অপর প্রান্ত হতে দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ঐতিহাসিকদের বর্ণনামতে মুসাইলামার সাথে বাগিচায় আশ্রয়গ্রহণকারী সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৭ হাজারের মত।
বাগিচার ফটক বন্ধ দেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাউন্ডারীর চতুর্দিক দিয়ে প্রদক্ষিণ করেন। ভিতরে প্রবেশের কোন উপায় তিনি বের করতে পারেন না। এ মুহূর্তে ভিতরে প্রবেশ অপরিহার্য ছিল। মুসাইলামাকে হত্যার মাধ্যমে উত্থিত ফিৎনার চির অবসান ঘটানো অত্যন্ত জরুরী ছিল।
হযরত বারা বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু নামক এক মুজাহিদ দৃঢ়পদে এগিয়ে এসে বলে—“আমাকে কয়েকজন ধরে উঁচিয়ে বাগিচার ওপাশে ছুড়ে দাও। খোদার কসম! আমি দরজা খুলে দিব।”
সাহাবায়ে কেরামের মাঝে হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু এক বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। বাগিচার ওপাশে তাকে একাকী ছাড়ার প্রস্তাবে কেউ সাড়া দেয় না। কিন্তু তিনি নিজেও নাছোড় বান্দা। বারংবার অনুরোধ জানাতে থাকেন। তার অনুরোধের প্রেক্ষিতে দু’তিনজন সৈন্য তাকে নিজেদের কাঁধে উঠিয়ে দাঁড় করায়। তিনি এভাবে দেয়ালের উপরিভাগে পৌঁছে দেয়াল টপকিয়ে বাগিচার অভ্যন্তরে লাফিয়ে পড়েন। বাগিচার অভ্যন্তরে এখন মুসাইলামার ৭ হাজার সশস্ত্র সৈন্য পক্ষান্তরে একমাত্র মুসলমান হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু।
৭ হাজার সশস্ত্র কাফেরের মাঝে একজন মুসলমানের লাফিয়ে পড়া জলন্ত আগ্নেয়গিরির মুখে লাফিয়ে পড়ারই নামান্তর। হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু এক দুর্বার আকর্ষণে এভাবে অগ্নিকুণ্ডের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাগিচার অভ্যন্তরে গিয়ে দরজা খোলার সীমাহীন ঝুকি তিনি কারো নির্দেশ ছাড়াই নিজে নিজে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি দরজার নিকটবর্তী স্থান থেকে দেয়াল টপকিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেছিলেন। ৭ হাজার সৈন্য বাগিচায় ঢুকে তখনও পর্যন্ত এলোপাথাড়ি ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় ছিল। তারা টের পেয়েছিল যে, মুসলমানরা তাদের পশ্চাদ্ধাবনে এখানে এসে পৌঁছেছে এবং বর্তমানে তারা বাগিচা অবরোধ করে আছে। কিন্তু তারা ভাবতেই পারে নাই যে, কোন মুসলমান একাকী দেয়াল টপকিয়ে ভিতরে আসার সাহস করতে পারে।
“কে ও?” একজন চেঁচিয়ে ওঠে—“লোকটি দরজা খুলছে।”
হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একজন দেখে ফেলে এবং আরেকজন চিনতে পেরে চিৎকার করে ওঠে—“মুসলমান! মুসলমান!!”
“কেটে ফেল ওকে”—জনৈক মুরতাদ চেঁচিয়ে বলে।
“মস্তক উড়িয়ে দাও” আরেকজন বলে।
“বন্দী কর…হত্যা কর”—শতকণ্ঠের গুঞ্জন ওঠে।
অসংখ্য মুরতাদ তলোয়ার ও বর্শা উঁচিয়ে হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বধ করতে ছুটে আসে। হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহুও তখন পর্যন্ত দরজা খুলতে সক্ষম হন না। শত্রুদের এগিয়ে আসতে দেখে তিনি তলোয়ার কোষমুক্ত করেন এবং বনূ হানীফার পক্ষ হতে যে লোকটি সর্বাগ্রে তার নিকটে পৌঁছে হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মারাত্মক কোপ তাকে স্বস্থানে থামিয়ে দেয়। আঘাত খেয়ে লোকটি শক পাবার মত কয়েক পা পিছনে হটে যায়। তিনি এ সুযোগে আবার দরজা খোলার চেষ্টা করেন। তিনি বারবার স্থান পরিবর্তন করে দরজা খুলছিলেন। একই সাথে দু’ব্যক্তি তার লক্ষ্যে বর্শা ছুড়ে মারে। তিনি দক্ষতার সাথে একদিকে সরে যান। বর্শার ফলা হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শরীরে বিদ্ধ না হয়ে দরজার পাল্লায় গিয়ে আঘাত করে। তারা যে মুহূর্তে ব্যর্থ বর্শা দরজা হতে ছাড়াবার চেষ্টায় রত তখন হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু চোখের পলকে তরবারী চালিয়ে তাদের ঘায়েল করে দেন।
এবার কয়েকজন মিলে একযোগে হামলা চালাতে থাকে। হযরত বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু দরজায় পিঠ লাগিয়ে অতি দক্ষতার সাথে তাদের হামলা প্রতিহত করতে থাকেন। এ সময় দুটি শ্লোগান তার জবানে জারী ছিল—“আল্লাহু আকবার…মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ” —তিনি একসাথে তিন কাজ করতে থাকেন। (১) আক্রমণ প্রতিহত (২) আক্রমণ চালানো এবং (৩) দরজা খোলার চেষ্টা।
