কতক মুজাহিদ হযরত যায়েদ বিন খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে জানতে চান যে, তারা এ মুহূর্তে কি করবে।
“খোদার কসম!” হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গর্জনের স্বরে বলেন—“আল্লাহর কাছে দু’আ করি, শত্রুকে পরাস্ত করা পর্যন্ত তিনি যেন আমাকে জীবিত রাখেন।…প্রিয় মক্কা ও মদীনাবাসী! ধুলিঝড়ে ভীত হয়ো না। মাথা একটু নীচু রাখ। মাটি এবং বালু তোমাদের চোখে পড়বে না। যে কোন পরিস্থিতিতে পিছু হটবে না। অসীম সাহস রাখবে। দৃঢ়তা হস্তচ্যুত হতে দিবে না। ধুলিঝড় তোমাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না।”
হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি ছিলেন। তিনি মুজাহিদ বাহিনীর সামনে এই দৃষ্টান্ত রেখে যান যে, তলোয়ার ঘুরাতে ঘুরাতে শত্রুদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার অধীনস্ত বাহিনীও তার অনুসরণে পিছে পিছে যায়। হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বীর-বিক্রমে তলোয়ার চালাতে চালাতে সামনে এগিয়ে যান এবং শাহাদাত বরণ করেন।
আরেক সেনাপতি আবু হুজায়ফাও একই দৃষ্টান্ত কায়েম করেন। তিনি এই নারাধ্বনি দিতে দিতে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন—“হে কুরআনের ধারক-বাহক। স্বীয় কর্তব্য নিষ্ঠার সাথে পালনের মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের ইজ্জত রক্ষা কর।” তিনিও বিপুল বিক্রমে সৈন্যের সারি ভেদ করে সামনে এগিয়ে চলেন। ক্রমে আহত হতে থাকেন এবং এক সময় শহীদ হয়ে যান।
এ সকল পদস্থ সেনাপতি নিজ জীবন বিসর্জন দিয়ে মুজাহিদ বাহিনীর দৃঢ়তায় প্রাণ সঞ্চার করেন। তারা হঠাৎ খোদায়ী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠে এবং বিদ্যুৎগতিতে শত্রুর শাহরগ গিয়ে স্পর্শ করে। মুহুর্মুহু তীব্র আক্রমণ সত্ত্বেও মুসাইলামার সৈন্যরা যেই সেই রয়ে যায়। কোন কিছুই তাদের বিচলিত কিংবা কোণঠাসা করতে পারে না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পুরো রণাঙ্গনের উপর হাল্কা জরীপ চালান। এটা এমন ঘোরতর যুদ্ধ ছিল যেখানে কোন চালের আদৌ সুযোগ ছিল না। এটা ছিল রীতিমত সম্মুখযুদ্ধ। ব্যক্তিগত বাহুবল এবং বীরত্বেরই জয়জয়কার ছিল এখানে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রণাঙ্গনের অবস্থা পর্যবেক্ষণকালে তাঁর দৃষ্টি মুসাইলামার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর পড়ে। তারা ভণ্ড নবীর জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়ে চলছিল। বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিতে বাজি জিততে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাথায় মাত্র একটি পন্থাই কেবল ঘুরে-ফিরে আসতে থাকে। আর তা হলো মুসাইলামার হত্যা। তাকে হত্যা করতে পারলে মুসলমান বিজয় লাভ করতে পারে। অন্যথা যুদ্ধ যে কোন মুহূর্তে বেগতিক দিকে মোড় নিতে পারে। কিন্তু মুসাইলামার হত্যার ব্যাপারটি এতটুকু সহজ নয়, যত সহজে সেটা মাথায় ঢুকতে পেরেছে। কিন্তু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করার জন্য এমনভাবে তার দিকে অগ্রসর হয় যে, বাছাইকৃত সৈন্যরা তার চতুর্দিকে ছিল। নিকটে পৌঁছলে মুসাইলামার নিরাপত্তা রক্ষীরা তাদের উপর একযোগে চড়াও হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে যে আসে, সে আস্ত ফেরত যায় না। কিন্তু তারপরেও মুসাইলামা পর্যন্ত পৌঁছার কোন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জানবাজ সৈনিকরা নিজেদের ডিসিপ্লিন ঠিক রাখে। ফাটল সৃষ্টি হতে দেয় না। একটি মোক্ষম সুযোগ দেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদেরকে একযোগে হামলার নির্দেশ দেন। তিনি নিজেও দাপটে তরবারী চালান। মুসাইলামার কতক নিরাপত্তাকর্মী আগেই মারা গিয়েছিল বা আহত হয়ে মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল। খালিদ বাহিনীর শার্দুলদের হামলা এত ক্ষিপ্রগতির ও মারাত্মক ছিল যে, নিরাপত্তাকর্মীরা দিশেহারা হয়ে যায়। পুরো ময়দানে মুজাহিদ বাহিনী নাটকীয়ভাবে ফিরে আসে। চালকের আসন এখন তাদের দখলে। যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তাদের হাতে চলে আসে। জয় অথবা লয়ের যে দৃপ্ত শপথে উজ্জীবিত হয়ে মুজাহিদ বাহিনী যুদ্ধে নেমেছিল তার কারণে তারা মুরতাদ বাহিনীর জন্য এক ভয়ঙ্কর দানবে পরিণত হয়েছিল। নিরাপত্তাকর্মী বৃদ্ধির কোন সুযোগ মুসাইলামার ছিল না।
একদিকে মুসলমানদের গগনভেদী নারাধ্বনি আর অপরদিকে ঘূর্ণিঝড়ের শো শো আওয়াজ রণাঙ্গনের পরিবেশকে আরো ভয়াবহ করে তুলছিল। মুসাইলামার একান্ত বডিগার্ডদেরও হৃদকম্পন শুরু হয়ে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জানবাজ সৈন্যরা স্পেশাল বডিগার্ড বাহিনীর বৃত্তকেও ভেঙ্গে তছনছ করে দেয়।
“নবীজী!” এক বডিগার্ড ভাঙ্গাসুরে বলে—কোন মোজেজা দেখান।”
“আপনার প্রতিশ্রুতি পূরণ করুন শ্রদ্ধেয় নবী!” আরেক বডিগার্ড বলে— “একমাত্র বিজয় ছিল আপনার প্রতিশ্রুতি।”
মূসাইলামা মৃত্যুকে তার দিকে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসতে দেখে উচ্চকণ্ঠে নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে বলে—“নিজেদের মান-মর্যাদা এবং ইজ্জত-আবরু রক্ষায় প্রাণপণ লড়ে যাও”—এরপর সে নিজস্থান ছেড়ে পালিয়ে যায়।
॥ সতের ॥
শত্রুর সম্মুখ সাড়ি ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। পতাকা স্বস্থানে ছিল না। এতে ময়দানব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে যে, “নবী ময়দানে নেই… রাসূল পালিয়ে গেছে। এ ঘোষণা মুরতাদদের অবশিষ্ট শক্তিটুকুও লোপ করে দেয়। তারা মনোবল হারিয়ে রণে ভঙ্গ দিতে থাকে।
