মুহূর্তে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশ পালিত হয়। মুসলমানরা এখন তিন কাতারে বিভক্ত। (১) মুহাজির (২) আনসার (৩) বেদুঈন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ার পিঠে চড়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
“আল্লাহর সৈনিকগণ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চকণ্ঠে বলেন—“আমরা রণাঙ্গনে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে শত্রুদের জন্য হাসি আর বিদ্রূপের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছি। তোমাদের মধ্যে কে বীরত্বের সাথে লড়েছে আর কে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছে—কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে?…মুহাজির? আনসার? বেদুঈন? এখন আমি তোমাদের এ জন্য পৃথক করেছি যে, এখনই আমরা শত্রুর উপর জওয়াবী হামলা চালাব। এখন দেখব, কে কত বীরত্বের পরিচয় দিতে পারে। বীরত্ব আর কাপুরুষতা সমালোচনার দ্বারা নির্ণীত হয় না; রণাঙ্গনে কিছু করে দেখাও। কিন্তু সাবধান! ঐক্য যেন হাতছাড়া না হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদেরকে যে ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দের শিক্ষা দিয়েছেন তা ভুলে যেও না। তোমাদের কোন বাহিনী শত্রুর আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে থাকলে আরেক বাহিনী তাদের সাহায্যে এগিয়ে যাও। আমাদেরকে অবশ্যই প্রমাণ করে দেখাতে হবে যে, মুসাইলামা ভণ্ড, তার নবুওয়াতের দাবী মিথ্যা বৈ নয়। আমরা পরাজিত হলে তার মিথ্যা নবুওয়াত আমাদের উপর চেপে বসবে। আমরা মুসাইলামার গোলাম এবং আমাদের স্ত্রীরা মুরতাদদের বাঁদীতে পরিণত হবে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তেজোদ্দীপ্ত ভাষণ ঐ তীরের স্থান দখল করে যা টার্গেটে গিয়ে বিদ্ধ হয়। সৈন্যদের মাঝে নয়া প্রেরণা এবং নব শক্তি সৃষ্টি হয়। তাদের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। রক্ত পিপাসু হায়েনার ন্যায় তাদের চোখ প্রতিশোধ গ্রহণের জ্বলজ্বল করে ওঠে। শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে তারা অস্থির হয়ে পড়ে। ইঙ্গিত পাওয়া মাত্রই বিজলির গতিতে ছুটে চলে মুজাহিদ বাহিনী মুরতাদ বাহিনীর মুণ্ডপাত করতে।
ইতোমধ্যে মুসাইলামাও স্বীয় বাহিনীকে পুনরায় আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করে। মুজাহিদ বাহিনী রণাঙ্গনে পৌঁছতেই হযরত সাবেত বিন কায়েস নামক এক আনসার সর্দার ঘোড়া দ্রুতগতিতে ছুটিয়ে সৈন্যদের একেবারে সামনে চলে আসেন।
প্রিয় মদীনাবাসী!” তিনি উচ্চকণ্ঠে বলেন—“তোমরা ইতোমধ্যে এক লজ্জাষ্কর কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছ।” হযরত সাবেত বিন কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের দিকে ইশারা করে বলেন—“হে আমার প্রভু! এরা যার ইবাদত করে আমি তার উপর অভিসম্পাত দিচ্ছি।” অতঃপর তিনি মুজাহিদ বাহিনীর দিকে ফিরে বলেন—“যে মন্দ দৃষ্টান্ত আমার এই বাহিনী কায়েম করেছে আমি তার উপরও অভিশাপ দিচ্ছি।”
এতটুকু বলেই হযরত সাবেত বিন কায়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু খাঁপ থেকে তরবারী উন্মুক্ত করেন এবং ঘোড়ার গতি শত্রুদের দিকে করে দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দেন। তাঁর শেষ বাক্য এই ছিল—“অবশ্যই আমার তলোয়ার শত্রুদের মৃত্যু উপহার দিবে এবং তোমাদেরকে হিম্মত ও দৃঢ়তার অনুপম দৃষ্টান্ত দেখাবে।”
হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়া ছুটিয়ে দিতেই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। ঐতিহাসিকরা লেখেন, হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তরবারী এমন ক্ষিপ্র ও দক্ষতার সাথে চলতে থাকে যে, যেই তার সামনে এসেছে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় না। সম্ভবত তার শরীরের এমন কোন স্থান ছিল না যেখানে তলোয়ার বা বর্শার আঘাত লাগেনি। দুশমনের সারি কচুকাটা কাটতে কাটতে তিনি অনেক গভীরে গিয়ে ঢলে পড়েন এবং শহীদ হয়ে যান। নিজ বাহিনীর জন্য তিনি বাস্তবিকই অমিত সাহস এবং পাহাড়সম দৃঢ়তার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত পেশ করে যান।
মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকল কতিপয় ঐতিহাসিকের বরাত দিয়ে লিখেছেন, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী দ্বিতীয়বার এই কসম করে যুদ্ধে নামে যে, এবার ময়দান থেকে তাদের লাশ আসবে। জীবিত ফিরবে না। জনৈক ঐতিহাসিক লেখেন, তারা এবার এ শপথে উজ্জিবীত হন যে, হাতের তলোয়ার ভেঙ্গে গেলে, তুণীরের তীর শেষ হয়ে গেলে প্রয়োজনে দাঁত দিয়ে লড়ে যাব; তবুও ময়দান হতে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করব না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নতুন এক দৃষ্টান্ত কায়েম করেন। তিনি কতক জানবাজ মুজাহিদ বাছাই করে নিজের সাথে রাখেন। যাতে যুদ্ধ যেখানেই বেগতিক আকার ধারণ করে, সেখানে এই রিজার্ভ ফোর্স নিয়ে লাফিয়ে পড়া যায়। তিনি এই বাছাই করা জানবাজদের বলেন—“তোমরা আমার পিছে পিছে থাকবে। তিনি নিজে সম্মুখে থাকতে চাইতেন।
দ্বিতীয়বার যুদ্ধ শুরু হলে এক নতুন বিপদ এসে পতিত হয়। বিরাট ঘূর্ণিঝড় ওঠে। যা মুজাহিদদের দিকেই ধেয়ে আসে। কোন কোন ঐতিহাসিকের অভিমত, এটা মরুঝড় ছিল না; বরং তীব্র উৎক্ষিপ্ত ধুলো ছিল মাত্র। রণাঙ্গনে উভয় পক্ষের অসংখ্যক ঘোড়া আর পদাতিক বাহিনীর বিচরণে সৃষ্ট ধুলোর পরিবেশটা ভূপৃষ্ট হতে উৎক্ষিপ্ত ধুলোর মত ছিল। প্রচণ্ড এ ধুলোর গতি মুজাহিদদের দিকে থাকায় উড়ন্ত ধুলা-বালি মুসলমানদের চোখে গিয়ে পড়ছিল। বদরে কাফেরদের সাথে এমন ঘটনাই ঘটেছিল। ধুলোর তীব্রতা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে।
