“এ লোকদের হাত থেকে তুমি আমাকে কেন বাঁচালে?” লায়লা মুযাআর কাছে জানতে চায়। “তুমি আমাকে নিজের মালে গনিমত মনে করছ? তোমার নিয়ম এমনটি হয়ে থাকলে কেন ভাবছ না যে, আমি তোমাকে কতল করতে পারি?”
“বন্দী থাকাকালে আপনি আমার সাথে যে সদাচরণ করেছেন তার প্রতিদানে আমি আমার জীবনও দিতে পারি।” মুযাআ বলে—“খোদার কসম! আমার পায়ের বেড়ি খুলে যদি আপনার পায়ে পড়ে তবুও আমি আপনাকে মালে গনিমত বা বাঁদী জ্ঞান করব না। আপনি আমাকে বন্দী করে নয় মেহমান বানিয়ে রেখেছেন।”
“আমি তোমার সাথে তেমন ভাল আচরণ করতে পারিনি।” লায়লা বলে। আমার বাড়িতে হলে তোমাকে আরো সুখে রাখতে পারতাম। এভাবে যে কোন বন্দীর সাথে সদাচরণ করা ইসলামের বিধান। প্রাণের শত্রুও যদি কারো ঘরে বন্দী হয়ে আসে তবে সে তাকে একজন সম্মানিত মেহমানই জ্ঞান করে।”
“লায়লা!” মাযা‘আ বলে—“আপনি এখনও অনুভব করছেন না যে, আপনার স্বামী পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছে এবং আপনি এখন আমার গোত্রের কব্জায়?”
“বিজয়-পরাজয়ের ফায়সালা আল্লাহ করবেন।” লায়লা জবাবে বলে— “আমার স্বামী এর চেয়েও মারাত্মক আঘাত সহ্য করতে অভ্যস্ত।”
“নির্বোধ নারী!” মাযা‘আ বিজয়সুলভ মুচকি হেসে বলে—“এখনও আপনি বুঝছেন না যে, খোদা মুসাইলামার সাথে আছেন, আর তিনি তাঁর সত্য নবী! মুহাম্মাদের রেসালাত সত্য হলে…”
“মাযা‘আ!” লায়লা গর্জে উঠে এবং তার কথা শেষ করতে না দিয়ে বলে—“তুমি মুহাম্মাদের রেসালাতের বিরুদ্ধে কোন কথা বললে তোমার হত্যা আমার উপর ফরজ হয়ে যাবে। আমি জানি, আমাদের সৈন্যরা এই তাবুতে একা ফেলে পালিয়ে গেছে আর আমার ধর্মের শত্রুরা এখানে লুটতরাজও চালাচ্ছে। কিন্তু তাই বলে আমি এতটুকু ভীত নই। আমার অন্তরে কোন ভয় নেই। আর ভয় না থাকার কারণ হলো, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র আত্মার প্রতি আমার প্রগাঢ় আস্থা রয়েছে।”
মাযা‘আ নিশ্চুপ ছিল। সে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত অপলক নেত্রে তার দিকে চেয়ে থাকে। বাইরে বিজয়ী বাহিনীর বিজয়সুলভ হৈ-হুল্লোড় চলছিল। তারা মুসলমানদের তাঁবু চিরে-ফেড়ে টুকরো করে করে ইতস্তত নিক্ষেপ করছিল। মাযা‘আ এবং লায়লার এ ধারণাই ছিল যে, এখনই মুসাইলামার পক্ষের লোকজন আসবে এবং তাদের দু’জনকে নিয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ হৈ-হুল্লোড় থেমে যায় এবং লুটেরা লুটপাট ছেড়ে দৌড়ে তাবু ছেড়ে বেরিয়ে যায়। কারণ হলো, মুসাইলামার পক্ষ থেকে নির্দেশ আসে যে, যে যেখানে আছ এ মুহূর্তে আকরাবা ময়দানে ফিরে এস। কেননা মুসাইলামা দেখতে পায় যে, মুসলমানরা দ্রুত সমবেত হয়ে বিন্যস্ত ও সুসংগঠিত হচ্ছে। সে এ মুহূর্তে কোন প্রকার ঝুঁকি নিতে চায় না। সে মুসলমানদের বীরত্ব এবং উদ্দীপনায় দারুণ প্রভাবিত ছিল।
মাযা‘আ এবং লায়লা তাঁবুতে আবার একাকী রয়ে যায়। মাযা‘আর চেহারায় যে ঝলক মাঝখানে এসেছিল তা আবার হারিয়ে যায়।
৩.১৬ মুসাইলামার হাত কাটা
॥ ষোল ॥
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এত জলদি পরাজয় স্বীকার করার মত লোক ছিলেন না। নষ্ট করার মত একটি মুহূর্তও তার ছিল না। তিনি সেনাপতি এবং কমান্ডারদের সমবেত করে পিছপা হওয়ার উপর চরম শরম দেন। ইত্যবসরে এক অশ্বারোহী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে সেনাপতিদের আলোচনা স্থলে এসে থামে। তিনি হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই হযরত যায়েদ বিন খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন।
“খোদার কসম ইবনে ওলীদ!” হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে—“আমি মুসাইলামার ডান হাত কেটে দিয়েছি।… আমি নাহারুর রিযালকে নিজ হাতে হত্যা করেছি। আমাদের বিজয়ের উপর এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক জ্বলন্ত ইশারা বৈ নয়।”
নাহারুর রিযালের মৃত্যু মুসাইলামার জন্য সাধারণ চোট ছিল না। পূর্বেই বলা হয়েছে যে, সে মুসাইলামার প্রধান উপদেষ্টা, একান্ত বিশ্বাসভাজন এবং সঠিক অর্থে তার ডানহস্ত ছিল। এ তাজা খবরে হযরত খালিদ এবং তার অন্যান্য সেনাপতির চেহারায় নতুন আলোর ঝলক দেখা দেয়। তাদের রক্ত নয়া প্রেরণায় টগবগ করে ওঠে।
“তোমরা জান, এটা কোন্ পাপের সাজা?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগতস্বরে বলেন—“আমি সংবাদ পেয়েছি, আমাদের সৈন্যদের অন্তরে অহংকার চলে এসেছিল। লড়াইয়ের পূর্বেই আমাদের মুজাহিদ সাথীরা বলেছিল, বাহাদুরী পরীক্ষায় আনসার আর বেদুঈনরা মিলে তাদের মোকাবিলা করতে পারবে না। আনসাররা দাবী করে যে, মুসলমানদের মধ্যে তাদের মত বাহাদুর কেউ নয়। বেদুঈনরাও কম যায় না। তারা বলে, মক্কা এবং মদীনার লোক এখনও জানেই না যে, যুদ্ধ কাকে বলে।…তোমাদের জানা আছে, আমাদের মধ্যে মক্কার মুহাজিররাও আছেন, মদীনার আনসারও আছেন এবং আশে-পাশের অঞ্চল হতে আগত বিপুল সংখ্যক বেদুঈনরাও আছে। তারা পরস্পর একে অপরের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিল।”
“এর প্রতিষেধক আমাদের কাছে নেই”—এক সেনাপতি বলে।
“আমার কাছে এর প্রতিষেধক আছে” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমরা তিন ধরনের সৈন্যদের সবাইকে একসাথে রেখেছি। বেশী সময় নষ্ট করা সম্ভব নয়। তোমরা এখনই যাও এবং তিন শ্রেণীর লোকদের পৃথক করে ফেল।”
