॥ পনের ॥
৬৩২ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহের এক প্রভাতে সূর্য উঁকি দিলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসাইলামার বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তিন ভাগে পুরো বাহিনী বিন্যস্ত করেছিলেন। মধ্য বাহিনীর নেতৃত্ব ছিল তাঁর নিজের হাতে। ডানে বামে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন হযরত আবু হুজাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত যায়েদ বিন খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। মুসলমানরা যে ক্ষিপ্তগতি ও বজ্রের মত হামলা করছিল তা দেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আশ্বস্ত হয়েছিলেন যে, এভাবে যুদ্ধ চালাতে পারলে তারা এক সময় মুরতাদ বাহিনীকে অবশ্যই নাস্তানাবুদ করতে সক্ষম হবে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও সাধারণ সৈন্যদের মত লড়ছিলেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও মুসাইলামার বাহিনী ঠিক আগের স্থানেই পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে। অসংখ্য মুজাহিদ আক্রমণের প্রথম ভাগেই শহীদ হয়ে যান।
দিন যতই গড়িয়ে যেতে থাকে যুদ্ধের তীব্রতা ও ভয়াবহতা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর্তচিৎকার, গোঙানী, আহাজারী আর ক্রন্দনে আসমান-জমিন প্রকম্পিত হচ্ছিল। মুসাইলামার বাহিনী স্থান পরিবর্তন করে করে লড়ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মুসলমানদেরকে বেষ্টনীতে আবদ্ধ করে ফেলা। পক্ষান্তরে মুসলমানদের লক্ষ্য ছিল মুরতাদদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়া এবং ইয়ামামা অধিকার করা। উভয় বাহিনী নিজ নিজ লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিতে থাকে। আংশিক সফলতা বিবেচনায় আনলে তা ছিল মুরতাদ বাহিনীর দখলে।
মুসাইলামা অত্যন্ত ধূর্ত এবং সতর্ক সমর পরিচালক ছিল। সে গোপনে আঁচ করতে থাকে মুসলিম বাহিনী কখন ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে অর্ধেক দিন পার হয়ে যায়। ভূমি লালের পর লাল হতে থাকে। আহত সৈন্যরা পলায়নপর ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়। মুসলমানরা শুরু থেকেই প্রচণ্ড আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ায় অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
মুসাইলামার সতর্ক চোখে মুজাহিদ বাহিনীর এ অবসন্নতা ধরা পড়ে। সহসা সে নতুন চাল চালে। এক তেজোদ্দীপ্ত বাহিনীকে মুসলিম বাহিনীর উপর হামলার নির্দেশ দেয়। তার এ বাহিনী সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আসে এবং চোখের পলকে আক্রমণ করে সামনের বাহিনী লণ্ডভণ্ড করে দেয়। মুসাইলামা এই বলে সবাইকে আশ্বস্ত করেছিল যে, নবুওয়াতের খাতিরে যেই প্রাণ দিবে সে সোজা জান্নাতে যাবে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্রুত অনুধাবন করেন যে, তার সৈন্যদের উপর তীব্র আঘাত হচ্ছে। তিনি পরিস্থিতি উত্তরণের পলিসি নিয়ে ভাবছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে সামনের বাহিনী দ্রুত পিছে হটে আসে। তাদের দেখাদেখি পিছনের বাহিনী আরো দ্রুত পিছনে হটে আসে। সেনাপতিগণ চিৎকার করে করে সৈন্যদের ডাকেন, থামাতে চেষ্টা করেন, তাকবীর ধ্বনি দেন কিন্তু মুরতাদদের নতুন এ বাহিনীর আক্রমণ এত ক্ষিপ্ত ও মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল যে, মুসলমানদের পক্ষে তা বরদাশত করা সম্ভব হয় না। তাদের মাঝে অনিয়ম ও হুলস্থুল পড়ে যায়। পরস্পরের দেখাদেখি তারা ময়দান হতে এমন উর্ধ্বশ্বাসে পালায় যে, ছাউনীতেও গিয়ে থামে না, বরং অনেক দূর-দূরান্তে চলে যায়।
মুসাইলামার বাহিনী ক্ষুধার্ত নেকরের ন্যায় তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। উহুদ রণাঙ্গনেও মুসলমানরা নিজেদের বিপক্ষে এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। যার ফলে তারা পরাজিতও হয়েছিল। এটা ছিল তাদের দ্বিতীয় পিছু টান, যা হুলস্থূলের রূপ ধারণ করেছিল।
মুসাইলামার সৈন্যরা পশ্চাদ্ধাবন করে ছাউনীতে পৌঁছে লুটপাট শুরু করে। সেখানে তাদের বাধা দেবার মত কেউ ছিল না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার অধীনস্ত অন্যান্য সেনাপতি পলায়নপর সৈন্যদের থামানোর জন্য দৌড়ে চিৎকার করে ফিরছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা ছাউনী ছেড়ে অনেক দূরে গিয়ে থামে। মুসাইলামা বাহিনীর কতক সৈন্য হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তাঁবুর সন্ধান পায়। তারা সেখানে ঢুকে পড়ে। অনেক বিত্ত-বৈভব তারা এখান থেকে পাবার আশা করছিল কিন্তু এখানে ঢুকে তারা এমন দুই মূল্যবান মানুষের দেখা পায় যা ছিল তাদের ধারণারও অতীত। একজন হচ্ছে তাদের সর্দার এবং সিপাহসালার মাযা‘আ। পায়ে লোহার বেড়ি বাঁধা অবস্থায় সে সেখানে পড়ে ছিল। আর দ্বিতীয়জন হচ্ছে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নতুন স্ত্রী লায়লা উরফে উম্মে তামীম। যার রূপ-সৌন্দর্যের বহু কাহিনী তারা শুনেছিল কিন্তু দেখার সুযোগ হয় নাই। মাযা‘আকে তারা দেখেই চিনে ফেলে। কিন্তু লায়লার সম্পর্কে তাদেরকে খবর দেয় মাযা‘আ। লায়লার পরিচয় পেয়েই একই সাথে দু’তিনজন তার দিকে ছুটে আসে। তারা লায়লাকে হত্যা অথবা সাথে করে নিয়ে যেতে চায়।
“থাম!” বন্দী নেতা মাযা‘আ তাদের নির্দেশ দেয়। “শত্রু সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন কর। নারীদের পিছনে পড়ার সময় এখনও আসেনি। আমি এখন তার কয়েদী নই; বরং সে আমার কয়েদী।”
তাদের সর্দারের নির্দেশ এত কঠোর ছিল যে, তারা দ্রুত তাবু থেকে বের হয়ে যায়। তাদের এতটুকু হুশ হয় না যে, নেতার পায়ের বেড়ি খুলে দিয়ে যাবে।
