মুসাইলামা পুরো বাহিনীকে তিন অংশে বিভক্ত করে। ডান বাহিনীর নেতৃত্ব নাহারুর রিযালের হাতে অর্পণ করে। বাম বাহিনীর সেনাপতি ছিল মুহকাম বিন তোফাইল। আর মধ্যবর্তী বাহিনীর নেতৃত্ব নিজ হাতেই রাখে। মুসাইলামা তার পুত্র শারযীলকে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে আগুন ঝরানো ভাষণ দিতে বলে। শারযীল ঘোড়ায় আরোহণ করে এক এক করে তিন বাহিনীর সামনে গিয়ে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলে :
বনূ হানীফার শার্দুলেরা! আজ সময় এসেছে ইজ্জত-আবরু রক্ষায় নিজেকে কুরবান করা। আল্লাহ্ তোমাদের গোত্রে নবুওয়াতের মত মহান বিষয় দান করেছেন। নিজেদের ঐতিহ্য-ইতিহাস এবং নবুওয়াত বাঁচাতে আজ এমন দুর্ধর্ষ লড়াই করবে, যেন মুসলমানরা আর কখনো তোমাদের সামনে আসার সাহস না করে। মনে রেখ, তোমরা ময়দানে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলে তোমাদের স্ত্রী, বোন, কন্যা নির্ঘাত মুসলমানদের বাঁদীতে পরিণত হবে। তোমাদের এই প্রিয় ভূমিতেই তাদের ইজ্জত লুণ্ঠন করা হবে। পারবে কি তোমরা সে দৃশ্য সহ্য করতে?”
মুসাইলামার সৈন্যদের শরীরে যেন আগুন ধরে যায়। তারা মুসাইলামার নামে উচ্চকিত নারাধ্বনি দিতে থাকে। অবলা অশ্বগুলো বারবার পদাঘাত আর হ্রেষারব তুলে সৈন্যদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসাইলামা বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিলেন। সংখ্যাধিক্যের বলে মুসাইলামারই আক্রমণের সূচনা করার কথা ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিকরা লেখেন, মুসাইলামা যুদ্ধজ্ঞানও রাখত। সে হামলার সূচনা করে না। সে এ অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে যে, খালিদ বাহিনী আক্রমণ করুক আর সে প্রথমত আত্মরক্ষামূলক লড়াই চালিয়ে যাবে। এভাবে খালিদ বাহিনী আক্রমণ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন সে পূর্ণশক্তি নিয়ে চতুর্দিক হতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কচুকাটা কাটবে।
তৎকালীন যুগের পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসাইলামার চাল ধরতে পারেন না। তিনি অধীনস্ত সেনাপতিদের এক বৈঠক ডেকে বলেন যে, মুরতাদ বাহিনীর সাথে এভাবে লড়তে হবে যে, যেন তারা সৈন্য এদিক-ওদিক ছড়িয়ে দিতে না পারে এবং আত্মরক্ষামূলক লড়াই করতে বাধ্য হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ধারণা করেছিলেন, ১৩ হাজার সৈন্য দ্বারা ৪০ হাজার সৈন্যকে পরাস্ত করা কেবল এভাবেই সম্ভব যে, তাদেরকে কোন চাল চালার সুযোগ না দেয়া।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সৈন্যদের সাহস যোগানোরও প্রয়োজন ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাহায্যার্থে খলীফা যে বাহিনী পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে এক বিরাট সংখ্যক পবিত্র কুরআনের হাফেজ এবং সুমিষ্ট কারীও ছিলেন। সে সময়ে হাফেজ এবং কারীরাও তীর-তলোয়ারে সমান পারদর্শী হতেন। কেবল মসজিদে বসে থাকার মত লোক তারা ছিলেন না।
এতদ্ব্যতীত হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে এমন লোকের সংখ্যাও প্রচুর ছিল যারা একাধিক ময়দানে কয়েকগুণ বেশী সৈন্যের মোকাবিলা করে শত্রুর মাথা থেকে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে এনেছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীতে হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই যায়েদ বিন খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ্ রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। হযরত আবু দাযানা রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। তিনি উহুদ যুদ্ধে নিজ শরীর দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঢেকে রেখেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লক্ষ্যে যত তীর আসত তা এই হযরত আবু দাযানা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শরীরেই বিদ্ধ হত। খলীফা হযরত আবু বকরের পুত্র হযরত আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। উম্মে আম্মারা নামক এক জননী তার পুত্রের সাথে এসেছিলেন। এই হযরত উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা উহুদ যুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধও করেছিলেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে হযরত ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু নামে এক সাহাবীও ছিলেন। তার বর্শার লক্ষ্য চুল বরাবর এদিক-ওদিক হত না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উহুদ যুদ্ধে এই ওয়াহশী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিক্ষিপ্ত বর্শায় হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেছিলেন।
মুজাহিদ বাহিনী সংখ্যার বিচারে কম থাকলেও জিহাদী জবা, হিম্মত ও মনোবলের দিক দিয়ে ছিলেন তুঙ্গে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও অগ্নিঝরা ভাষণের মাধ্যমে তাদের বীরত্বে অগ্নি সংযোগ করেছিলেন। তিনি কারী ও হাফেজ সৈন্যদের বলেছিলেন, সৈন্যদের সামনে গিয়ে পবিত্র কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে তাদের জানিয়ে দাও যে, তারা মদীনা হতে এত দূরে কোন্ অভিপ্রায়ে লড়তে এসেছে? অভীষ্ট মঞ্জিল কোথায়?
কারী ও হাফেজগণ ভাবগম্ভীর কণ্ঠে সৈন্যদের মাঝে বারবার ঐ সমস্ত আয়াত শুনাতে থাকেন, যাতে মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরজের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। জিহাদের ফযিলত, শহীদের মর্তবা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা রাতভর চলতে থাকে। আল্লাহ ছাড়া এই সুদূর বিদেশ বিভুইয়ে তাদের সাহায্য করার কেউ ছিল না। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, মুসলমানরা এভাবে সারারাত ইবাদাত-বন্দেগী এবং দু’আর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন।
