“আপনি আপনার রাসূল মানেন আমরা আমাদের নবীকে মানি”—মাযা‘আ বলে—“বাস্তব ব্যাপারও এটা যে, মুসাইলামা রেসালাতের প্রশ্নে মুহাম্মাদের সমান অংশীদার।”
“আমাদের সকলের আকীদা-বিশ্বাস এটাই”—ধৃত সৈন্যরা এক যোগে বলে—আপনাদের মাঝে এক নবীর আবির্ভাব হয়েছে, আমাদের মাঝে আরেক নবী এসেছেন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চোখের পলকে তলোয়ার বের করেন এবং এক কোপে এক সৈন্যের মস্তক উড়িয়ে দেন। অন্যদেরও এভাবে হত্যা করার নির্দেশ দেন। অন্যদের সাথে মাযা‘আকেও হত্যা করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। হত্যাকারী তার গলা কাটতে তরবারী উপরে তোলে। আরেকটু পরেই তরবারীর আঘাতে মাযা আর মস্তক আর দেহ দুদিকে ছিটকে পড়বে।
“থামো!” সারিয়া বিন আমের নামে এক ধৃত সৈন্য চিৎকার করে শূন্যে খোলা তরবারী থামানোর পরামর্শ দিয়ে বলে—“কমপক্ষে এ লোকটিকে জীবিত রাখ। এ তোমাদের কাজে আসতে পারে।”
এ সময় উদঘাটিত হয় যে, মাযা‘আ বনূ হানীফার একজন শীর্ষ নেতা। কিন্তু তারপরেও গোপন রাখা হয় যে, মাযা‘আ শুধু গোত্রপতিই নয়; অন্যতম সেনাপতিও বটে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চৌকস এবং দূরদর্শী ছিলেন। গোত্রের নেতারা মোটা অঙ্কের জামিন হত। তাকে যে কোন স্পর্শকাতর স্থানে ব্যবহার করে স্বার্থ হাসিল করা যেতে পারত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মাযা‘আর পায়ে বেড়ী পরিয়ে তাকে নিজের তাঁবুতে নিয়ে যান এবং স্ত্রী লায়লার হাতে তাকে সমর্পণ করেন। ধৃত অবশিষ্ট সৈন্যদের সকলকে হত্যা করা হয়।
মাযা‘আর গ্রেপ্তার মুসাইলামার জন্য কোন তুচ্ছ ব্যাপার ছিল না। কিন্তু হানীফা উপত্যকা এমন ফাঁদ ছিল যা ঐ ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। তদুপরি মুসাইলামার সৈন্যসংখ্যা ছিল ৪০,০০০। পক্ষান্তরে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল ১৩,০০০। মুসাইলামার বাহিনীতে অশ্বারোহী এবং উষ্ট্রারোহীর সংখ্যা ছিল অনেক। কতিপয় ঐতিহাসিক মুসাইলামা বাহিনীর সংখ্যা ৭০ হাজার লিখেছেন। মোটকথা, মুসাইলামার সৈন্যসংখ্যা ৪০ হাজারের ঊর্ধ্বে ছিল, কম নয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এক বড় দুর্বলতা বলতে যা ছিল, তা হলো, তার সৈন্যসংখ্যা উদ্বেগজনকহারে কম ছিল। দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো, হেডকোয়ার্টার থেকে তিনি যোজন যোজন মাইল দূরে ছিলেন। ফলে প্রয়োজনীয় রসদপত্র কিংবা রিজার্ভ ফৌজ আসার কোন উপায় তার ছিল না। তবে এ বিষয়টা তাকে আশ্বস্ত করে যে, অত্র এলাকায় খাবার পানি এবং পশু-প্রাণীর খোরাকের কমতি ছিল না। ফসল এবং ফল-মূল সমৃদ্ধ ছিল গোটা এলাকা।
ফসল সমৃদ্ধ ক্ষেত-খামার এবং ফল-মূল সমৃদ্ধ বাগ-বাগিচার চিন্তা মুসাইলামাকে কুরে কুরে খায়। সে এগুলোর হেফাজতের চিন্তায় ছিল বিভোর। সে নাহারুর রিযালকে বলে যে, এমন পদ্ধতিতে সে লড়তে চায় যাতে মুসলমানদের হাতে কোন বসতি, ক্ষেত-খামার এবং বাগ-বাগিচা নষ্ট না হয়। ইতিহাস বলে, মুসাইলামা কোন প্রকার আবেগ, সিদ্ধান্তহীনতা এবং উদ্বেগের শিকার ছিল না। সে এমনভাবে কথা বলত, যেন বিজয় সম্পর্কে সে পুরোপুরি নিশ্চিত। সে ভেবে-চিন্তে এবং হিসেব-নিকেশ করে কথা বলত। ৪০ হাজার সৈন্য ছিল তার উপর ভরসা। এদের প্রত্যেকেই ছিল মুসাইলামা নামের পাগল। মুসাইলামার নবুওয়াত রক্ষার্থে তারা জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ফাঁদে পা দেয়ার মত সেনানায়ক ছিলেন না। মুতা যুদ্ধে ফাঁদে পড়ে তিনি সারা জীবনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। ইয়ামামা অঞ্চলের প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি ওয়াকিফহাল ছিলেন না। তিনি অবস্থা যাচাই এবং সামনে এলাকা পরখের উদ্দেশ্যে একটি টিম গঠন করেন। রাতে এ টিম যে রিপোর্ট দেয় তার আলোকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গতিপথ বদল করেন। তিনি হানীফা উপত্যকার প্রকৃতি সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল হলে এখান থেকে বিপদের গন্ধ পান। ফলে তিনি এই উপত্যকা এড়িয়ে সামনে অগ্রসর হবার ইচ্ছা করেন। তিনি একটু দূর থেকে ঘুরে সামনে এগিয়ে যান।
মুসাইলামাও গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে রেখেছিল। গোয়েন্দারা তাকে জানায় যে, মদীনা বাহিনী হানীফা উপত্যকা এড়িয়ে দূরবর্তী পথ ঘুরে সম্মুখপানে অগ্রসর হয়েছে। মুসাইলামা এ খবর পেয়ে সৈন্যদেরকে দ্রুত আকরাবা ময়দানে স্থানান্তর করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টি এই ময়দানের উপর ছিল। কিন্তু মুসাইলামা বাহিনী পূর্বেই সেখানে পৌঁছে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সমতলভূমি থেকে উঁচু এক স্থানে এসে ছাউনী ফেলেন। এখান থেকে মুসাইলামা বাহিনীর ছাউনী স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে এবং তাদের গতিবিধির উপর নজর রাখা সহজ ছিল।
মুসাইলামা এই ময়দানকে যুদ্ধের জন্য উত্তম ও উপযুক্ত মনে করে। কারণ, তার সৈন্যদের সকল রসদপত্র এবং মাল-আসবাব তাদের ছাউনীর পিছনে ছিল। দ্বিতীয়ত ক্ষেত-খামার এবং বাগ-বাগিচা তাদেরই পিছনে ছিল। ফলে এগুলো হেফাজত করা এখন তার জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। সে মনে মনে এ অঙ্ক কষে রাখে যে, খালিদ বাহিনী এখন থেকে ইয়ামামা অভিমুখে রওয়ানা করতে চেষ্টা করলে পশ্চাৎ হতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুও কম সেয়ানা ছিলেন না। তিনিও অনুভব করেছিলেন যে, ওখান থেকে সামনে অগ্রসর হওয়া আত্মহত্যার শামিল হবে।
