এটা মুসাইলামার দৈহিক শক্তি এবং যাদুর নৈপুণ্য ছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে এক বিরাট সমরশক্তি অর্জন করেছিল। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত শারযীল রাযিয়াল্লাহু আনহু এর মত সেনাধ্যক্ষকে পিছু হটিয়ে তার এবং বাহিনীর সাহস বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ফলে তারা এখন মদীনা হেডকোয়ার্টারের প্রতি দৃষ্টি তোলার সাহস করে। সে দরবারে উপবিষ্ট প্রধান উপদেষ্টাকে মদীনা আক্রমণের সার্বিক প্রস্তুতির কথা বলে। নাহারুর রিযাল কোন মন্তব্য করার পূর্বেই মুসাইলামাকে জানানো হয় যে, এক গোয়েন্দা আপনার শরণাপন্ন। মুসাইলামা তৎক্ষণাৎ তাকে ভিতরে নিয়ে আসতে বলে।
“মুসলমান বাহিনী এগিয়ে আসছে”—গোয়েন্দা এসেই খবর দেয়। সংখ্যায় তারা ১০ থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে।
“তোমরা যখন তাদের দেখেছ তখন তারা কোথায় ছিল?” মুসাইলামা জিজ্ঞাসা করে।
“হানীফা উপত্যকার খানিকটা দূরে”—গোয়েন্দা জবাবে বলে—“এতক্ষণ আরো এগিয়ে এসে থাকবে।”
“হতভাগাদেরকে মৃত্যু হানীফা উপত্যকায় টেনে এনেছে”—মুসাইলামা অহংকারের সাথে বলে—“তাদের জানা নেই যে, মাত্র ১০/১৫ হাজার সৈন্য আমার ৪০ হাজার সিংহের হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও আহত হবে।”
সে উঠে দাঁড়ায়। দরবারের অন্য সদস্যরাও সম্মানার্থে উঠে দাড়ায়। সে নাহারুর রিযালকে সাথে নিয়ে দরবার কক্ষ থেকে বেরিয়ে যায়। সে ঘোড়া প্রস্তুত করে নাহারুর রিযালকে সাথে নেয় এবং এক সময় ঘোড়া উভয়কে উড়িয়ে ইয়ামামা থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য ছিল হানীফা উপত্যকা।
“এই উপত্যকা হতে তারা জীবন নিয়ে বের হতে পারবে না”—পথিমধ্যে মুসাইলামা নাহারুর রিযালকে বলে—“আমার এই ফাদ সম্পর্কে তারা ঘুণাক্ষরেও জানে না।”
নাহারুর রিযাল অট্টহাসি দিয়ে উঠে এবং বলে—“আজ মুহাম্মাদের ইসলাম হানীফা উপত্যকায় চিরদিনের জন্য সমাধিস্থ হয়ে যাবে।”
তারা অর্ধেক পথ এগিয়ে গেলে ওদিক থেকে এক অশ্বারোহী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। অশ্বারোহী মুসাইলামাকে দেখে থেমে যায়।
“নবীজী!” অশ্বারোহী কম্পিত কণ্ঠে বলে—“মুসলমানরা মাযা‘আ বিন মুরারাকে বন্দী করে ফেলেছে।”
“মাযা‘আকে?” মুসাইলামা বিস্ময়কণ্ঠে বলে।
“মাযা‘আকে মুসলমানরা…”—নাহারুল রিযাল ভয়ার্তস্বরে বিড়বিড়িয়ে বলে।
“মাযা‘আর মত দুর্ধর্ষ এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি আমাদের মধ্যে আর কেউ নেই”—মুসাইলামা বলে—“মাযা‘আর বন্দী হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য শুভলক্ষণ নয়।
মাযা‘আ মুসাইলামার বড় ঝানু এবং বীর সেনাপতি ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে তার অনেকটা মিল ছিল। ঐতিহাসিকদের অভিমত, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং সমর চাল চালার যোগ্যতা একমাত্র মাযা‘আর মধ্যেই ছিল। মুসলমানদের হাতে মাযা‘আর বন্দী হওয়ার ব্যাপারটি ছিল দৈবাৎ। এটা এভাবে ঘটে যে, মাযা‘আর কোন এক নিকটবর্তী আত্মীয়কে বনী আমের এবং বনী তামীমের কিছু লোক মিলে হত্যা করেছিল। মাযা‘আ তার এই আত্মীয়ের রক্তের প্রতিশোধ নিতে মুসাইলামার কাছে ৪০ জন সৈন্য চেয়ে দরখাস্ত করে। মুসাইলামা তার এ যোগ্য সেনাপতিকে নিরাশ করতে চায় না। ফলে সে অনুমতি প্রদান করে।
মাযা‘আ দুশমনের এলাকায় যায় এবং তাদের থেকে প্রতিশোধ নিয়ে ফিরে আসছিল। তার জানা ছিল না যে, যে এলাকাকে সে নিরাপদ মনে করত তা এখন আর নিরাপদ নেই। সে সৈন্যদের শ্রান্তি দূর করতে এক স্থানে ছাউনী ফেলে। জিম্মাদারী পালন করে তারা ফিরছিল। ঘোড়ার জিন খুলে তারা শুয়ে পড়ে। ক্ষণিকের মধ্যেই গভীর নিদ্রায় হারিয়ে যায়।
ঘটনাক্রমে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী এ পথ দিয়েই আসছিল। প্রভাতে মূল বাহিনীর অগ্রবর্তী বাহিনী ঐ স্থানে এসে পৌঁছে যেখানে মাযা‘আ সৈন্যদের নিয়ে গভীর নিদ্রায় শায়িত ছিল। মুজাহিদ বাহিনী তাদের জাগ্রত করে এবং তাদের অস্ত্র-শস্ত্র ও ঘোড়া নিয়ে নেয়। নজরবন্দী করে তারা তাদেরকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে নিয়ে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতেন না যে, মাযা‘আ মুসাইলামার বিরাট মূল্যবান সেনাপতি। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যদের সাথে তাকেও সাধারণ সেপাই বলে ধারণা করেন। তারা প্রকৃতপক্ষে এক বিরাট শিকার লাভ করেছিল।
ধৃত সৈন্যরা স্বীকার করে যে, তারা মুসাইলামার বাহিনীর সেপাই। কিন্তু মাযা‘আর পরিচয় তারা প্রকাশ হতে দেয় না।
“তোমরা আমাদের মোকাবিলার উদ্দেশে এসেছিলে?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
“না”—একজন জবাবে বলে—“আমাদের জানাই ছিল না যে, মুসলিম সৈন্যরা আসছে। বনী আমের এবং বনী তামীম হতে আমাদের এক ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ নিতে আমরা গিয়েছিলাম।”
“ঠিক আছে তোমাদের কথা মেনে নিলাম”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমি তোমাদের প্রাণ ভিক্ষা দিতে পারি। তার আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও যে, তোমরা কাকে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস কর এবং কার উপর ঈমান রাখ?”
“নিঃসন্দেহে মুসাইলামা আল্লাহর রাসূল”—ধৃত এক সৈন্য জবাব দেয়।
“খোদার কসম!” তোমরা আমাকে অপমান করলে ক্ষমা করতাম। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবমাননা আমি কিভাবে বরদাশত করব!”
