এক পদাতিক কুরাইশ দ্রুত আসে। মুসলমানরা ধারণা করে যে, এ ব্যক্তি আবু সুফিয়ানকে শুধু উদ্ধারের জন্য এসেছে। কিন্তু নরাধম যুদ্ধরীতি ভঙ্গ করে পেছন হতে আঘাত করে হযরত হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শহীদ করে ফেলে এ সুযোগে আবু সুফিয়ান দৌড়ে সৈন্যদের মাঝে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
সর্বশেষ মল্লযোদ্ধা হিসেবে কুরাইশদের পক্ষ থেকে আসে আব্দুর রহমান বিন আবু বকর। ঐতিহাসিক ওয়াকিদী এই ঘটনার বিবরণ এভাবে দিয়েছেন যে, আব্দুর রহমান হুঙ্কার ছেড়ে ময়দানে এলে তারই পিতা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু পুত্রের মোকাবিলার জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হন।
“সামনে আয় মুসলিম পিতার কাফের ছেলে।” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাঘের ন্যায় হুঙ্কার দিয়ে বলেন।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাপ-বেটাকে সামনা-সামনি দেখে ছুটে এসে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গতিরোধ করেন।
তরবারি কোষবদ্ধ কর আবু বকর।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আদেশ করেন এবং তাঁকে নিয়ে পশ্চাতে চলে যান।
♣♣♣
সেদিনের যুদ্ধের আওয়াজ খালিদের কানে আজও ঝংকারিত হচ্ছে। রণাঙ্গনের বিভিন্ন দৃশ্য তার চোখের ক্যামেরা যতনে রেখেছিল। একেকটি পলক তাঁর সামনে একেকটি দৃশ্যের অবতারণা করছিল। মল্লযুদ্ধ শেষ হতেই কুরাইশ বাহিনী মুসলমানদের উপর একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ পাহাড়কে পেছনে রেখে অবস্থান এবং সৈন্যবিন্যাস করেছিলেন সেজন্য পেছন দিক থেকে আক্রমণের কোন সম্ভাবনা ছিল না। সংখ্যায় মুসলমানরা অল্প হলেও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং অস্ত্র পরিচালনার নৈপুণ্য দ্বারা এ ঘাটতি পূরণ করে দিয়েছিলেন। কুরাইশদের সংখ্যা তিনগুণ না হলে তারা মুজাহিদ বাহিনীর সম্মুখে দাঁড়াতেই পারত না। অধিক সৈন্য বলে তারা লড়ে যাচ্ছিল মাত্র।
খালিদের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পার্শ্ববাহিনীতে অবস্থান করছিলেন। এই বাহিনীর প্রতি আক্রমণ করা তার একান্ত আশা ছিল। তার অধীনস্থ অশ্বারোহী দলকে সংকীর্ণ রাস্তা অতিক্রম করে দ্রুত এগিয়ে যেতে এবং মুসলমানদেরকে একযোগে আক্রমণের নির্দেশ দেন। কিন্তু তার ইচ্ছায় বাঁধ সাধে হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইরের চৌকস তীরন্দাজ বাহিনী। মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী খালেদ বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পশ্চাদপসারণে বাধ্য করে। এখানে তার বেশ কিছু অশ্ব ও সৈন্য নিহত হয়। বিপুল জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি মেনে নিয়ে পিছু হটার সময় তাদের সাথে ছিল কয়েকটি ঘোড়া এবং আহত সৈন্যের এক দীর্ঘ লাইন। নিহত সৈন্য আর ঘোড়া সেখানেই পড়ে থাকে।
তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল যুদ্ধ। উভয় পক্ষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে লিপ্ত। ব্যস্ত সবাই সমর শক্তি প্রদর্শনে। কিন্তু এক ব্যক্তি ছিল এর ব্যতিক্রম। সে যুদ্ধ করছিল না। সে একটি বর্শা হাতে রণাঙ্গনে ঘুরছিল। যেন সে কাউকে খুঁজছে। লোকটির নাম ওয়াহশী বিন হারব। সে নিয়মিত যুদ্ধ এড়িয়ে হযরত হামজা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তালাশ করে ফিরছিল। হযরত হামজা রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই আজ তার প্রধান লক্ষ্য বস্তু। কৌশলে তাকে হত্যা করতে চায় সে। তাঁকে হত্যা করতে পারলে ডবল পুরস্কার তার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রথমত দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ। দ্বিতীয়ত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার শরীরের সকল অলঙ্কারের মালিকানা।
এক সময় সে হযরত হামজা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখতে পায়। তিনি সিবা বিন আব্দুল উযযার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন।
তখনকার আরব সমাজে মহিলারা খৎনার কাজ করত। ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের বর্ণনামতে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেও আরব সমাজে খৎনার প্রচলন ছিল। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু সে সিবার প্রতি চড়াও হন তার মাতা খৎনার কাজ করত।
“খৎনাকারিণীর পুত্র।” হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু হুঙ্কার দিয়ে বলেন– এদিকে আয় এবং শেষবারের মত আমাকে দেখে যা।”
সিবা বিন আব্দুল উযযা হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে এগিয়ে আসে। ক্রোধে তার চেহারা লাল হয়ে উঠেছিল। তরবারি চালনায় ভীষণ পটু ছিল সে। হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুও তার থেকে কোন অংশে কম ছিলেন না। উভয়ই মুখোমুখি হয় এবং আঘাত পাল্টা আঘাত চলতে থাকে। ঢাল উভয়ের হামলা ব্যর্থ করে দিচ্ছিল। সিবা পার্শ পরিবর্তন করে কৌশলী আক্রমণ করে। কিন্তু ঢাল তলোয়ারের মাঝপথে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ সময়ে ওয়াহশী অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে অগ্রসর হয়। উঁচু-নিচু টিলা তাকে লুকিয়ে রাখে। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টি ছিল শত্রুর প্রতি নিবদ্ধ। সিবা ব্যতীত আর কেউ তাঁর নজরে পড়েনি।
ওয়াহশী নিজেকে আড়াল করে এক সময় কাছে পৌঁছে যায়। বর্শা নিক্ষেপে সে ছিল সিদ্ধহস্ত। সে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এত কাছে পৌঁছে যায় যেখান থেকে তার নিক্ষিপ্ত বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সামান্যও সন্দেহ ছিল না। এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। বর্শা হাতে তোলে পজিশন নেয় এবং মোক্ষম সুযোগের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে গুপ্ত হত্যার প্রতি যখন চূড়ান্ত তখন তিনি আক্রমণের পর আক্রমণ করে সিবাকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছেন। এক সময় তিনি প্রচণ্ড বেগে তরবারি চালালে তরবারি সরাসরি সিবার পেটে আঘাত হানে। তিনি তরবারি এমনভাবে টেনে বের করেন যে, এতে তার পেট আরো ফেড়ে যায়। সিবা হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পায়ে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
