“ইবনে উম্মে ইকরামা! আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না। তুমি মদীনায় আস—এটাও চাই না। কারণ, তুমি এলে এখানকার জনতার মাঝে নিরাশা আর হতাশা ছড়িয়ে পড়বে। মদীনার ধারে-কাছে ভিড়বে না। তুমি ইয়ামামা এলাকা ছেড়ে হুজায়ফার সাথে গিয়ে মিলিত হবে। সম্মিলিতভাবে আম্মনবাসীদের সাথে যুদ্ধ করবে। এখানে যুদ্ধ শেষ হলে আরফাযার সাহায্যার্থে মাহরা চলে যাবে। তারপর ওখান থেকে ইয়ামান গিয়ে মুহাযির বিন আবী উমাইয়্যার সাথে গিয়ে মিলিত হবে। যতদিন তুমি সফল সেনাপতির পরিচয় দিতে সক্ষম না হবে ততদিন আমাকে তোমার মুখ দেখাবে না। আমি তোমার সাথে কথা পর্যন্ত বলব না।”
খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অপর সেনাপতি হযরত শারযীল রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাবর নির্দেশ পাঠান যে, যেখানে বর্তমানে আছ সেখানেই অবস্থান করে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অপেক্ষা কর। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এলে নিজের সৈন্য তার হাওলা করে দিয়ে নিজেও তার অধীন হয়ে যাবে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানিয়ে দেয়া হয় যে, হযরত শারযীল রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সৈন্য তিনি পেয়ে যাবেন। এতে তিনি এই চিন্তার সময়ে বেজায় খুশী হন যে, এবার তিনি অতি সহজে মুসাইলামার মোকাবিলা করতে সক্ষম হবেন। তার আশা ছিল হযরত শারযীলের সৈন্যরা পূর্ণ তেজোদীপ্ত হবে। কিন্তু এ সৈন্য যখন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লাভ করেন তখন তারা তেজোদ্যম ছিল না। অধিকাংশই হতোদ্যম এবং কতক ছিল রক্তাক্ত-আহত।
“কি হয়েছে শারযীল?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনার ব্যাখ্যা চান।
“একরাশ লজ্জা ছাড়া কোন জবাব আমার কাছে নেই”—শারযীল আহত স্বরে বলে—“আমি খলীফার নির্দেশ অমান্য করেছি। আমার প্রতি কেন্দ্রের নির্দেশ ছিল, হযরত ইকরামাকে সাহায্য করার জন্য। কিন্তু আমার পৌঁছার পূর্বেই ইকরামা মুসাইলামার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পিছু হটে আসে। এটা একটি আত্মপ্ররোচনা ছিল, যা আমাকে কাবু করে যে…।”
“একটি বিজয় তোমার খাতায় লেখা হয়ে যাক”—অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিদ্রুপের ভঙ্গিতে হযরত শারযীলের জবাব পূরণ করতে গিয়ে বলেন—“বিচ্ছিন্ন পাথরের কোন শক্তি নেই শারযীল! কিন্তু এই পাথরযোগে যখন কোন প্লাটফর্ম তৈরী হয় তখন সেটা এত শক্তিধর হয়ে ওঠে যে, যেই তার সাথে একবার মাথা ঠুকে, সে দ্বিতীয়বার মাথা ঠুকার জন্য আর জীবিত থাকে না। ব্যক্তি স্বার্থ এবং আত্মঅহমিকার পরিণাম দেখেছ তো? ইকরামার মত অভিজ্ঞ সেনাপতিও চরমভাবে পর্যদস্ত হয়েছে। আমি তোমার প্রতি এই অনুগ্রহ করছি যে, তোমার নির্বুদ্ধিতার খবর খলীফাকে জানতে দিব না।”
হযরত শারযীল বিন হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত ভুলের শিকার হয়েছিলেন। তিনিও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাজি জেতার উদ্দেশ্যে পথিমধ্যেই মুসাইলামার সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত পিছু হটে আসতে বাধ্য হন।
জাকজমকপূর্ণ দরবার। দরবারে উপচে পড়া ভীড়। মুসাইলামা মধ্যমণি। দরবারের প্রধান আকর্ষণ। তাকে ঘিরে দরবার দারুণ জমে উঠেছে। সুকৌশলে খর্বকায় এবং কুৎসিত এই লোকটি ইতোমধ্যে পুরোপুরি নবী হয়ে গিয়েছিল। তার গোত্র বনূ হানীফা প্রথম থেকেই তার নবুওয়াতের স্বীকৃতি প্রদান করে। অন্যান্য গোত্রের লোকেরাও বড় আবেগ ও আগ্রহ নিয়ে তার হাতে বাইয়াত ও তাকে এক পলক দেখতে ভীষণ উদগ্রীব থাকত। মানুষ তার শক্তি এবং অলৌকিক গুণ দেখেছিল। এখন তার অনুসারীরা আরো দুটি জলজ্যান্ত মোজজা দেখে নেয়। তারা মুসলমানদের দুই প্রখ্যাত সেনাপতিকে স্বল্প সময়ে অনায়াসে রণাঙ্গন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল।
ধর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে মুসলমানরা রেশমের চেয়েও মোলায়েম ছিল।
কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে তারা ইস্পাতের চেয়েও শক্ত এবং বিদ্যুৎগোলকে পরিণত হত। সমর দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলমানরা রীতিমত ভয়ঙ্কর দানবের রূপ পরিগ্রহ করেছিল। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এবং হযরত শারযীল রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেদের ভুল এবং বিচক্ষণতার স্বল্পতার দরুণ পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু বনু হানীফা এটাকে তাদের ভণ্ড নবীর মোজেজা এবং অলৌকিকতার খাতায় লিপিবদ্ধ করেছিল। তারা গর্বের সাথে বলত, মুসাইলামা ছাড়া মুসলমানদের পরাজিত করার মত আর কে আছে।
“নাহারুর রিযাল!” মুসাইলামা নিকটে বসা তার ডানহাতি হিসেবে পরিচিত নাহারুর রিযালকে সম্বোধন করে বলে—“এখন আমাদের মদীনামুখী হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া দরকার। মুসলমানদের মধ্যে এখন আগের সেই শৌর্য-বীর্য নেই।”
পূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, নাহারুর রিযাল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্যে থেকে পবিত্র কুরআন পড়া শিখেন এবং শরীয়তের উপর গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে মুবাল্লিগ করে মুসাইলামার এলাকায় পাঠান কিন্তু তিনি মুসাইলামার যাদুর কাছে পরাস্ত হয়ে পড়েন। ফলে নিজেও তার ভক্ত হয়ে মুসাইলামার নবুওয়াতের ব্যাপক চর্চা শুরু করেন। কুরআনের আয়াতের বিভিন্ন অপব্যাখ্যা করে তাদেরকেও মুসাইলামার অনুসারীর কাতারে এনে দাঁড় করায় যারা একদা খাঁটি ইসলাম কবুল করেছিল। মুসাইলামা তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে প্রধান উপদেষ্টা বানায়। এটা ছিল শরাব এবং নারী-রূপের যাদুর কারসাজী। মুসাইলামা নিজেও অত্যন্ত খর্বকায় এবং জঘন্য চেহারার হওয়া সত্ত্বেও নারী মহলে সে অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিল। ঐতিহাসিকের মন্তব্য, তার চেহারায় মহিলারা এক ধরনের বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করত। সায্যাহ এর মত নারী কিলোপেট্রার ন্যায় সমরশক্তি নিয়ে মুসাইলামাকে পরাস্ত করতে এসে মাত্র এক সাক্ষাতেই তার স্ত্রী হয়ে যায়।
