মুসাইলামা সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, সে নবুওয়াতের দাবী করেছিল। তার ভক্ত ও অনুসারীর সংখ্যা এত বৃদ্ধি পায় যে, তার সৈন্যরা মুসলিম বাহিনীর জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এ সময়ে মুসলমানরা এক বিরাট শক্তিতে পরিণত হয় কিন্তু অপরদিকে মুসাইলামার শক্তিও বর্ধিত হতে থাকে। এটা যেমন মদীনার জন্য আশংকাজনক ছিল তেমনি ইসলামের জন্যও ছিল উদ্বেগজনক। মদীনা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের হেড কোয়ার্টার।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাতাহে এসে মুসাইলামার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তার জানা ছিল যে, পুরাতন দোস্ত সেনাপতি ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্র এলাকার আশে-পাশে কোথাও সৈন্য নিয়ে অবস্থান করছেন। ফলে কঠিন মুহূর্তে তিনি এসে খালিদ বাহিনীকে সাহায্য করবেন।
হযরত ইকরামা বিন জাহল রাযিয়াল্লাহু আনহু ঐ ১১ সেনাপতির একজন, খলীফা যাদেরকে বিভিন্ন এলাকায় মুরতাদ এবং বিদ্রোহ দমনের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। মুসাইলামার গোত্রের ন্যায় এত শক্তিশালী অন্য কোন গোত্র ছিল না। তাই প্রথমে এ এলাকায় হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পাঠানো হয় এবং তার পশ্চাতে হযরত শারযীল নামে আরেক সেনাপতিকেও প্রেরণ করা হয়। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতি শারযীলকে হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সাহায্য করার নির্দেশ দিয়ে পাঠান।
হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামামায় চলছেন। এটা আড়াই মাস পূর্বের ঘটনা। তখন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অপর ভণ্ড নবী তুলাইহার সাথে শক্তি পরীক্ষায় লিপ্ত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তুলাইহাকে তুলোধুনা করে পরাস্ত করেন। এ সংবাদ হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কানে পৌঁছলে তিনি আবেগতাড়িত হন। তখনও পর্যন্ত কোন গোত্রের সাথে তার সংঘর্ষ হয় না। এর কিছুদিন পরে ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার জানতে পারেন যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমার শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করেছেন।
ঐতিহাসিকরা লেখেন, হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর এক ধরনের মানবিক দুর্বলতা প্রভাব বিস্তার করেছিল। তিনি সাথের অন্যান্য সেনাপতিকে বলেন, হযরত খালিদ যেখানে একের পর এক রণাঙ্গনে বিজয় অর্জন করে চলেছে সেখানে তিনি এখনও কোন যুদ্ধের মুখোমুখী হননি। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হয়ত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণের পূর্ব হতেই পরস্পর ঘনিষ্ঠ সাথী, এক মানের যোদ্ধা এবং রণাঙ্গনে উভয়ে দক্ষ নেতৃত্বদানে পারঙ্গম ছিলেন।
“আমরা এমন একটি বিজয় অর্জন করতে পারি না, যার সামনে খালিদের সকল বিজয় ম্লান হয়ে যায়?” হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু অধীনস্ত সেনাপতিদের লক্ষ্য করে বলেন—“আমি জানতে পেরেছি, শারযীল আমাদের সাহায্যে আসছেন। জানি না তিনি কবে নাগাদ এসে পৌঁছবেন। বেশীদিন অপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি মুসাইলামার উপর আক্রমণ করতে চাই।”
মুসাইলামা অর্বাচীন কিংবা নির্বোধ ছিল না। তার ভাল করেই জানা ছিল যে, মুসলমানরা তার নবুওয়াত কোনভাবেই বরদাশত করবে না। যে কোনদিন মুসলিম বাহিনী এসে তার টুটি চেপে ধরতে পারে। সে নিজ এলাকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করে রেখেছিল। চৌকস এবং গোয়েন্দা টিমও প্রস্তুত রাখে। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু সার্বিক দিক বিবেচনা না করেই অগ্রসর হন এবং ইয়ামামার নিকটে এসে পৌঁছান। আবেগ উদ্বেলিত হওয়ায় শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রাখার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি সতর্ক হতে পারেন না। তিনি শত্রুদের না দেখলেও অপর পক্ষের গোয়েন্দারা ঠিকই তার বাহিনীকে দেখে ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে মুসাইলামাকে অবহিত করে।
উঁচু-নীচু টিলা ও বালিয়াড়ি এক স্থানে মূসাইলামার কতক সৈন্যের উপর হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখ পড়ে। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের উপর হামলা চালান। কিন্তু এটা মুসাইলামার একটি পাতা ফাঁদ বৈ ছিল না। মুসাইলামা অত্র অঞ্চলের ডানে বামে অগ্রে-পশ্চাতে বিপুল সৈন্য লুকিয়ে রেখেছিল। গুপ্ত এ বাহিনী চতুর্দিক থেকে ইকরামা বাহিনীর উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু এই ধারণাতীত পরিস্থিতি সামলে উঠতে ব্যর্থ হয়। মুসাইলামার বাহিনী তাদেরকে সামলে উঠতে সুযোগ দেয় না। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে প্রখ্যাত এবং অভিজ্ঞ সেনাপতি ছিল। কিন্তু রণাঙ্গন ছিল শত্রুর নিয়ন্ত্রণে। তারা মুসলমানদের কোন চাল সফল হতে দেয় না। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পিছে হটে আসতে হয়।
হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষে এই পরাজয়ের খবর গোপন করা সম্ভব ছিল না। গোপন করলে সৈন্যদের কেউ মদীনায় খবর পৌঁছে দিত। হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু পূর্ণ বিবরণ লিখে খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বরাবর পাঠিয়ে দেন। পত্র পাঠে তিনি ভীষণ মনঃক্ষুন্ন হন। তিনি ইতিপূর্বে স্পষ্টভাষায় হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন সেনাপতি শারযীলের পৌঁছার অপেক্ষা করেন এবং একাকী মুসাইলামার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত না হন। কিন্তু হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ধৈর্যধারণ করতে পারেননি। তিনি ত্বরিৎ আবেগের শিকার হন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে যে লিখিত জবাব দেন তাতে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ এভাবে ছিল যে, তিনি হযরত ইকরামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ইবনে আবু জাহলের (বাপের বেটা-এর) পরিবর্তে ইবনে উম্মে ইকরামা (মায়ের বেটা) লেখেন। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা উদ্দেশ্য হলে আরবে তাকে পিতার প্রতি সম্বন্ধ না করে মাতার প্রতি সম্বন্ধ করা হত। এর দ্বারা এটা বুঝানো হত যে, তোমার জন্মের বিষয়টি বিতর্কিত অথবা তুমি স্বীয় পিতার সন্তান নও। খলীফার পত্রের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ”
