“উমর!” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“এতটুকু তো ঠিক যে, খালিদ থেকে ভুল সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু এ ভুল এতটা মারাত্মক নয় যে, তাকে অপসারণ করে রীতিমত শাস্তি দিতে হবে।”
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছু ছাড়েন না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রতি হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এই কঠোরতার কারণ তার প্রতি কোনরূপ শত্রুতা বা বিদ্বেষ নয়; বরং আসল কথা হলো, হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বোচ্চ ন্যায়পরায়ণ এবং নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রতি বড়ই কঠোর ছিলেন। সেনাপতিদের মাঝে কোন অন্যায়-আচরণ ও ভূলের অনুপ্রবেশ হোক তা তিনি চাচ্ছিলেন না। বিচার সাপেক্ষে সমুচিত শাস্তি দিয়ে তিনি ভবিষ্যতের জন্য সকল সেনাপতিকে শিক্ষা দিতে চান।
“না উমর!” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বারবার পীড়াপীড়ির পর বলেন—“আমি ঐ তলোয়ার খাপবদ্ধ করতে পারি না, যাকে আল্লাহ্ তা’আলা কাফেরদের উপর বিজয়ী করেছেন।”
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তুষ্ট হতে পারেন না। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অসন্তুষ্টও করতে চান না। তিনি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মদীনায় তলব করেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ সফর পাড়ি দিয়ে বহুদিন পর মদীনায় পৌঁছেন এবং সর্বপ্রথম মসজিদে নববীতে যান। তিনি মাথার পাগড়িতে একটি তীর বিদ্ধ করে রেখেছিলেন। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদেই ছিলেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে দেখে তিনি রীতিমত উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি উঠে দাঁড়ান এবং হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পাগড়ি হতে তীর টেনে বের করেন এবং তা টুকরো টুকরো করে দূরে ছুড়ে দেন।
“তুমি এক মুসলমানকে হত্যা করেছ”—হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগতস্বরে বলেন—“এবং তার স্ত্রীকে নিজের স্ত্রী বানিয়েছ। তুমি প্রস্তর বর্ষণে হত্যার যোগ্য।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিয়মানুবর্তীতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মর্যাদা ও পদাধিকার সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল ছিলেন। ফলে নিশ্চুপ থাকেন। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কোন কথার প্রতিবাদ করেন না। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর রাগ পড়ে গেলে তিনি নীরবে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসেন এবং সোজা খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমীপে গিয়ে উপস্থিত হন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুই তাকে কারণ দর্শানোর জন্য ডেকে পাঠিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সম্মতি পেয়ে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনপূর্বক মালিক বিন নাবীরার সমস্ত ঘটনা ও অপরাধের বিবরণ দেন। তিনি অকাট্যভাবে প্রমাণ করেন যে, মালিক বিন নাবীরা মুসলমান ছিল না; বরং উল্টো মুসলমানদের প্রাণের শত্রু ছিল।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তিরস্কার করেন এবং তাকে সতর্ক করে দেন যে, ভবিষ্যতে এমন কোন আচরণ যেন না করেন, যা অন্যান্য সেনাপতির মাঝে ভুলের প্রচলন ঘটায়। ইমাম তবারী এবং হাইকাল প্রমুখের বর্ণনা মুতাবিক হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিশেষে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন যে, বিজিত গোত্রের কোন নারীকে বিবাহ করা এবং ইদ্দতকাল পূর্ণ না করা আরবের প্রচলিত রীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, এ নারী পরিশেষে বাঁদীই হত। তাই মনিবের এ ইখতিয়ার রয়েছে যে, সে তাকে বাঁদীও বানাতে পারে, আবার চাইলে বিবাহ করে স্ত্রী বানিয়ে রাখতে পারে।
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে আরো বলেন, বর্তমানে মুসলমানরা চতুর্দিক থেকে বিপদ কবলিত। গোত্রের পর গোত্র বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচু করছে। এর বিপরীতে আমাদের সৈন্যসংখ্যা খুবই অপ্রতুল। এমতাবস্থায় কোন সেনাপতি শত্রু পক্ষের কোন নেতাকে ভুলক্রমে হত্যা করে ফেললেও তা কোন মারাত্মক অপরাধ নয়।
খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, ইসলামের এক ঘোরতর শত্রু মুসাইলামা বিন হানীফা নবুওয়াতের দাবী করে এক বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তার অধীনে কম-বেশী ৪০ হাজার সৈন্য আছে। ইকরামা বিন আবু জাহল ইতোমধ্যে তার কাছে পরাজিত হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি খালিদের দিকে। মুসাইলামাকে পরাস্ত না করতে পারলে ইসলাম মদীনার মাঝেই কার্যত বন্দী হয়ে পড়বে। এ সফলতার জন্য হযরত খালিদের বিকল্প নেই।
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চুপ থাকেন। তিনিও বিপদের গুরুত্ব যথাযথ অনুধাবন করতে সক্ষম হন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে নির্দেশ দেন, এখনি বাতাহে রওয়ানা হয়ে যাও এবং সেখান থেকে সসৈন্যে মার্চ করে গিয়ে ইয়ামামায় আক্রমণ করে উত্থিত ফেৎনার মূলোৎপাটন কর।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক এক যুদ্ধের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বাতাহে উড়াল দেন। তিনি বাতাসের বেগে এসে বাতাহে পৌঁছান এবং পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
॥ চৌদ্দ ॥
৬৩২ খ্রিস্টাব্দের তৃতীয় সপ্তাহে হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মাত্র ১৩ হাজার সৈন্য নিয়ে ৪০ হাজারেরও অধিক মুরতাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে ইয়ামামা নামক স্থানে এক ঘোরতর যুদ্ধে লিপ্ত হন। ইতিহাসে এটাই ইসলামের সর্বপ্রথম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচিত। এ যুদ্ধের শেষাংশ ‘হাদীকাতুর রহমান’ নামক এক বিস্তীর্ণ বাগিচায় অনুষ্ঠিত হয়। এখানে উভয় পক্ষের এত প্রাণহানি ঘটে যে, মানুষ ঐ বাগিচাকে হাদীকাতুর রহমান-এর পরিবর্তে ‘হাদীকাতুল মওত’ (মৃত্যুদানব) নামে স্মরণ করে। আজও ঐ স্থানটি ‘হাদীকাতুল মওত’ নামে পরিচিত।
