শালীন রুচিসম্পন্ন এবং উন্নততর মানসিকতার দরুণ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লায়লার ভূবনমোহিনী রূপ-সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হলেও হতে পারেন। কিন্তু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাস্তবে এমন উচ্চ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যে, মৃত্যুশয্যায় তিনি বলেছিলেন, আমার দেহে এমন কোন স্থান আছে কি, যেখানে জিহাদের ক্ষত চিহ্ন নেই? তার ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র এত দুর্বল ছিল না যে, এক নারীর কারণে নিজের পদমর্যাদা হতে অন্যায়ভাবে ফায়দা লুটবেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষ অবলম্বনকারীদের ব্যাখ্যা হল, তিনি মালিক বিন নাবীরা ও তার সাথীদেরকে কয়েদখানায় নিক্ষেপ করেন। তিনি নিজে তাদের বিচার না করে মদীনায় পাঠাতে চান। সে সময় রাতে তীব্র শীত পড়ত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খেয়াল হয় যে, হয়ত কয়েদীরা শীতে কষ্ট পাচ্ছে এবং কাঁপছে। তিনি নির্দেশ দেন—“দাফিউ আসরাকুম অর্থাৎ বন্দীদের গরমের ব্যবস্থা কর”—কেনানা ভাষায় ‘মুদাফাত’ হত্যার অর্থে ব্যবহৃত হত। দুর্ভাগ্যক্রমে বন্দীরা যাদের প্রহরাধীন ছিল তাদের সবাই ছিল কেনানার অধিবাসী। মালিক বিন নাবীরা এবং তার সাথীদের অপরাধের মাত্রাও যে ভয়ানক ছিল তাও তারা জানত। ফলে তারা “গরমের ব্যবস্থা”-এর অর্থ বুঝে হত্যা করা। যার দরুণ প্রহরীরা মালিক এবং তার সাথীদের হত্যা করে দেয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন ঘটনা জানতে পারেন তখন এর উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন—“আল্লাহর ইচ্ছা যে কোন উপায়ে সম্পন্ন হয়েই থাকে।”
এ ছাড়া পরস্পর সাংঘর্ষিক ও স্ববিরোধী অসংখ্য বর্ণনা ইতিহাসে ভরপুর। এর কতক হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষে যায় আর কতক যায় বিপক্ষে। বিরোধী বর্ণনাগুলোর বর্ণনাকারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে তাকালে স্পষ্ট অনুমিত হয় যে, তাদের প্রতিটি শব্দ আক্রোশ ও পক্ষপাতিত্বে ভরা। প্রতিটি শব্দ হতে যেন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবমাননা ঝরে পড়ছে।
ইতিহাস স্ববিরোধী বর্ণনায় বড়ই সরব কিন্তু এই বিবাহে লায়লার প্রতিক্রিয়া কি ছিল সে ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরব। কোন ঐতিহাসিক লেখেনি যে, লায়লা বাধ্য হয়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়, না কি এক ভূবন বিজয়ী বীর, নামকরা সেনাপতির সাথে তার বিবাহ হচ্ছে বলে খুব আনন্দিত হয়।
তৎকালীন যুগের সমরনীতি অনুযায়ী লায়লা গনিমতের মাল ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইলে তাকে বাঁদী হিসেবে নিজের কাছে রেখে দিতে পারতেন। ইতিহাসের একটি বর্ণনা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পক্ষে যায়। আর তা হলো, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিজের বা অন্য কারো বাঁদী হওয়ার থেকে রক্ষা করেন। সে শাহজাদীর মত রূপবতী ছিল। বাঁদীর জীবন কত দুঃখ ও বঞ্চনার হয় তা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতেন। তিনি আরো অনুভব করেন যে, লায়লা নজরকাড়া সুন্দরী হওয়ার সাথে সাথে বড় বিচক্ষণ এবং জ্ঞানীও বটে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মূলত এক অসহায় নারীর সুপ্ত প্রতিভা এবং যোগ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
সুদূর মদীনাতেও এই খবর পৌঁছে যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মালিক বিন নাবীরাকে হত্যা করে তার স্ত্রীর সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছেন। খবর পৌঁছে তাও সোজা খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে। সংবাদদাতা ছিলেন হযরত আবু কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত বিশিষ্ট সাহাবী। তিনি এই বিবাহে অত্যন্ত মনঃক্ষুন্ন হয়ে যুদ্ধ ছেড়ে মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনাকে তেমন গুরুত্ব দেন না। তিনি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি প্রদান করেছেন। তার বিরুদ্ধে তিনি কোন পদক্ষেপ নিবেন না। তিনি তো কোন জীবিত ব্যক্তির স্ত্রীকে আটকে তাকে নিজের বধূ বানাননি।
হযরত আবু কাতাদা আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জবাবে তুষ্ট হন না। তিনি হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে যান এবং তাকে এমন ভাষায় লায়লার সাথে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বিবাহের কাহিনী শোনান, যার দ্বারা প্রকাশ পায় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন বিলাসপ্রিয় মানুষ এবং তার এই আয়েশী জীবন স্বীয় কর্তব্য পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং যুদ্ধযাত্রায় দারুণ ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বর্ণনাভঙ্গিতে হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ক্রোধ উথলে ওঠে। তিনি আবু কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সাথে নিয়ে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সকাশে উপস্থিত হন।
“সম্মানিত খলীফা!” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেন—“খালিদের অপরাধ সামান্য নয়। বনূ ইয়ারবূর সর্দার মালিক বিন নাবীরাকে হত্যার বৈধতা সে কিভাবে প্রমাণ করবে?”
“কিন্তু তুমি কি চাও উমর?” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন।
“খালিদের অপসারণ!” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“কেবল অপসারণ নয়; তাকে গ্রেপ্তার করে এখানে এনে শাস্তি দেয়া হোক।”
