“মালিক বিন নাবীরা!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মালিককে সামনে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন—“এটা কি সত্য নয় যে, তুমি যাকাত কর ইত্যাদি উঠিয়ে মদীনায় প্রেরণের পরিবর্তে আবার লোকদের ফিরিয়ে দিয়েছিলে?”
“মুসলমানদের মোকাবিলা না করার পরামর্শ দিয়ে আমি এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম”—মালিক বিন নাবীরা জবাবে বলে—“আমি তাদের এ কথাও বলেছিলাম যে, তোমরা মুসলমান হয়ে যাও এবং যাকাত আদায় কর।”
“আর তোমার নিজের আত্মগোপনের কারণ এই যে, তুমি ইসলাম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলে”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“এবং তুমি ইসলাম থেকে দূরেই থাকতে চাও।…তুমি কবিতার মাধ্যমে মানুষকে বলেছিলে, তারা যেন যাকাত-কর না দেয়। আর তুমি নিজেও ইসলামী হুকুমতের বিরুদ্ধাচরণ করে লোকদেরও বিরুদ্ধাচরণ করতে প্ররোচিত করেছিলে।”
‘হ্যাঁ, ওলীদের পুত্র।” মালিক বলে—“আমি এতদিন বিরুদ্ধাচরণ করেছি ঠিকই কিন্তু এখন আমি তাদেরকে ইসলামী হুকুমতের বিরুদ্ধাচরণ করা হতে নিষেধ করছি।”
“তুমি সায্যাহ এর মিথ্যা নবুওয়াতকেও স্বীকৃতি দিয়েছিলে।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“এবং তার সাথে মিলে জনতার প্রাণনাশ এবং তাদের অর্থ-সম্পদ লুণ্ঠন করেছ। আর মুসলমানদের উপর চালিয়েছ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ।”
মালিক মাথা ঝুকিয়ে নিজের অপরাধ স্বীকার করে।
“এতগুলো অপরাধের পর তোমাকে হত্যা না করার কোন কারণ আছে কি?” হযরত খালিদ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে জানতে চান।
“আমার বিশ্বাস, আমাকে হত্যার কোন নির্দেশ খলীফা আপনাকে দেননি”— মালিক বিন নাবীরা বলে।
“খোদার কসম!” হযরত খালিদ বলেন—“আমি তোমাকে বেঁচে থাকতে দিতে পারি না।”
মালিক বিন নাবীরা সামনে এলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখের সামনে ভেসে আসে ঐ উজার বসতি, যা মালিক এবং সায্যাহ মিলে ধ্বংস করে দিয়েছিল। মালিকের প্রতি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন। তার অপরাধগুলোর প্রত্যেকটি ছিল জঘন্য ও ক্ষমাহীন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক দূরে ছিলেন। তিনি সেখান হতে অযথা বাতাহে ছুটে আসেননি। তাঁর কাছে রীতিমত গোয়েন্দা রিপোর্ট পৌঁছতে থাকে। মালিক যে অত্যন্ত জঘন্য ও নৃশংস পন্থায় মুসলমানদের হত্যা ও ধ্বংস করে তিনি তা ভালভাবেই জানতেন।
“তাকে এবং তার সাথে যারা আত্মগোপন করেছিল তাদের নিয়ে যাও এবং হত্যা করে ফেল”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ দেন।
তাদেরকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গেলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে খবর পৌঁছে যে, লায়লা নাম্নী এক রূপবতী নারী তার সাক্ষাৎপ্রার্থী। সে নিজেকে মালিক বিন নাবীরার স্ত্রী পরিচয় দিয়ে স্বামীর জীবন ভিক্ষা চাইতে এসেছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উপস্থিত করতে বলেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও ছিলেন সর্দার পুত্র। খান্দানী ও শাসক পরিবারে লালিত-পালিত হওয়ার দরুণ তার মন-মানসিকতা প্রশস্ত ছিল। উন্নত অভিরুচি, প্রফুল্লচিত্ত এবং ফুরফুরে মেজাজের লোক ছিলেন। লায়লা তার সামনে এসে দাড়ালে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুহূর্তকালীন নেত্রে তার দিকে চেয়ে থাকেন। লায়লা তখনও পূর্ণ যুবতী ছিল।
“স্বামীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে এসেছ?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান।
“এ ছাড়া আর কিইবা উদ্দেশ্য হতে পারে আমার?” লায়লা বলে।
“যখন সে প্রতিটি বসতিকে নিজের অধিকারভুক্ত মনে করে একের পর এক অপরাধ চর্চা করছিল তখন যদি তুমি তাকে বাধা দিতে তাহলে আজ এভাবে বিধবা হতে হত না”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“সে কি তোমাকে বলেনি, তার তলোয়ার কত বধূকে বিধবা করেছে। তার জানা ছিল না যে, পাপের খেসারত তাকে একদিন দিতেই হবে।”
“তাকে রোধ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না”—লায়লা বলে।
“তাহলে আজও তুমি আমাকে বিরত রাখতে পারবে না”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“এটা আমার নিজের নয়; খোদ আল্লাহর নির্দেশ।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লায়লার আবেদন গ্রাহ্য করেন না। লায়লা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে থাকাকালেই খবর এসে পৌঁছে যে, মালিক বিন নাবীরা এবং তার অন্যান্য সাথীদের হত্যা করে দেয়া হয়েছে।
॥ তের ॥
এরপর একটি সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে খালিদ বাহিনী এবং মদীনায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। আর তা হলো, বাতাহে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লায়লাকে বিবাহ করেছিলেন।
মদীনার আনসাররা এ বিবাহে ভীষণ ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হযরত আবু কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু শপথ করেন যে, ভবিষ্যতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে কোন যুদ্ধে কখনো অংশগ্রহণ করবেন না। তাদের অভিযোগের ভিত্তি হল, তারা ধারণা করে যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লায়লার রূপ-সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তার স্বামী মালিক বিন নাবীরাকে হত্যা করে তাকে নিজে বিবাহ করার জন্য।
এ সম্পর্কিত যে সমস্ত বর্ণনা প্রচলিত আছে তার মধ্য একটির বিবরণ এরূপ যে, লায়লা স্বামীর প্রাণভিক্ষা চাইতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে আসে এবং এক পর্যায়ে তার পায়ে পড়ে মিনতি জানায়। লায়লার মাথায় কাপড় থাকত না এবং তার চুল খোলা থাকত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পা ধরে যখন সে মাথা নিচু করে তখন তার খোলা চুলগুলো কাঁধের উপর এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বিক্ষিপ্ত চুল হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দৃষ্টিকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি চুল দেখে বড়ই মুগ্ধ হয়ে বলেন—“এখন তো তোমার স্বামীকে অবশ্যই হত্যা করব।”
