জনতা উদ্ভূত বিপদ ও তার মাত্রা অনুভব করতে সক্ষম হয়। ফলে মোকাবিলার পক্ষে কেউ টু-শব্দ করে না। মাথা ঝুঁকিয়ে সকলে নিজ নিজ ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
৬৩২ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাতাহ এলাকায় পৌঁছে যান। তিনি সেখানে পৌঁছেই সৈন্যদেরকে অবরোধের ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করেন। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে বাতাহ তার কাছে উজাড়ভূমি বলে মনে হতে থাকে। শহরের প্রতিরক্ষায় একজনকেও এগিয়ে আসতে দেখা যায় না। এমনকি বেসামরিক কোন লোকজনও নজরে পড়ে না। ঘরের ছাদেও কারো মাথা দেখতে পাওয়া যায় না।
মালিক বিন নাবীরা নিজেকে এত চালু মনে করে যে, আমাকে ফাঁদে ফেলে ঘেরাও করবে?” হযরত খালিদ বাতাহের পিনপতন নিরবতায় উদ্বিগ্ন হয়ে সহ সেনাপতিদের বলেন—“অবরোধের পদ্ধতি চেঞ্জ কর এবং পিছনে সতর্ক দৃষ্টি রাখ। আমি এই বসতিতে আগুন লাগিয়ে দিব। তারা এখানে নেই। পিছনে সরে গেছে, যেন আমরা এখানে এসে পৌঁছলে অতর্কিতে পিছন থেকে এসে আক্রমণ করতে পারে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পূর্ণ সতর্ক, নির্ভীক এবং রণকুশলী ছিলেন। তার পদক্ষেপ অতি দৃঢ় এবং যৌক্তিক হত। তিনি স্বীয় বাহিনীকে দু’ধারী করে বিন্যস্ত করেন। যাতে পশ্চাৎ আক্রমণও রুখে দেয়া যায় এবং শহরের অভ্যন্তর হতে একযোগে শত্রু ছুটে এলে তারও মোকাবিলা করা যায়। মুসলমানদের যে ঘাটতি ছিল তা হলো সৈন্যের স্বল্পতা। মদীনা হতে অনেক দূরে থাকায় এ মুহূর্তে রিজার্ভ বাহিনী আসারও কোন সম্ভাবনা ছিল না। মুসলিম বাহিনী ইতোমধ্যে যে সমস্ত গোত্রকে অনুগত করতে সমর্থ হয়েছিল সে সমস্ত এলাকায় তাদের ঘাঁটি ও অবাধ অবস্থান ছিল। কিন্তু তখনও এলাকাবাসীর উপর পূর্ণ আস্থা রাখার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় নাই। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শাসরুদ্ধকর ও দক্ষ নেতৃত্ব মুষ্টিমেয় সৈন্যদের মাঝে বিজলির মত বজ্র সৃষ্টি করে রাখত।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বসতির মাঝে একদল সৈন্য প্রবেশ করান। কিন্তু তাদের উপর একটিও তীর এসে পড়ে না। প্রত্যেকটি ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিস্ময়কর এ নীরবতা দেখে নিজেই বসতির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন।
“মালিক বিন নাবীরা!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকবার মালিকের নাম ধরে ডাকেন এবং বলেন—“বাইরে বেরিয়ে এস। অন্যথায় পুরো বসতিতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হবে।”
“আল্লাহ আপনাকে নিরাপদ রাখুন”—একটি ঘরের ছাদ থেকে জনৈক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর ভেসে আসে—“আমাদের ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিবেন না। আপনি যাকে ডাকছেন সে এখানে নেই। এখানে কেউ আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র উত্তোলন করবে না।”
“ওলীদের পুত্র!” আরেক ছাদ থেকে আওয়াজ আসে—“আপনি কি দেখছেন না, আমরা ঘরের দরজা লাগিয়ে আড়ালে বসে আছি। মদীনাবাসী কি জানেনা যে, এই আলামতের অর্থ হল, নির্ভয়ে আস; আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরব না?”
“অবশ্যই এই ইশারা সম্পর্কে আমি অবগত”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এস। বাচ্চা ও মহিলাদের ইখতিয়ার। তারা চাইলে বাইরে আসতেও পারে আবার নাও আসতে পারে।”
মানুষ নিয়ম-নীতি জানত। তারা অস্ত্র ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে আসে। মহিলা এবং বাচ্চারাও বেরিয়ে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের তল্লাশী করতে পাঠান, যেন কোন ঘরে কোন পুরুষ না থাকে। তিনি সৈন্যদের কঠোরভাবে নিষেধ করেন যে, গৃহস্থ কোন মাল-দ্রব্যের যেন কোনরূপ ক্ষয়ক্ষতি না হয়। আর কারো প্রতি যেন বিন্দুমাত্র কঠোরতা না করা হয়।
মালিক বিন নাবীরার কেল্লাসদৃশ ভবনে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে যান। সেখানে শুধু গৃহস্থ আসবাবপত্র ইতস্তত পড়ে ছিল। গৃহের অভ্যন্তর বলছিল, গৃহস্থ পরিবার একটু আগে এখান থেকে বেরিয়ে গেছে। বসতি পরিদর্শন শেষে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এতটুকু অনুমান করতে সক্ষম হন যে, জনতাকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করার পরামর্শ দিয়ে মালিক স্ত্রী লায়লাকে সাথে নিয়ে পালিয়ে গেছে। যারা তাকে যেতে দেখেছিল তারা তার গতিপথ বলে দেয়। মালিক ঘোড়ায় এবং লায়লা উটে সওয়ার ছিল বলে তারা জানায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আশে-পাশের বসতিতে লোক পাঠায় এবং জনতা যে পথের খোঁজ দেয় সে পথে কয়েকজন সৈন্য প্রেরণ করে। এটা ছিল মরুপথ। উট এবং ঘোড়ার পদচিহ্ন খুব স্পষ্ট ছিল। বিরতিহনি পদচিহ্ন সৈন্যদেরকে একটি বসতিতে নিয়ে যায়। এটা ছিল বনূ তামীমের একটি বসতি।
“শোন, বনু তামীমের বাসিন্দা।” হযরত খালিদের পাঠানো লোকদের একজন উচ্চকণ্ঠে বলে—“মালিক বিন নাবীরা সহ বাতাহের কোন লোক এখানে আশ্রয় ও আত্মগোপন করে থাকলে তাদেরকে আমাদের হাতে তুলে দাও। আমাদের তল্লাশীতে কাউকে পাওয়া গেলে পুরো বসতি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়া হবে।”
একটু পরেই মালিক বিন নাবীরা লায়লাকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং নিজেই নিজেকে হযরত খালিদ বাহিনীর হাতে সোপর্দ করে। বনূ ইয়ারবূ এর আরো কতিপয় নেতৃস্থানীয় লোক এখানে এসে আত্মগোপন করেছিল। তারাও মালিকের অনুসরণ করে আত্মসমর্পণ করে। সৈন্যরা মালিক সহ সবাইকে বাতাহে নিয়ে আসে। লায়লাও মালিকের সাথে ছিল।
