প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম তবারী রাহিমাহুল্লাহ লেখেন যে, হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশমালায় এ পয়েন্টও উল্লেখ ছিল যে, বনী আসাদের নেতা তোলাইহাকে শায়েস্তা করে হযরত খালিদের বাহিনী বাতাহ পর্যন্ত যাবে। কেননা, সেখানকার আমীর মালিক বিন নাবীরা যাকাত ও অন্যান্য রাজস্ব আদায় করেনি। বরং সে ইসলাম বর্জন করে তার দুশমনে পরিণত হয়েছে।
ইমাম তবারী সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক লেখেন, আনসাররা বাযাখায় রয়ে যায় আর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের বাদ দিয়ে অন্যান্য সৈন্যদেরকে বাতাহ-এ নিয়ে যান। খালিদ অনুগত বাহিনী বাযাখা অতিক্রম করে গেলে রয়ে যাওয়া আনসাররা আপোসে আলোচনায় মিলিত হয়। তারা পরিস্থিতি ও অবস্থা এভাবে বিশ্লেষণ করে যে, আমরা এত দূর পর্যন্ত একসাথে ছিলাম। সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করেছি। এখন মাঝখানে এসে আমাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে। মূল বাহিনী হতে এভাবে পৃথক হয়ে যাওয়া আমাদের জন্য ঠিক হয়নি।
“আমাদের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা এ কারণেও ঠিক নয়”—এক আনসারী মন্তব্য করে—“যে মুহাজির আর নবমুসলিমরা কোন বিজয় হাসিল করলে তার কৃতিত্বের অংশীদার আমরা হব না। মদীনায় গিয়ে এর জন্য আমাদের লজ্জা পেতে হবে।”
“এবং এ কারণেও”—আরেকজন ভিন্ন কারণ উল্লেখ করে বলে—“যে, হযরত খালিদ কোথাও পরাজিত হলে মদীনার জনতা আমাদেরকে তিরস্কার করবে। তারা আমাদেরকে এই বলে নিন্দা করবে যে, মদীনা থেকে এত দূরের রণক্ষেত্রে এসে আমরা হযরত খালিদ ও তার সাথীদের সাথে প্রতারণা করেছি। আমাদেরকে অভিশাপ দেয়া হবে।”
আলোচনার এক পর্যায়ে সকল ভুল বুঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সম্মিলিতভাবে তারা খালিদ বাহিনীতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ততক্ষণ অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। তারা পরামর্শ করে এক দ্রুতগামী সওয়ার তৎক্ষণাৎ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে। দ্রুতগামী সওয়ার ধুলিঝড় উড়িয়ে খালিদ বাহিনীর লক্ষ্যে ছুটে আসে এবং সোজা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে এসে ঘোড়া থামায়।
“আনসারদের মধ্য হতে যারা পিছনে থেকে গিয়েছিল তুমি তাদের একজন নও?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান।
“জি হ্যাঁ, সম্মানিত আমীর।” অশ্বারোহী জবাবে বলে—“আমি তাদেরই একজন। আপনাকে এ কথা বলার জন্য তারা আমাকে পাঠিয়েছে যে, অনুগ্রহ করে আপনি যেন তাদের জন্য অপেক্ষা করেন। তারা এক্ষুণি এসে আপনার সাথে মিলিত হবে।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের থামতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই সকল আনসার এসে পড়ে। অতঃপর সমস্ত সৈন্য বাতাহ-এর উদ্দেশে রওয়ানা হয়।
লায়লা!” বাতাহে মালিক বিন নাবীরা নিজ স্ত্রীকে বলছে—“তুমি আমাকে ভালবাসা শিখিয়েছ। তোমার রূপ-সৌন্দর্য আর যাদুকরী চোখ আমার কাব্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। এখন আমাকে সাহস যোগাও লায়লা। আমার অন্তরে ক্রমে ভীতি জেঁকে বসছে।”
“আমি আপনাকে প্রথম দিনই বলেছিলাম অহংকার-গর্ব সম্পূর্ণ বর্জন করুন মালিক!” লায়লা বলে—“কিন্তু আপনি এত দূর এগিয়ে যান যে, মানুষকে পিঁপড়া জ্ঞান করে পায়ের নীচে ফেলে পিষে পিষে হত্যা করেন।”
“অতীতের পাপ স্মরণ করিয়ে দিও না লায়লা!” মালিক আহতস্বরে বলে—“পাপ আমার বীরত্বকে দংশন করছে।”
“আজ আবার কি হল যে, আপনি এত ভীত হয়ে পড়েছেন?” লায়লা ব্যথায় উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করে।
‘ব্যাপার জিজ্ঞাসা করছ লায়লা?” মালিক বলে—“ব্যাপার আর কিছু নয়; মৃত্যুর ভয় মাত্র। আমার অন্তর বলছে, আমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হতে চলেছি। আমার এবং তোমার সম্পর্ক শেষ হতে যাচ্ছে।…অনেক দূর-দূরান্ত পর্যন্ত আমি গোয়েন্দা ছড়িয়ে রেখেছি। আজ এক গোয়েন্দা এসেছে। সে বলছে, মুসলিম বাহিনী দ্রুতগতিতে এদিকে ছুটে আসছে। বাহিনীর এ গতি অব্যাহত থাকলে পরশু সন্ধ্যা নাগাদ তারা এখানে পৌঁছে যাবে নিশ্চিত।”
“এতে ভয়ের কি হল? প্রস্তুতি নাও”—লায়লা বলে—“গোত্রের লোকদের সমবেত কর।”
“কেউ আমার পাশে এসে দাঁড়াবে না”—মালিক ভয়মিশ্রিত কণ্ঠে বলে—“ওকী এবং সায্যাহ-এর সাথে মিলে আমি নিজ গোত্রের উপর দিয়ে যে রক্তস্রোত বইয়ে দিয়েছিলাম তা কেউ ক্ষমা করবে না। পরে তাদের সাথে আপোষ-নিষ্পত্তি করে নিলেও তাদের অন্তর ক্ষুব্ধ। আমার গোত্রের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসবে না।”
“তাহলে আগে চলে যান। মুসলমানদের সেনাপতিকে গিয়ে বলুন, আমি ইসলাম বর্জন করিনি”—লায়লা বলে—“হয়ত তিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন।”
“ক্ষমা করবেন না”—মালিক বলে—“ক্ষমা করতে পারেন না। তারা এমন অপরাধীকে ক্ষমা করে না।”
মালিক বিন নাবীরার উদ্বেগ ও আতংক ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতোমধ্যে খবর এসে পৌঁছে যে, খালিদ বাহিনী নিকটে এসে গেছে। সে তৎক্ষণাৎ গোত্রের সকলকে জমা হওয়ার নির্দেশ দেয়।
“বনু ইয়ারবু-এর সম্মানিত জনতা।” মালিক সমবেত জনতার উদ্দেশে বলে—“আমাদের থেকে যে বড় ভুল হয়ে গেছে তা হলো, আমরা একদা মদীনার শাসন মেনে নিয়েছিলাম এবং পরে আবার তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। তারা আমাদের সামনে নয়া ধর্মমত পেশ করলে আমরা তা মেনে নিয়ে পরে আবার অবাধ্য হয়ে যাই। তারা আসছে। সকলে নিজ নিজ ঘরে চলে যাও এবং ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখ। এতে প্রমাণ হবে যে, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করনি। তারা ডাকলে খালি হাতে সামনে এসে দাঁড়াবে। মোকাবিলায় অযথা প্রাণহানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত লাভ হবে না।…যাও, নিজ নিজ ঘরে যাও।”
