“কেমন ভয়?” মালিক ভ্রূ কুঁচকে জানতে চায়—“কার ভয়?”
“শাস্তির”—লায়লা বলে—“প্রতিশোধের।”
সায্যাহ একা হয়ে গেছে। তার অপর সহযোগী ওকীও তার সঙ্গ ছেড়ে দেয়। মালিক বিন নাবীরা ওকীকে বলেছিল, সে এক নারীর ফাঁদে পা দিয়ে নিজ গোত্রের উপর চড়াও হয়েছে। সায্যাহ নিজ বাহিনী নিয়ে নাবাযের দিকে চলে যায়। পূর্বে বলা হয়েছে যে, সে ইয়ামামায় আক্রমণ করতে গিয়েছিল। কিন্তু মুসাইলামার ফাঁদে পড়ে যায়। এক পর্যায়ে মুসাইলামা তাকে বিবাহ করে।
মালিক বিন নাবীরার পাপের শাস্তি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অন্যতম সহযোগী ওকী বিন মালিক তার সঙ্গ ছেড়ে মুসলমানদের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। মালিক তাকে বাধা দিতে চেষ্টা করে।
“আমরা দু’জনও যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি তবে মুসলমানরা আমাদের পদতলে পিষ্ট করে ছাড়বে”—মালিক ওকীকে বলে—“আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তাদের মোকাবিলা করতে পারব।”
“আমি জীবিত থাকতে চাই মালিক।” ওকী তার উত্তরে বলে—“মদীনা বাহিনীর সামনে আজ পর্যন্ত কেউ টিকতে পেরেছে কি? গাতফান পরাভূত। তাঈফ পরাজিত। বনু সালেম, বনু আসাদ, হাওয়াযিন কেউ মুসলমানদের মোকাবিলায় দাঁড়াতে পারেনি। অতঃপর সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং উম্মে জামাল সালমাকেও তাদের সাথে যুক্ত করেছে। কিন্তু তারপরেও টিকতে পারেনি। তোমার মনে নেই, কিভাবে ওলীদের পুত্র খালিদ তাদেরকে তাড়িয়ে ও ভাগিয়ে দিয়েছে? সালমাকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা মুসলমানের রক্ত ঝরিয়েছি। তারা এ রক্তের প্রতিশোধ নিবেই। আমাদের ক্ষমা করবে না। সমস্ত গোত্রকে পরাজিতকারী খালিদ মদীনায় ফিরে যায়নি। সে এখন বাযাখায়। অপরদিকে মুসলমানদের আরেক প্রখ্যাত সেনাপতি উসামাও আছে। তাদের মধ্য হতে যে কেউ যে কোন মুহুর্তে এদিকে আসতে পারে। তাদের রক্তপাতের ক্ষমা এবং আমাদের প্রায়শ্চিত্তের এখন একমাত্র পথ এটাই যে, আমরা পুনরায় তাদের আনুগত্য মেনে নিয়ে এখানকার বিভিন্ন গোত্র হতে যাকাত, ট্যাক্স ইত্যাদি পূর্বের মত নিয়মিত আদায় করে যাব।”
ওকী বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিলেও মালিক বিন নাবীরা তৎক্ষণাৎ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
হযরত খালিদ বিন অলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এরই মধ্যে অবগত হন যে, মালিক বিন নাবীরাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সে যাকাত, কর ইত্যাদি আদায় করে মদীনায় পাঠায়নি; বরং পুনরায় তা মালিককে ফিরিয়ে দিয়েছে। গোয়েন্দারা প্রমাণ স্বরূপ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মালিকের রচিত একটি পংক্তিও শুনায়। এ পংক্তিতে সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর নিজ গোত্রকে সম্বোধন করে বলেছিল, সবাই নিজ নিজ সম্পদ নিজেদের কাছে রাখ এবং এর জন্য কোন ভয়ের আশংকা করো না। ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ হতে আমাদের উপর কোন বিপদ নেমে এলে আমরা তা এই বলে মোকাবিলা করব যে, আমরা মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছিলাম; আবু বকরের নয়।
মালিক বিন নাবীরা সায্যাহ এর সাথে মিলে মুসলমানদের উপর যে ব্যাপক গণহত্যা চালায় তার খবরও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পেয়ে যান। তিনি নিজ বাহিনীকে দ্রুত বাতাহ-এর উদ্দেশে প্রেরণ করেন। তার এ বাহিনীতে মদীনার আনসারও ছিল। তারা বাতাহ-এর উদ্দেশে সৈন্য প্রেরণের বিরোধিতা করেন।
“আল্লাহর কসম!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমার সৈন্যদের মাঝে এই সর্বপ্রথম এমন লোক দেখলাম, যারা নিজ আমীর এবং সেনাপতির নির্দেশ অমান্য করছে।”
“এটাকে নির্দেশ লঙ্ঘন বলুন অথবা আর যাইকিছু বলুন”—আনসারদের প্রতিনিধিত্বকারী বলে—“খলিফার নির্দেশ ছিল তোলাইহাকে অনুগত করে সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাপনা পুনর্বহাল করা। কেউ যুদ্ধ করতে এগিয়ে এলে তার মোকাবিলা করা। অন্যথা বাযাখায় গিয়ে পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় থাকা। আমাদের জানা আছে, বাতাহ-এর উপর আক্রমণের কোন নির্দেশ মদীনার হাইকমান্ড থেকে আসেনি।”
“এটা কারো অজানা আছে কি, আমি তোমাদের আমীর এবং সিপাহসালার?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন এবং সকলের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকান। কোন সাড়াশব্দ না এলে পুনরায় তিনি বলেন—“আমার জানা নেই যে, খলীফার সাথে তোমরা কি চুক্তি করে এসেছ। আমি শুধু জানি যে, খলীফা আমাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, যেখানেই ধর্মান্তরিতের খবর পাও এবং যেখানেই মদীনার সাথে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করা হয় সেখানে যাবে এবং ইসলামকে সুসংহত ও সমুন্নত করবে। আমি সেনাপতি। দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যদি আমাকে এমন কোন পদক্ষেপও নিতে হয় যার ব্যাপারে খলীফার পক্ষ হতে কোন নির্দেশ নেই তথাপিও তা আমি অবশ্যই করব।…খেলাফতের পক্ষ হতে আদেশ-নিষেধ আমার বরাবর আসে, তোমাদের নিকটে নয়।”
“আমরা কোন দূত আসতে দেখিনি”—জনৈক আনসার বলে।
“এর জবাব দেয়া আমি জরুরী মনে করি না”—হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগতস্বরে বলেন—“আর আমি এমন কাউকে আমার বাহিনীতে দেখতে চাই না যার অন্তরে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ আছে। আমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির ভিখারী। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্রাত্মার সন্তুষ্টি চাই আমি। ব্যক্তিগত সন্তোষের উদ্দেশ্য কারো থাকলে সে চলে যেতে পারে। নিজেকে যথেচ্ছা পরিতুষ্ট কর। আমার অসংখ্য মুহাজির সৈন্য রয়েছে। এ ছাড়া যে সমস্ত নব মুসলিম আমার সাথে আছে তাদেরকেও আমি পর্যাপ্ত মনে করি।”
