সূর্য আরেকটু উপরে উঠলে নিস্তব্ধ বাতাহ হঠাৎ সরব হয়ে ওঠে। চারদিকে ছুটোছুটি আর হুলস্থুল পড়ে যায়। মায়েরা শিশুদের নিয়ে অন্তঃপুরে চলে যায়। দরজার খিল এঁটে দেয়। যুবতী কন্যার সম্ভ্রম রক্ষায় অনেককে বসতি ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে দেখা যায়। আত্মগোপনই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এলাকার বৃদ্ধরা কামান, তূণীর নিয়ে ছাদে ওঠে। যুবকরা বর্শা এবং তলোয়ার বের করে পজিশন নিয়ে দাঁড়ায়—এ সবের কারণ এই ছিল যে, কে যেন চিৎকার করে সতর্ক করে বলছে, শত্রুবাহিনী আসছে।
সকলের আতংকিত দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল দূরের গগন-পবনে। বহুদূরে ধূলোর মেঘমালা উড়তে দেখা যায়। ধূলোর এমন প্লাবন সৃষ্টি কেবল কোন সেনাবাহিনীর পক্ষেই সম্ভব। বাতাহ-এর যুবকের সংখ্যা ছিল কম। অধিকাংশই মালিক বিন নাবীরার সাথে অন্য গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। অল্প সংখ্যক যারা ছিল তারা চরম ভীতি এবং আতংকিত হয়ে পড়েছিল।
লায়লার শয়ন কক্ষের পালঙ্কে তখনও তিন শিশুর লাশ পড়েছিল। বাতাহ-এ হুলস্থুল পড়ে গেলে সেও নিজের শিশু-বাচ্চা বুকের সাথে চেপে ধরে কেল্লাসদৃশ ঘরের ছাদে এসে দাড়ায়। সে বারবার কোলের বাচ্চার দিকে তাকায় এবং চুমোয় চুমোয় সিক্ত করতে থাকে তার মুখমণ্ডল। সম্ভবত তার মাঝে এই আশংকার উদ্রেক হয় যে, আসন্ন শত্রুরা হয়ত প্রতিশোধ নিতে আসছে। আর তারা নিজেদের বাচ্চা হত্যার প্রতিশোধ তার বাচ্চাকে হত্যার মাধ্যমে নিবে।
ভূমি উৎক্ষিপ্ত ধূলো নিকটে এসে পড়ে। ধূলোর পর্দার ফাঁক দিয়ে ঘোড়া এবং উট আবছা আবছা দেখা যায়।
“সাবধান, বনূ ইয়ারবু হুঁশিয়ার।” অজ্ঞাত স্থান থেকে প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠ ভেসে আসে—“জীবন বাজি রাখবে। ভীত হবে না।”
আগন্তুক বাহিনী ধূলোর আস্তরণ থেকে বেরিয়ে আরো এগিয়ে আসে। এলাকার কিছু লোক ঘোড়ায় চড়ে হাতে বর্শা এবং তলোয়ার নিয়ে আগত সৈন্যদের উদ্দেশে এগিয়ে যায়। তাদের পরিণাম ছিল স্পষ্ট। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, তাদের প্রভাবে সশস্ত্র অবস্থায় এগিয়ে আসতে দেখে আগত সৈন্যদের বিন্যস্ত সারিতে কোনরূপ পরিবর্তনের আভাস দেখা যায় না। বরং তারা আরো এগিয়ে গিয়ে ঐ সৈন্যদের সাথে মিশে তাদেরই অংশ হয়ে যায়।
“আপনি!তারা শ্লোগান তোলে—“আপনি! মালিক বিন নাবীরা।…যুদ্ধ খেলা শেষ।”
অল্প সময়ের মধ্যে যখন সকলেই জানতে পারে যে, আগত সৈন্যরা কোন শত্রুবাহিনী নয়; বরং তাদেরই গোত্রের সৈন্যরা, যুদ্ধ ময়দান থেকে তারা ফিরে আসছে, তখন সর্বত্র খুশীর শ্লোগান ওঠে। চিৎকার এবং গলা ফাঁটিয়ে সবাই আনন্দ প্রকাশ করে। মৃত্যুপ্রায় বাতাহ নগরী দেহে প্রাণ ফিরে পায়। হৃদয়ের স্পন্দন পেয়েই সে জেগে ওঠে। মৃত্যুপুরী মুহূর্তে জনতার কল-কাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে। জনতা মুহুর্মুহু শ্লোগান আর বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে সৈন্যদের অভ্যর্থনা জানায়। রজনীগন্ধা আর গোলাপের তোড়া দিয়ে জনতা প্রিয়জনদের বরণ করে নেয়।
মালিক বিন নাবীরা অভ্যর্থনায় যোগ দেয় না। সে এসে কোথাও দাড়ায় না। সোজা নিজের বাড়িতে আসে। ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে অন্দরে চলে যায়। লায়লার দুর্বার আকর্ষণই তাকে কোথাও থামতে কিংবা অপেক্ষা করতে দেয় না। লায়লার মলিন মুখে গোলাপের হাসি না ফোটা পর্যন্ত তার হৃদয় শান্ত হয় না। যে কোন মূল্যে সে প্রাণপ্রিয়া লায়লার মুখের হাসি ধরে রাখতে চায়। তাইতো সে ঘর ছেড়ে এই পণ করে বেরিয়ে গিয়েছিল যে, লায়লার মনের ইচ্ছা পূরণ করেই তবে সে ঘরে ফিরবে। লায়লার ইচ্ছা বাস্তবেই সে অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করে। লুটতরাজের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে সৈন্যদের নিয়ে ফিরে আসে। ইচ্ছা পূরণ হওয়ায় লায়লা তাকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাবে, ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিবে। সবচে বড় কথা, লায়লার ম্লান মুখে হাসির ফোয়ারা ছুটবে—এমনি একগুচ্ছ আশা নিয়ে সে দৌড়ে অন্দর মহলে এগিয়ে যায়। কিন্তু না; অন্দরের অবস্থা ছিল বাইরের অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাইরে আনন্দের জোয়ার উঠলেও ভিতরে তখন ভাটা চলছিল। অন্দর মহল ছিল থমথমে, নির্বাক, নিষ্পন্দন। লায়লা আঙ্গিনার এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। তার আকর্ষণীয় চেহারায় পূর্বের সেই উদাসীনতার ছাঁপ তখনো বিদ্যমান ছিল। তার ঐ হরিণটানা আঁখি এবং কাজল তোলা চোখ বুজা বুজা ছিল, যার এক একটি পলকের ইশারায় গোত্রের শত শত যুবক জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিল।
“তোমার নির্দেশ আমি মান্য করেছি লায়লা!” মালিক বিন নাবীরা এক প্রকার দৌড়ে গিয়ে লায়লাকে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে করতে বলে—“লড়াই খতম করে দিয়েছি। আমরা শীঘ্রই বন্দী বিনিময় করব। সায্যাহ-এর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। এই ফুল দ্বারা চেহারার মলিনতা মুছে ফেল।”
মালিকের এহেন আবেগ লায়লার মাঝে কোন অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হয় না। তার দেহ যেন প্রাণহীন ছিল। মালিককে দেখে অন্য সময় তার শরীরে যে উষ্ণ শিহরণ বয়ে যেত তা এখন সৃষ্টি হয় না। মালিক তাকে স্বাভাবিক ও প্রাণচঞ্চল করতে অনেক চেষ্টা করে কিন্তু লায়লা পূর্ববৎ ম্রিয়মাণ ছিল। যেন ঝরে যাওয়া একটি ফুল।
“আসলে আমার অন্তরে একটি ভীতি গভীরভাবে বসে গেছে”—অনেকক্ষণ পর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উদাস কণ্ঠে লায়লা বলে।
