“তুমি আস্ত ডাইনী।”
তোর স্বামী নিরেট জল্লাদ।”
“সায্যাহ তোর স্বামীর প্রেমিকা।”
“সায্যাহ তোর সতীন।”
তোর ঘরে আমাদের ঘরের লুণ্ঠিত মাল আসছে।”
“মালিক বিন নাবীরা তোকে আমাদের বাচ্চার কাঁচা রক্ত পান করাচ্ছে।”
“আমাদের সমস্ত সন্তান কেটে টুকরো টুকরো করে নিক্ষেপ করলেও আমরা সায্যার নবুওয়াত মেনে নিব না।”
“আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মুহাম্মদ আল্লাহ্র রাসূল।”
মহিলাদের এহেন চিৎকারে অল্পক্ষণের মধ্যে সেখানে এলাকার অন্যান্য লোকও এসে জমা হয়। মহিলাদের সংখ্যাই ছিল বেশী। লায়লা লজ্জা-অনুতাপে তার সুন্দর চেহারা দু’হাতে ঢেকে ফেলে। তার শরীর হেলতে থাকে। দু’মহিলা তাকে ধরে ফেলে। কিন্তু সে নিজেকে মূর্ছা যেতে দেয় না। মাথা এদিক-ওদিক ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে সামলে নেয়। আস্তে আস্তে শোক সন্তপ্ত মহিলাদের দিকে অশ্রুস্নাত চোখে তাকায়।
“তোমাদের সন্তানদের রক্তের বদলা দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই”—লায়লা বলে—“আমার সন্তান নিয়ে যাও; তাকে কেটে টুকরো টুকরো কর।”
“আমরা হিংস্র নরখাদক নই”—একটি কলরব ওঠে—“আমরা ডাইনী নই। যুদ্ধ খেলা বন্ধ করাও। হত্যা-লুটতরাজ রোধ করাও। তোমার স্বামী ওকী এবং সায্যাহ-এর সাথে মিলে এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ চালাচ্ছে।”
“যুদ্ধ শীঘ্রই বন্ধ হয়ে যাবে”—লায়লা বলে—বাচ্চাদের লাশ ভিতরে আন।”
শোকাহত মায়েরা নিজ নিজ সন্তানের লাশ ভিতরে নিয়ে যায়। লায়লা লাশ তিনটি ঐ পালঙ্কে যত্নের সাথে শুইয়ে রাখে যেখানে সে আর মালিক বিন নাবীরা শয্যাযাপন করে। সে লাশগুলো এমনভাবে ঢেকে রাখে যে, বাইরে থেকে বুঝার কোন উপায়ই ছিল না যে, তিন তিনটি লাশ এখানে শায়িত।
মালিক বিন নাবীরা লায়লা বলতে পাগল ছিল। সে ছিল রীতিমত লায়লার পূজারী। লায়লার সৌন্দর্য তার উপর যাদুর মত আচ্ছন্ন রাখত। কিন্তু এটা এমন এক যুদ্ধ ছিল সেখানে লায়লাকে সাথে রাখা মালিকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এদিকে লায়লার দুর্বার আকর্ষণ তাকে লায়লা হতে বেশীক্ষণ দূরে থাকতে দেয় না। যুদ্ধ নিকটবর্তী কোথাও হলে সে রাতে লায়লার সান্নিধ্যে চলে আসত। ঘটনাক্রমে ঐ দিন রাতে মালিক ঘরে ফেরে। লায়লাকে দেখামাত্রই তার শরীরে শরাবের মত নেশার উদয় হয়।
“পালঙ্কে কেউ শায়িত?”—মালিক বিন নাবীরা জিজ্ঞাসা করে।
“না”, লায়লা জবাবে বলে—“আপনার জন্য একটি উপঢৌকন ঢেকে রেখেছি…তিনটি ফুল, কিন্তু তা ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে এই যা।”
মালিক ক্ষিপ্রগতিতে চাদর ধরে টান দেয় এবং এমন ভঙ্গিতে পিছে সরে আসে যেন পালঙ্কে বিষধর সাপ দংশনের জন্য কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে। সে পিছনে ফিরে লায়লার দিকে তাকায়।
‘রক্তপিপাসু হায়েনার জন্য এর চেয়ে উত্তম উপঢৌকন আর কিছু হতে পারে না”—লায়লা তীর্যক মন্তব্য করে এবং তাকে বিস্তারিতভাবে জানায় যে, নিহত শিশুদের মায়েরা কেমন সোকাহত হয়ে তার কাছে আসে এবং কি কি বলে গেছে। এরপর লায়লা তার দুগ্ধপায়ী বাচ্চা মালিকের সামনে পেশ করে বলে—“যান, নিয়ে যান। ঐ শিশুগুলো এবং নিজের এই শিশুর রক্ত পান করে কলিজা ঠাণ্ডা করুন। রক্তপিপাসা নিবারণ করুন।” লায়লা আরো বলে—“আপনি কি সেই মালিক বিন নাবীরা মানুষ যাকে সদাহাস্যময় বলে? এই কি আপনার বাহাদুরী এবং বীরত্বের পরিচয় যে, আপনি এক নারীর ফাঁদে পড়ে লুটতরাজ করে ফিরছেন? এতই বাহাদুর হলে মদীনায় গিয়ে আক্রমণ করুন। এখানকার দুর্বল ও সাদাসিদা মুসলমানদের উপর কেন হাত তুলছেন!
মালিক বিন নাবীরা সাধারণ লোক ছিলেন না। তার ব্যক্তিত্বের মাঝে এক ধরনের স্বতন্ত্র বিশেষত্ব ছিল যা অন্যদেরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত। তার জীবন অভিধানে ভর্ৎসনার কোন শব্দ লেখা ছিল না। বিদ্রূপ কোনদিন তার কানে পড়েনি। তার মাথা কোনদিন কোন কাজে অবনত হয়নি।
“এই কি আপনার গর্ব আর গৌরবের প্রতিফলন?” লায়লা তাকে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে—“এই নিষ্পাপ বাচ্চাদের লাশের উপর দাঁড়িয়ে গর্ব করবে?…জনৈক মহিলার কারণে…এক নারী আপনার গর্ব-অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আপনাকে খুনী এবং ডাকাতের কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
নিজের সন্তান আপনার কাছে রেখে আমি চলে যাচ্ছি। পিছন হতে আমার পিঠেও একটি তীর বসিয়ে দিও।”
“লায়লা!” মালিক বিন নাবীরা গর্জন ছোঁড়ে। কিন্তু শেষদিকে এসে তার কণ্ঠস্বর এমনিতেই নীচু হয়ে যায় এবং একজন অপরাধীর মত আওয়াজে বলে— “কোন নারীর জালে আমি ফেঁসে যাইনি।”
“মিথ্যা বলবেন না মালিক।” লায়লা বলে—“আমি চলে যাচ্ছি। সায্যাহকে এখানে নিয়ে আসুন…। তবে মনে রাখবেন, আপনার নেতৃত্ব, সৌন্দর্য, কাব্যচর্চা এবং অন্যায় রক্তপাত, এই নিহত বাচ্চাদের মাতাদের বুকফাটা আর্তনাদ এবং অভিযোগ থেকে বাঁচতে পারবে না।… এ তো মাত্র তিনটি লাশ। বসতির লুটতরাজ চালানোকালে না জানি কত শত বাচ্চা এভাবে আপনার ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হয়েছে। আপনি শাস্তি থেকে রেহাই পাবেন না। আপনার রক্তও একদিন বইবে এবং আমি অন্য কারো স্ত্রী হব।”
মালিক বিন নাবীরা কিঞ্চিৎ ঝুঁকে লায়লার দিকে তাকায়। যেন তার পিঠে কেউ খঞ্জর বসিয়ে দিয়েছে। সে আস্তে আস্তে পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে যায়।
মালিক রাতে ঘরে ফেরে না। সকালের সূর্য উঁকি দেয়। রক্তরাঙা রবি বাতাহ-এর সৌন্দর্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করত। প্রভাতের মায়াবী ঝলকে বাতাহ-এর চেহারা পাল্টে যেত। কিন্তু আজকের সূর্য যেন অন্যদিনের সূর্য নয়। নিষ্প্রভ, নিস্তেজ, ম্রিয়মাণ। সে আজ ঝলক নয়; মুঠোমুঠো বেদনা উপহার দেয়। ফ্যাকাশে-রক্তহীন দেখা যায় তার চেহারা। যে সূর্য প্রতিদিন বাতাহ-এর জন্য হাসির কাকলি আর রূপের বাহার বয়ে আনত আজ তার নিজের চেহারাই ছিল পাংশুবর্ণ এবং চোখে মৃত্যুর আতংক। সেখানকার প্রতিটি নারীর চেহারায় ছিল বেদনার ছাঁপ এবং চোখ ছিল অশ্রুসজল। এটা ছিল বনূ তামীমের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া লুটতরাজের ভয়াবহ টর্নেডোর ফল। সূর্যের যে কিরণের জন্য বাতাহবাসী প্রত্যহ অপেক্ষমাণ থাকত এবং সূর্যের কিরণও সকল বাধা ডিঙিয়ে বাতাহ-এর ঘরে ঘরে এসে হাজির হত আজ সে কিরণের জন্য কাউকে অপেক্ষমাণ দেখা যায় না এবং কিরণও কেমন যেন দুরুদুরু বুকে বাতাহ-এর অলিতে-গলিতে এসে প্রবেশ করে।
