খালিদ অনেক ভেবে-চিন্তেই তার বাহিনীকে এ প্রান্তভাগে নিয়ে এসেছিলেন। পিতার প্রশিক্ষণ এবং নিজ প্রজ্ঞার আলোকে তার পরিকল্পনা ছিল যে, পার্শ্বদেশ হতে হামলা করে তিনি মুসলমানদের পিছু হটতে বাধ্য করবেন। যদি তাদের দৃঢ়তায় ফাটল ধরানো যায় এবং বিক্ষিপ্ত করা যায় তবে সহজেই তারা কুরাইশ বাহিনীর অন্যের পদতলে পিষ্ট হতে থাকবে। কিন্তু তার সকল পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে যায় যখন এ অশ্বারোহী দল মুসলিম বাহিনীর অদূরে থাকতেই মাথার উপর দিয়ে তীরের ঝাঁক উড়ে এসে প্রথম অশ্বারোহীকে চালনী করে ফেলে। এক একজন অশ্বারোহী কয়েকটি তীরের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। যে সমস্ত অশ্ব তীরের আঘাতে আহত হয় সেগুলো খালিদ বাহিনীর মাঝে কেয়ামতের বিভীষিকা সৃষ্টি করে চলে। ফলে পিছনের আরোহীরা অশ্ব ঘুরিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এদিকে কুরাইশ গায়িকারা মিউজিক বাজিয়ে আবার ঐ গান সম্মিলিত কণ্ঠে গাইতে থাকে, যা ইতোপূর্বে হিন্দা একাই গেয়েছিল।– “আব্দুদ্দারের সূর্য সন্তানেরা। আমরা রাতের আঁধারের সঙ্গিনী। আমরা চার দেয়ালের মাঝে জাদু দেখাই..।”
ঐতিহাসিক ওয়াকিদী লিখেন, তৎকালীন আরবের যুদ্ধ-রীতি অনুযায়ী এবার মল্লযুদ্ধের পালা আসে। কুরাইশ বাহিনীর পতাকাবাহী তালহা বিন আবু তালহা সর্বপ্রথম ময়দানে এসে মুজাহিদ বাহিনীর প্রতি হুঙ্কার ছুড়ে আহবান করে।
“প্রস্তুত হ দ্বীনের দুশমন!” দমকা হাওয়ার ন্যায় উড়ে এসে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে– আমি তোর মোকাবিলায় প্রস্তুত।
তালহা এক হাতে পতাকা আঁকড়ে ধরেছিল। অপর হাতে তলোয়ার মাথার উপর ঘুরাতে ঘুরাতে সুযোগমত প্রচণ্ড বেগে হামলা করে। কিন্তু আঘাত শূন্যে মিলিয়ে যায়। সাথে সাথে নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণও তার শিথিল হয়ে পড়ে। দ্রুত সে নিজেকে সামলে নিতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু তাকে সামলানোর সুযোগ না দিয়ে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তরবারি এমন প্রচণ্ড বেগে আঘাত হানে যে, প্রথমে তার পতাকা ছিটকে পড়ে, অতঃপর সে নিজেও কপোকাত হয়। পতাকা পড়ে যেতেই কুরাইশ বাহিনীর এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে পতাকা তুলে নিয়ে যায়। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যক্তিকেও ইচ্ছা করলে ধরাশায়ী করতে পারতেন কিন্তু এটা মল্লযুদ্ধের নীতি নয় বিধায় তাকে নিরাপদে চলে যাবার সুযোগ দেন।
তালহাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারই গোত্রের আরেক ব্যক্তি ময়দানে আসে।
“আমি প্রতিশোধ নিতে ওয়াদাবদ্ধ।” সে হুঙ্কার ছাড়তে ছাড়তে আসে– “আলী! সম্মুখে আস। আমার তলোয়ারের ধার দেখ।”
হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু নীরবে তার মুকাবিলা করতে প্রস্তুত হয়ে আছেন। উভয়ে পরস্পরের প্রতি চোখ রেখে ময়দানে ঘুরতে থাকে। অতঃপর তরবারি আর ঢালে ঢালে ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়। আঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ঢাল-তলোয়ারের তামাশা চলতে থাকে। শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। সকলের বিস্ফোরিত নেত্র নিবদ্ধ মপ্লযোদ্ধাদ্বয়ের প্রতি। ফলাফল হতে বেশী সময় লাগেনি। এক সময় সবাই দেখল যে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তলোয়ার রক্তে রাঙা। টপটপ করে তার তলোয়ার হতে রক্ত ঝরছে। আর তাঁর প্রতিপক্ষ মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করছে।
এরপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে পালাক্রমে এক একজন করে আসতে থাকে আর মুজাহিদদের হাতে মারা যেতে থাকে।
কুরাইশদের সেনা কমান্ডার আবু সুফিয়ান তার পক্ষের বীরদের এভাবে কলাগাছের ন্যায় আছড়ে পড়তে দেখে রাগে ক্ষোভে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। সমর-রীতি অনুযায়ী মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ তার জন্য ছিল সম্পূর্ণ আত্মঘাতমূলক সিদ্ধান্ত। কারণ সে কমান্ডার। সে নিহত হলে সৈন্যদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা আর ভীতি ছড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। তারপরেও সে নিজের উপর নিজকে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেনি। এতক্ষণ সে ঘোড়ায় বসে যুদ্ধের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছিল। আচমকা সবাইকে হতবাক করে অশ্বে পদাঘাত করে তর্জন গর্জন করতে করতে নিজেই মল্লযোদ্ধারূপে ময়দানে চলে আসে।
তার স্ত্রী হিন্দা তাকে যেতে দেখে উষ্ট্রে আরোহণ করে সম্মুখে আসে এবং কণ্ঠে আবার ঐ গানের সুর ঝংকার তুলে, যার একটি কলি ছিল,“তোমরা কাপুরুষ হয়ে প্রত্যাবর্তন করলে আমাদের শরীরের প্রাণও পাবে না।”
আবু সুফিয়ান অশ্বপৃষ্ঠে আর প্রতিপক্ষ মুসলমান পদাতিক। ইতিহাসে তিনি হানজালা বিন আবু আমর নামে খ্যাত। আবু সুফিয়ানের হাতে দীর্ঘ বর্শা। অশ্বারোহীর বর্শার আঘাত থেকে পদাতিক তলোয়ারধারী বেঁচে যাবে এ ধারণা কারোর ছিল না। আবু সুফিয়ানের ঘোড়া হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু কে লক্ষ্য করে তীর গতিতে ছুটে আসে। এই ছুটন্ত অবস্থায় আবু সুফিয়ান বর্শা উঁচু করে লক্ষ্যপানে নিক্ষেপ করে। কিন্তু হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত সুন্দর করে তার মোকাবিলা করেন। তিনি একদিকে সরে গিয়ে আঘাত ব্যর্থ করে দেন। এভাবে উপর্যুপরি তিনবার আক্রমণ ও তার ব্যর্থতার পালা চলে। তৃতীয়বার আবু সুফিয়ানের অশ্বটি সম্মুখে এগিয়ে গেলে হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিছু ধাওয়া করেন। ঘোড়া কিছুদূর গিয়ে যখন আবার পেছনে মোড় নেয় হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহুও ঠিক ঐ মুহূর্তে সেখানে গিয়ে হাজির হন। আবু সুফিয়ান ঘোড়ার একদম কাছে তাঁর অবস্থান টের পায়নি। ইতোমধ্যে হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ার সামনের পা লক্ষ্য করে সজোরে আঘাত করলে ঘোড়া সঙ্গে সঙ্গে ভূপাতিত হয় আর আবু সুফিয়ানও অন্য দিকে ছিটকে পরে। পতিত আবু সুফিয়ানের উপর হযরত হানজালা রাযিয়াল্লাহু আনহু আক্রমণোদ্যত হলে আবু সুফিয়ান ঘোড়াকে ঢাল বানিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে দ্রুত চক্কর কেটে আত্মরক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। সে এভাবে নিজেকে বিপদের মুখে দেখে সাহায্যের জন্য কুরাইশদেরকে আহবান করতে থাকে।
