যাকাত ও অন্যান্য কর আদায়ের প্রশ্নে বনূ তামীম প্রকাশ্যভাবে তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। (১) যাকাতসহ অন্যান্য কর রীতিমত আদায়ে আগ্রহী। (২) মদীনার সাথে সকল প্রকার যোগাযোগ ও সম্পর্ক ছিন্ন করতে ইচ্ছুক। (৩) কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও সিদ্ধান্তহীনতার শিকার।
তাদের পারস্পরিক মতভেদ ও ঘরোয়া বিবাদ ভীষণ গৃহযুদ্ধের আকার ধারণ করে। এমনি এক টানটান উত্তেজনাকর মুহূর্তে সায্যাহ স্ব-সৈন্যে এসে উপস্থিত হয়। সায্যাহ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, সে নবুওয়াত দাবী করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এক বিরাট সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। সায্যাহ মদীনার বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয় ও সৈন্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মালিক বিন নাবীরার গোত্র বনূ ইয়ারবু অধ্যুষিত এলাকায় স্ব-সৈন্যে এসে ছাউনি ফেলে। সায্যাহ গোত্র প্রধান মালিক বিন নাবীরাকে ডেকে তার আগমনের উদ্দেশ্য জানিয়ে দেয় যে, সে মদীনা আক্রমণ করতে ইচ্ছুক।
“আমার সৈন্যদের সাথে আপনার গোত্রের সামরিক বাহিনী যুক্ত করে দিলে সম্মিলিতভাবে আমরা মুসলমানদেরকে চিরতরে উৎখাত করতে পারব”—সায্যাহ অভিমত ব্যক্ত করে—“বনূ ইয়ারবুর সাথে আমার সম্পর্কের কথাও আপনার অজানা নয়।”
“খোদার কসম!” মালিক বিন নাবীরা গদগদ কণ্ঠে বলে—“আমি আপনাকে পূর্ণ সমর্থন এবং সার্বিক সহায়তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার একটি পূর্বশর্ত আছে। আসলে এটি কোন শর্ত নয়; বরং আমাদেরই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি জরুরী বিষয়।…আপনি হয়ত ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছেন যে, বনূ তামীমের বিভিন্ন গোত্রে শত্রুতাভাব সৃষ্টি হয়েছে। তাদেরকে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়ে একটি ঐক্যফ্রন্ট তৈরী করতে হবে। অতঃপর সম্মিলিত শক্তি নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে হবে। যদি তারা আমাদের সমঝোতা প্রস্তাবে সাড়া না দেয় তবে তাদেরকে উচ্ছেদ ও নিশ্চিহ্ন করতে হবে। কারণ তাদের হত্যা না করলে তারা এখানেই আমাদের বিরোধী হয়ে উঠবে। তাদের মাঝে মদীনার প্রতি অনুগত আছে অনেকে। তারা খাঁটি মুসলমান। আন্তরিক ও সত্যিকার অর্থেই তারা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার উপর যে কোন মূল্যে তারা টিকে থাকবে। ফলে তাদেরকে জীবিত রেখে আমাদের সামনে অগ্রসর হওয়া আত্মহত্যারই শামিল হবে।”
মদীনা পরাস্ত হল কিনা—এটা মালিকের উদ্দেশ্য ছিল না; তার লক্ষ্য ছিল মদীনাকে ইস্যু করে সায্যাহ বাহিনী দ্বারা বনূ তামীমের মুসলমান এবং অপর বিরুদ্ধবাদীদের সমূলে বিনাশ করে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিরঙ্কুশ নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। ঐতিহাসিকরা লেখেন, সায্যাহ মালিক বিন নাবীরার পুরুষ সুলভ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ ও তার বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্বে দারুণ প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে মালিকের প্রস্তাব তৎক্ষণাৎ সমর্থন করে। নিজেদের স্বাক্ষর সম্বলিত সন্ধিপত্র সকল গোত্র প্রধান বরাবর তারা প্রেরণ করে। মদীনা হামলাকে সামনে রেখেই যে এ সন্ধি প্রস্তাব তা বড় হরফে উল্লেখ করে দেয়া হয়।
মাত্র এক গোত্র প্রধান—ওকী ইবনে মালিক—এ সন্ধি প্রস্তাবে সাড়া দেয়। অন্যরা তাদের সাথে সমঝোতায় আসতে অস্বীকার করে। ফলে সায্যাহ; মালিক এবং ওকী-এর সম্মিলিত বাহিনী অন্যান্য গোত্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হয়। দানশীলতা, আতিথেয়তা এবং সুরসিক গোত্র হিসেবে প্রসিদ্ধ বনূ তামীম পরস্পরের মোকাবিলায় বন্য, হিংস্র ও ভয়ঙ্কর রক্তখেকো দানবে পরিণত হয়। যুদ্ধের দাবানলে বসতি উজাড় হয়ে যায়। খুনের দরিয়া সৃষ্টি হয়। লাশভূমিতে পরিণত হয় মরুভূমি।
লায়লা সদর দরজায় মহিলাদের আহাজারি এবং কাতরধ্বনি শুনতে পায়। সে ঘরের কাজ ফেলে দৌড়ে ছুটে আসে। দুরু দুরু বুক, উৎকীর্ণ কান, পাংশুবর্ণ মুখ, বিস্ফোরিত চোখ আর উদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে সে কম্পিত হাতে গেট খুলে। সেখানে কিছু মহিলা শোকাহত হয়ে করুণ সুরে কাঁদছিল।
“তবে কি আমি বিধবা হয়ে গেলাম।” লায়লা উদ্বেগের সাথে জানতে চায়— “তোমরা মালিক বিন নাবীরার লাশ আননি তো?”
লায়লাকে দেখে মহিলাদের কান্নার আওয়াজ আরো বেড়ে যায়। তারা চিৎকার করে করে বুক চাপড়িয়ে কাঁদতে থাকে। তিন মহিলার কোলে কচি শিশুর লাশ ছিল। শিশুদের লাশ যে কাপড়ে ঢাকা ছিল তাও রক্তরাঙা ছিল।
লায়লা! তুমি নারী নও?” এক মহিলা কোলের রক্তস্নাত লাশ লায়লার সামনে এগিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে—“তুমি নারী হলে স্বামীর হাত এঁটে ধরতে। যেন তার হাত কোন শিশুর রক্তে রঞ্জিত না হয়।”
“এই দেখ”—আরেক মহিলা কোলে ধরা শিশুর লাশ লায়লার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে।
“আরও দেখ” আরেকটি বাচ্চার লাশ লায়লার সামনে এনে রাখা হয়।
“আমার এই সন্তানের দিকে তাকাও”—আরেক মহিলা তার দুটি সন্তান লায়লার সামনে দাঁড় করিয়ে বলে—“এরা চিরদিনের জন্য এতিম হয়ে গেছে।”
লায়লা কিংবাক ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু ফ্যাল ফ্যাল নজরে চেয়ে থাকে। তার মুখ হয়ে যায় মূক। নৃশংস এ দৃশ্য দেখার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। চোখের সামনে এভাবে একাধিক শিশুর লাশ দেখে তার মাথা ঘুরে ওঠে। ওদিকে লায়লাকে নিরব-নিস্তব্ধ দেখে মহিলারা আরো ক্ষেপে যায়। তারা চতুর্দিক দিয়ে লায়লাকে ঘিরে নেয় এবং ক্রুদ্ধ সিংহীর মত গর্জন করে বলতে থাকে।
