চোখ তুলে কেউ একজন তাকে দেখে না, সে ছিল একমাত্র মালিক বিন নাবীরা। একবার এমন ঘটনা ঘটেছে যে, সে মালিকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করে গেছে। কিন্তু মালিক চোখ তুলে তাকে দেখেনি আর লায়লাও মালিকের দিকে তাকায়নি।
একদিনের ঘটনা। লায়লা তার উটনীকে পানি পান করিয়ে আনছিল পথিমধ্যে এক মহিলার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। মহিলাটি লায়লার পূর্ব পরিচিত মালিক বিন নাবীরার একান্ত পরিচারিকা। সে লায়লার গতিরোধ করে দাঁড়ায়।
“লায়লা!” পরিচারিকা তাকে বলে—“নিঃসন্দেহে তুমি আরো গর্ব করতে পার। এমন কোন লোক আছে যে তোমার পায়ের নখ পর্যন্ত চুমো দিতে প্রস্তুত নয়?”
“তোমার মনিব কি তোমাকে কোন কবিতা মুখস্থ করে প্রেরণ করেনি?” লায়লা মুচকি হেসে বলে—“মালিক বিন নাবীরা কবি না? আমার ধারণা সত্য নয় কি যে, তোমার মনিব তোমাকে আমার জন্য কোন পয়গাম দিয়ে পাঠিয়েছে। আমি পুরুষের চোখের ভাষায় তার হৃদয়ের কথা পড়ে নিতে পারি।”
“খোদার কসম!” মধ্যবয়সী পরিচারিকা বিস্মিত হয়ে বলে—“তুমি অল্প বয়সেই বিচক্ষণ হয়ে গেছ। জ্ঞানীর মত কথা বলছ। যদি তুমি বাস্তবেই আমার চোখে আমার মনিবের পয়গাম দেখতে পেয়ে থাক, তবে বল তোমার জবাব কি? সে তোমার জন্য উন্মুখ ও পাগলপারা।”
“অত্র এলাকায় এমন কোন পুরুষের নাম বলতে পার, যে আমার জন্য ব্যাকুল নয়?” লায়লা গম্ভীর কণ্ঠে বলে।
“কিন্তু আমার মনিবের ব্যাপারটি একটু ভিন্ন”—পরিচারিকা বলে।
“পার্থক্য বলতে যেটা আছে তা হলো সে অন্যদের মত আমার দিকে তাকায় না”—লায়লা বলে—“আর আমার জানা আছে, সে কেন তাকায় না। সে চায়, আমি তার দিকে তাকাই। সে নেতা বলে নিজেকে খুব সুদর্শন মনে করে। তাকে বলে দিও, আপনার আশা কোনদিন সফল হবে না। লায়লা, আপনার দিকে কখনও তাকাবে না।”
“এমন জবাবে তিনি নিরাশ হবেন না।”—পরিচারিকা বলে—“এটা কি তোমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার নয় যে, মালিক বিন নাবীরার মত লোক তোমার পাণিপ্রার্থী? তিনি তোমার পদতলে স্বর্ণের স্তুপ জমা করে দিবেন?”
“তাকে বলো, স্বর্ণ নয়; আমার পায়ে এসে মাথা রাখতে”—লায়লা বলে—“কিসের বলে সে এভাবে পয়গাম পাঠাতে সাহস করল তুমি জান?…কারণ সে সর্দার। আমার পিতা তার মোকাবিলায় কিছুই নয়। সে এভাবে প্রস্তাব দিয়ে আমাকে অপমান করেছে।”
“তবে তুমি অন্য কাউকে ভালবাস?” পরিচারিকা জিজ্ঞাসা করে।
লায়লা জোরে হেসে ওঠে। মুখে কিছু বলে না।
“তাহলে তাকে আমি কি জানাব?” পরিচারিকা নিরুত্তাপ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে।
“যা কিছু বলার তা আমি বলেছি”—লায়লা বলে—“সাথে এটুকুও তাকে বলবে যে, আমি এক রাতের জ্বলন্ত মশাল নই। আমি কেবল তার হব, যে সারাজীবন আমাকে তার প্রদীপ হিসেবে রাখবে।”
মালিক বিন নাবীরার কানে লায়লার এহেন তীর্যক জবাব গেলে তার এতদিনের দম্ভ-অহংকার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
“মনিব!” পরিচারিকা তার অস্থিরতা দেখে সান্ত্বনার সুরে বলে—“লায়লা আর এত কি?…একটি সাধারণ মেয়ে মাত্র। শাহজাদী নয়। তার বিবাহের সিদ্ধান্ত তার পিতা নিবে। তার পিতাকে বলুন…।”
“আমি দেহ নয়, লায়লার মন চাই”—মালিক বিন নাবীরা বলে।
আরেক দিন মালিক নিজেই লায়লার কাছে গিয়ে তার প্রেম ভিক্ষা চায়।
“আমি আপনাকে হুমকি কিংবা অপমান করিনি”—লায়লা তাকে জানায়—“আমি শুধু একথা বলতে বা বুঝাতে চেয়েছি যে, আমি ঐ ফুল নই যা এক রাতের জন্য ফুটে পরের দিন ম্রিয়মাণ হয়ে ঝরে পড়ে।”
আগেই লায়লা মালিকের দম্ভ-চূঁড়ায় আঘাত হেনেছিল। এবার সে অহমিকার চূঁড়া লায়লার পদাঘাতে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে। লায়লা তার আত্মগৌরব দু’পায়ে দলে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। অতঃপর এক সময় তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বনূ তামীম লায়লাকে ‘উম্মে তামীম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
॥ বার ॥
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের খবর পেয়েই মালিক বিন নাবীরা মদীনা হতে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। সে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, সে পরিস্থিতির চাপে ইসলামের স্বীকৃতি দিয়েছিল মাত্র; ঈমান আনয়ন করেনি। এলাকা হতে যাকাত, কর, ট্যাক্স, উশর ইত্যাদি আদায় করে সে নিজগৃহে জমা করে রেখেছিল। কয়েকদিনের মধ্যেই তা কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সে তা মদীনায় না পাঠিয়ে এলাকার লোকজন জমা করে সংগৃহীত অর্থ-সম্পদ নিজ নিজ মালিককে ফিরিয়ে দেয়। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করারও স্পষ্ট ঘোষণা দেয়।
“এখন থেকে তোমরা স্বাধীন”—মালিক সমবেত জনতাকে বলে—“আমি মদীনার গোলামীর জিঞ্জির গলা থেকে নামিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলেছি। এখন যা কিছু উপার্জন করবে সব নিজেরাই ভোগ করবে। কোন কর দেয়া লাগবে না।”
সমবেত জনতা মাল-সম্পদ ফিরে পেয়ে এবং ভবিষ্যতে তাদের ট্যাক্স মওকুফের আনন্দে তারা গগনবিদারী শ্লোগান তোলে।
মদীনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে পুনরায় গোত্রের স্বাধীন অধিপতি হওয়ায় মালিক বেজায় খুশী। কিন্তু এ খুশী বেশীদিন স্থায়ী হয় না। পার্শ্ববর্তী দু’তিন গোত্রের নেতারা মালিককে জানিয়ে দেয় যে, সে মদীনার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কাজটি মোটেও ঠিক করেনি। মালিক তাদের কথায় কান না দিয়ে বরং উল্টো তাদেরকে নিজের সমমনা ও মদীনা বিরোধী করতে জোর প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তার ভাষার যাদু এখানে চরম মার খায়। তাদেরকে সে কিছুতেই নিজ দলে ভিড়াতে পারে না। তারা তাকে নৈতিক সমর্থন জানাতে মোটেও রাজি হয় না।
