১৪ শতাব্দী পূর্বে বাস্তবেই এ গ্রামে একটি শহর ছিল। শহরের নাম ছিল বাতাহ। নামসহ শহরটি আজও আছে। তবে শহরের সীমানা ছোট এবং সংকীর্ণ হতে হতে তা এক সময় গ্রামে পরিণত হয়। শহরের বাসিন্দারা সুদর্শন, বীর এবং নির্ভীক ছিল। কথা বলত কবিতার ছন্দে। মহিলারা অত্যন্ত রূপবতী এবং পুরুষেরা কমনীয় ছিল। এটি ছিল একটি শক্তিশালী গোত্র। বনূ তামীম নামে তারা পরিচিত ছিল।
বনূ ইয়ারবূও একটি গোত্র ছিল। কিন্তু স্বতন্ত্র কোন গোত্র না বরং বনূ তামীমেরই এক বৃহদাংশ। এ গোত্রের সর্দার মালিক বিন নাবীরা। বনূ তামীমের সকলের মাজহাব এক ছিল না। বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদে বিশ্বাসী ছিল তারা। কতক আগুন পূজা আর কতক কবর পূজারী ছিল। তবে অধিকাংশই ছিল মূর্তিপূজক। অনেকে আবার খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিল। দানশীল, অতিথিপরায়ণ এবং বীর হিসেবে এ গোত্রের প্রচুর সুনাম ছিল। যে সমস্ত গোত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের পয়গাম পাঠান তাদের মধ্যে বনূ তামীম ছিল উল্লেখযোগ্য। ইসলামের সুসংগঠিত ও তার বহুল প্রচার-প্রসারের স্বার্থে বনূ তামীমের মত শক্তিধর ও প্রভাবশালী গোত্রকে ইসলামের আওতাধীন করা অতীব জরুরী ছিল।
বনূ তামীমের ইসলাম গ্রহণের পটভূমি যেমনি ঘটনানির্ভর তেমনি চমকপ্রদ। এখানে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, দীর্ঘ মেহনতের পর বনূ তামীমের অধিকাংশই ইসলামের ছায়ায় চলে আসে। মালিক বিন নাবীরা ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিল। এত সহজে নিজের ধর্মমত পরিহারের পাত্র সে ছিল না। কিন্তু বনূ তামীমের অধিকাংশ লোক মুসলমান হয়ে যাওয়ায় সে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্ব ধরে রাখতে ইসলাম গ্রহণ করে। বড় প্রভাবশালী ও বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হওয়ায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বাতাহের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এলাকার যাকাত, উশরসহ অন্যান্য কর, ভ্যাট ইত্যাদি আদায় করে মদীনায় প্রেরণ করা ছিল তার অন্যতম দায়িত্ব।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বালাজুরি এবং মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকাল লেখেন, মালিক বিন নাবীরা বড়ই সুদর্শন ও ঈর্ষণীয় চেহারার অধিকারী ছিল। গঠনশৈলী অপর্ব আকর্ষণীয়। মাথার চুল লম্বা, নয়নাভিরাম। দুর্ধর্ষ যোদ্ধারাও তার কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হত। তিনি ছিলেন স্বনামধন্য কবি, সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর ও হৃদয়স্পর্শী সুরের অধিকারী। তার সবচেয়ে বড় গুণ এই ছিল যে, সদা হাস্যোজ্জ্বল ও সপ্রতিভ থাকত। হৃদয়কাড়া স্মিত হাসি ছিল তার অপূর্ব। চরম শোকাহতকেও সে মুহুর্তে হাসাতে পারত। দোষ বলতে যা তার মধ্যে ছিল তা হলো, চরম আত্মগৌরব ও অহংকার বোধ। নিজ গোত্রসহ পুরো বনূ তামীমে তার বিরাট মর্যাদা আর ব্যক্তিত্বই ছিল এর একটি কারণ। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ছিল, ব্যতিক্রমধর্মী পুরুষসুলভ সৌন্দর্য ও অন্যান্য গুণাবলী। এ গুলোর যাদুই অন্যদের গভীর প্রভাবিত ও মোহিত করত।
অসংখ্য নারীর সাথে ছিল তার প্রগাঢ় সম্পর্ক। যুবতী নারীরা তার সান্নিধ্য ও একটু ছোঁয়া পেতে ব্যাকুল ও আকুলি-বিকুলি করত। বড়ই ধূর্ত ছিল সে। নারীদের কাছে টানত কিন্তু বিবাহের বন্ধনে কাউকে জড়াত না। সাময়িক সম্পর্কে তাদের মন ভরাত। সে তাদের এই বলে আশ্বস্ত করত যে, সাময়িক সম্পর্কতেই তারা বিরাট মর্যাদার অধিকারিণী হয়ে যাবে। গোত্রের এমন কোন নারী ছিল না, যার অন্তরে তার ভালবাসা ও কামনা ছিল না। যে কোন নারী-হৃদয় সে অনায়াসে জয় করে নিতে পারত। আধা পলক চাহনী আর এক ফালি হাসিই ছিল এর জন্য যথেষ্ট।
বনূ তামীমের জনৈক ব্যক্তির নাম আল-মিনহাল। মানুষের কাছে সে নামেমাত্র পরিচিত ছিল। সামাজিক মর্যাদা বা প্রতিপত্তি বলতে তার কিছুই ছিল না। তার এক কন্যা ষোল বছরে পদার্পণ করে। স্বাস্থ্য নিটোল ও ভরাট। সারা অঙ্গে সৌন্দর্যের বাহার। পরিপূর্ণ তরুণী। নাম লায়লা। যুবতী এ কন্যার বদৌলতে আল-মিনহাল জিরো থেকে হিরো বনে যায়। সমাজে আল-মিনহালের কদর ও মর্যাদা বেড়ে যায়। মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তার কথা স্মরণ করতে থাকে। যৌবনের চৌহদ্দী না পেরোতেই লায়লার সৌন্দর্য অঙ্গ থেকে ঝরে পড়তে থাকে। মানুষ চলা থামিয়ে চোখ কপালে তুলে অবাক বিস্ময়ে তার রূপের ঝলক দেখতে থাকে। নিকট থেকে এক পলক দেখার জন্য উৎসুক জনতা অধীর হয়ে রাস্তায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে থাকে। সৃষ্টি হয় যানজট। সেই সাথে জনজট। দূর-দূরান্ত হতে লোক এসে সমবেত হয় লায়লার বাড়ির আঙ্গিনায় ও আশে পাশের রাস্তায়। উদ্দেশ্য, লায়লার উপচে পড়া সৌন্দর্য ও রূপ এক নজর দেখে চোখের তৃষ্ণা নিবারণ করা।
জনাব ইস্পাহানী বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও তৎযুগের প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপির বরাত দিয়ে লেখেন, আল্লাহ্তা’আলা লায়লাকে অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছিলেন। তার হরিণ-আখি এত আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী ছিল যে, কারো প্রতি চাইলেই সে বিমোহিত হয়ে যেত। হাঁটুর নিচের অংশ খোলা থাকত এমন পোশাক সে পরত। ঐতিহাসিকগণ বলেন, তার পায়ের নলায় অস্বাভাবিক আকর্ষণ ছিল। তার বাহুও ছিল চমৎকার। সুঢৌল গোল এবং দীর্ঘ লম্বা। কেশদান উড়িয়ে রাখত। স্বর্ণালী চুল এবং তার উজ্জ্বল চমকে যাদু জড়িয়ে ছিল।
