বাঁদী হিসেবে না রেখে বরং আযাদ করে দেয়ার কারণে সালমা মুসলমানদের প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে সে মাতৃহত্যার প্রতিশোধ স্পৃহা মনের গহীনে লালন করতে থাকে এবং এ উদ্দেশ্যে যুদ্ধবিদ্যা অর্জন করতে মনোনিবেশ করে। সর্দার গোত্রের হওয়ায় অতি অল্প সময়ে সে সমর জ্ঞানে পারদর্শী হয়ে ওঠে। নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতাও সে লাভ করে। সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী তৈরী করে মদীনা আক্রমণের জন্য ফুঁসতে থাকে। কিন্তু ইতোমধ্যে মুসলিম বাহিনী এক বিরাট সমরশক্তিতে পরিণত হওয়ায় সালমা মদীনার কাছে ঘেঁষতে সাহস পায় না। দূর থেকে লম্ফ-ঝম্ফ দিতে থাকে মাত্র।
তুলাইহা আর উয়াইনা পরাজিত হলে সালমা দৃশ্যপটে হাজির হয়। তার মাতা উয়াইনার চাচাত বোন ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে যে সকল গোত্রের সংঘর্ষ হয় তাদের চড়া মূল্য দিতে হয়। হতাহত হয় প্রচুর। যারা কোন রকমে প্রাণে বেঁচে যায় তারা বিক্ষিপ্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। গাতফান, তাঈফ, বনূ সালীম এবং হাওয়াযিন গোত্রের অনেকে সালমার কাছে সমবেত হয়। তারা প্রস্তাব করে, সালমা তাদের সঙ্গ দিলে তারা মুসলমানদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে জীবন বাজি রাখবে। সালমা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সে রাজি হয়ে যায়। অল্পদিনের মধ্যে নিজের বাহিনী প্রস্তুত করে সালমা মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ সময় বাযাখায় ছিলেন। এখানের মাটিতেই তিনি তুলাইহার ভণ্ডামির যবনিকাপাত ঘটান। তিনি গোয়েন্দা মারফৎ জানতে পারেন যে, বনূ ফারাযার সৈন্যরা আবার সংঘটিত হয়ে আসছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পুনরায় বাহিনীকে রণসাজে সজ্জিত করে বিন্যস্ত করেন।
মা উটে চড়ে অগ্রভাগে থেকে চিৎকার করে করে যেরূপভাবে সৈন্যদের অনুপ্রাণিত করত ঠিক তেমনি সালমাও সৈন্যদের আগে আগে ছিল। তার আশে-পাশে তলোয়ার এবং বর্শা সজ্জিত একশ উষ্ট্রারোহী ছিল। সালমার নিরাপত্তায় এরা ছিল জীবন্ত মানব ঢাল। সালমার নেতৃত্বাধীন বাহিনী অমিত বিক্রমে অগ্রসর হচ্ছিল এবং রণাঙ্গন কাঁপিয়ে হুঙ্কার ছাড়ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের আরো নিকটে আসার অপেক্ষা করেন না। তার বাহিনীর সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। তিনি শত্রু বাহিনীকে বিন্যস্ত হওয়া কিংবা স্বল্প সংখ্যক মুসলমানদেরকে চারদিক থেকে ঘেরাও করার পজিশন নিতে সুযোগ দেয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুঙ্কার দিতে দিতে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি জানতেন, শত্রুসৈন্য সফরের ক্লান্তিতে অবসন্ন। তিনি শত্রুর শারীরিক দৈন্যতার এ দুর্বল পয়েন্ট থেকে পুরোপুরি ফায়দা হাসেল করতে চান।
একশ দুর্ধর্ষ উষ্ট্রবাহিনীর নিপুণ প্রহরায় থেকে সালমা উত্তেজনাকর বাক্যের মাধ্যমে সৈন্যদের প্রেরণা চাঙ্গা ও উজ্জীবিত করছিল। ঐতিহাসিকগণ লেখেন, বনূ ফারাযা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আক্রমণ বীর বিক্রমে প্রতিহত করে। সৈন্য কম হওয়ার কারণে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবস্থা ক্রমেই নাজুক হতে থাকে। অপরদিকে দুশমনের উদ্দীপনা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। সালমার হুঙ্কার আর উত্তেজনাকর শব্দ জ্বলন্ত হাড়িতে তৈল সরবরাহের কাজ করছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। সালমার নেতৃত্বই যেহেতু বনূ ফারাযাকে এভাবে বীরত্বের অগ্নি ঝরাতে অনুপ্রাণিত করছিল, তাই তিনি সালমার হত্যার মাধ্যমে বনূ ফারাযার প্রেরণার মূলে কুঠারাঘাত হানতে চান। তিনি বাছাইকৃত কয়েকজন যোদ্ধাকে সালমার নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙ্গে তাকে উট থেকে ফেলে দিতে নির্দেশ দেন।
সালমার নিরাপত্তা বাহিনীও ছিল দুর্ধর্ষ। তারা খালিদ বাহিনীকে কাছেই ঘেঁষতে দেয় না। মুসলিম জানবাজরা এ কৌশল অবলম্বন করে যে, তারা নিরাপত্তা বাহিনীর একেকজনকে পৃথক করে হত্যা করতে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় তারা নিরাপত্তা বেষ্টনী ভাঙ্গতে সক্ষম হয়। তারপরেও কারো পক্ষে সালমা পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আহত হয়ে সবাই পিছনে ফিরে আসে।
এক সময় একশ নিরাপত্তা কর্মীর সকলেই নিহত হয়। অবশ্য এর জন্য হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুও বিপুল ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হন। পথ নির্বিঘ্ন হয়ে গেলে মুসলিম মুজাহিদরা তরবারী দিয়ে সালমার হাওদার রশি কেটে দেয়। হাওদা (উষ্ট্রাসন) সালমাকে নিয়ে নিচে পড়ে যায়। মুজাহিদরা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে পরবর্তী নির্দেশের জন্য তাকায়। সালমাকে বন্দী না হত্যা করবে তা জানতে চায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হাত দ্বারা হত্যার ইশারা করেন। এক মুজাহিদ এক কোপে সালমার মস্তক ধড় থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দেন।
নেত্রীর এহেন মর্মান্তিক মৃত্যুতে বনূ ফারাযার মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। লাফ দিয়ে তাদের বীরত্বের মিটার কাপুরুষতার গ্রেডে চলে আসে। প্রতিরোধের পথ ছেড়ে পলায়নের পথ ধরে। অগণিত লাশ আর অসংখ্য আহত রেখে তারা পালিয়ে যায়।
৩.১১ গ্রামের নাম বাতাহ
॥ এগার ॥
মদীনা হতে প্রায় ২৭৫ মাইল উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি গ্রামের নাম বাতাহ। এখানে কয়েকটি বেদুঈন পরিবার বসবাস করত। এটা উল্লেখযোগ্য কোন গ্রাম ছিল না। সন্ধানী দৃষ্টিতে নজর বুলালে কতিপয় এমন আলামত পাওয়া গেল—যা প্রমাণ করে যে, এখানে কোন এক নগরী গড়ে উঠেছিল।
