হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্রোধে জ্বলে ওঠেন। তার রক্ত টগবগিয়ে ওঠে। তিনি দ্রুত মার্চ করে তুলাইহার বসতিতে গিয়ে পৌঁছান। সংঘাত নিশ্চিত জেনে তুলাইহাও রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। দু’বাহিনী ময়দানে নেমে আসে। উয়াইনার হাতে থাকে তুলাইহা বাহিনীর সেনা কমান্ড। তুলাইহা এক নিরাপদ তাঁবুতে নবীর গাম্ভীর্য নিয়ে বসা ছিল। উয়াইনা ছিল রণাঙ্গনে। মুসলমানদের ক্রুদ্ধ ও ক্ষুব্ধ চেহারা দেখে উয়াইনার পিলে চমকে যায়। তার বাহিনী ক্রমেই যে পর্যদস্ত হয়ে পড়ছে তাও উয়াইনার নজর এড়ায় না। সে সেনা কমান্ড মাঠে ফেলে তুলাইহার কাছে ছুটে যায়। তুলাইহাকে সত্য নবী বলে সে বিশ্বাস করত।
“সম্মানিত নবী!” উয়াইনা তুলাইহাকে জিজ্ঞাসা করে—“আমরা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন। জিব্রাইল কোন ওহী নিয়ে এসেছে?”
“এখনও আসেনি”—দুলাইহা জবাবে বলে—“তুমি লড়াই অব্যাহত রাখ।”
উয়াইনা দৌড়ে ময়দানে আসে এবং কমান্ড করতে থাকে। মুসলমানদের বজ্র নিনাদ আর আক্রমণ আরো তীব্র হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর রণকৌশলে ভণ্ড নবীর বাহিনীর শক্তি নিস্তেজ হয়ে আসছিল। উয়াইনা আরেকবার তুলাইহার কাছে ছুটে যায়।
“নবী!” উয়াইনা তুলাইহাকে জিজ্ঞাসা করে—“কোন ওহী এল কি?”
“এখনও নয়”—তুলাইহা বলে—“যাও, লড়াই চালিয়ে যেতে থাক।”
“ওহী আর কখন আসবে?”—উয়াইনা উদ্বেগজনক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে—“আপনি বলেছিলেন, কঠিন সময়ে ওহী নাযিল হয়।”
“আমার দোয়া আল্লাহর দরবারে পৌঁছে গেছে”—তুলাইহা বলে—“এখন শুধু ওহীর অপেক্ষা মাত্র।”
উয়াইনা ভগ্নহৃদয়ে আবার সৈন্যের কাছে ফিরে যায়। ততক্ষণ তার বাহিনী হযরত খালিদের ঘেরাওয়ের মধ্যে এসে যায়। উয়াইনা আতংকিত অবস্থায় পুনরায় তুলাইহার কাছে যায় এবং তাকে সৈন্যদের দুরবস্থার কথা বলে জিজ্ঞাসা করে যে, ওহী নাযিল হয়েছে কি না?
“হ্যাঁ”—তুলাইহা জবাবে বলে—“ওহী নাযিল হয়ে গেছে।”
“কি নাযিল হল?” উয়াইনা আশান্বিত কণ্ঠে জানতে চায়।
“তা এই যে”—তুলাইহা জবাবে বলে—“মুসলমানরাও যুদ্ধ করছে এবং তোমরাও যুদ্ধ করছ। এমন একটি সময় আসছে, যার কথা কোনদিন তোমরা ভুলবে না।”
উয়াইনার আশা ছিল ভিন্ন কিছুর। তুলাইহা তাকে নিরাশ করে। সে বুঝে ফেলে তুলাইহা মিথ্যা বলছে।
“এমনটিই হবে”—উয়াইনা রাগতস্বরে বলে—“সে ক্ষণ অতি নিকটবর্তী যার কথা সারা জীবন আপনি ভুলবেন না।”
উয়াইনা ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বেরিয়ে আসে এবং চিৎকার করে করে তার গোত্রের উদ্দেশে বলে—“হে বনূ ফারাযা! তুলাইহা মিথ্যাবাদী। ভণ্ড নবীর জন্য নিজ প্রাণ খুইয়াও না। পালাও! নিজ প্রাণ বাঁচাও।”
বনূ ফারাযা মুহূর্তে ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়। তুলাইহার গোত্রের যোদ্ধারা তুলাইহার তাঁবুর চতুর্দিকে জমা হয়ে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের কাণ্ড দেখছিলেন। তুলাইহার তাঁবুর সাথে একটি ঘোড়া এবং একটি উট প্রস্তুত ছিল। গোত্রের লোকেরা এ মুহূর্তে করণীয় কি জানতে চায়। তাদের প্রশ্নের কোন সদুত্তর না দিয়ে তুলাইহা ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে। তাবুতে তার স্ত্রীও ছিল। সে উটের পিঠে আরোহণ করে।
“ভাইসব!” তুলাইহা তার গোত্রের সমবেত লোকদের উদ্দেশে বলে—“যাদের পলায়নের ব্যবস্থা আছে তারা এখনই স্ত্রী-পুত্র নিয়ে আমার মত পালিয়ে আত্মরক্ষা কর।”
এরপর সে আর দেরী করে না। জলদি ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এভাবে এক মিথ্যুক ও ভণ্ড নবীর ফেৎনার পরিসমাপ্তি ঘটে। হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শাসনামলে তুলাইহা তার বাইয়াত হয়ে মুসলমান হয়ে যায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সফল অভিযান চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনি ইতিমধ্যে আরো কয়েকটি গোত্রকে অনুগত করেন এবং ধর্মান্তরের অপরাধে তাদের কঠোর শাস্তি দেন। তাদের উপর বিভিন্ন বিধি-নিষেধ আরোপ করেন। ইসলাম থেকে যারা দূরে সরে গিয়েছিল তাদের পুনর্বার ইসলামে দীক্ষিত করেন। তিনি তুলাইহার নবুওয়াতকে চিরতরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেন এবং চরম মুসলিম বিদ্বেষী উয়াইনা পালিয়ে সুদূর ইরাকে গিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু তার প্রেতাত্মা ঠিকই রয়ে যায়। সালমা নামে এক নারীর রূপে এ প্রেতাত্মা সামনে আসে। তার পূর্ণ নাম উম্মে জামাল সালমা বিনতে মালিক।
বনূ ফারাযার খান্দানী বংশের প্রখ্যাত মহিলা উম্মে করফার মেয়ে ছিল এই সালমা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশার একটি ঘটনা। হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু বনূ ফারাযার এলাকায় একবার গিয়ে হাজির হন। গোত্রটি চরম মুসলিম বিদ্বেষী এবং তাদের ঘোরতর শত্রু ছিল। ওয়াদিউল কুরা নামক স্থানে হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বনু ফারাযার কিছু লোকের সামনে পড়েন। হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে কয়েকজন মাত্র ছিল। বনু ফারাযার লোকেরা তাদের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করে। হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গুরুতর আহত হয়ে কোন রকমে মদীনায় আসতে সক্ষম হন। তিনি সুস্থ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নেতৃত্বে একটি নিয়মতান্ত্রিক সেনাবহর বনূ ফারাযাকে শিক্ষা দিতে প্রেরণ করেছিলেন।
মুসলিম কনভয় বনূ ফারাযার প্রতিরোধ শক্তি গুঁড়িয়ে দেয়। শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে তাদের অনেককে খতম এবং কতককে যুদ্ধবন্দী করে। বড় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে উম্মে করফা ফাতেমা বিনতে বদরও ছিল। তার এ বিষয়ে বড় খ্যাতি ছিল যে, সে নিজ গোত্র ছাড়াও অন্যান্য গোত্রদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করত। তাকে মদীনায় এনে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। সাথে তার নাবালেগা কন্যা উম্মে জামালও ছিল। কন্যাটিকে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর হাতে সোপর্দ করা হয়। তাকে তিনি আদর-যত্নে লালন-পালন করেন। কিন্তু সে সর্বক্ষণ উদাস ও ভারাক্রান্ত থাকত। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তার প্রতি দয়াদ্র হয়ে তাকে আযাদ করে দেন।
