ধর্মান্তরের ফেৎনা ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমরায়োজনের ব্যবস্থা করতে হয়। সমর শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করতে হয়। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু পুরো সেনাবাহিনী কয়েক অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অংশের পৃথক কমান্ডার নিযুক্ত করেন। তাদের জন্য আলাদা রণক্ষেত্রও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। অর্থাৎ একেক কমান্ডারকে একেক এলাকা দেয়া হয়, হামলা করার জন্য। এ সেনা বিভক্তির ক্ষেত্রে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিপক্ষের শক্তি ও সৈন্য বিবেচনায় রেখে মুসলিম কমান্ডার ও সৈন্য সংখ্যা নির্ধারণ করেন।
সবচেয়ে শক্তিশালী ও দাগাবাজ ছিল দু’মুরতাদ। তুলাইহা এবং মুসাইলামা। তারা উভয়ে নবুওয়াত দাবী করে নিজেদের সপক্ষে হাজার হাজার ভক্ত যোগাড় করতে সমর্থ হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এদের একজনের বিরুদ্ধে সেনাপতি নিযুক্ত হন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে তুলাইহা এর বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তুলাইহাকে শায়েস্তা করার পর তাকে বাতাহ নামক স্থানে যেতে বলেন। এখানে বনূ তামীমের সর্দার মালেক বিন নাবীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল।
সকল কমান্ডার নিজ নিজ রণক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী নিয়ে উদ্দীষ্ট রণক্ষেত্রে যথারীতি এত দ্রুত গিয়ে পৌঁছান যে, দুশমনরা মোটেও টের পায় না। তিনি পৌঁছেই কালক্ষেপণ না করে কয়েকটি বসতি ঘেরাও করে ফেলেন। স্থানীয় লোকজন আতংকিত হয়ে পড়ে। নেতৃস্থানীয় কিছু লোক হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে জানায় যে, অনেক গোত্র তুলাইহার প্রতারণার শিকার। তাদের রক্ত ঝরানো ঠিক হবে না। তিনি একটু সময় দিলে তাঈফ গোত্র হতে কম-বেশী ৫০০ যোদ্ধা হযরত খালিদের বাহিনীতে যোগ দিবে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের সুযোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যে নেতৃস্থানীয় লোকেরা তাঈফ গোত্র হতে ৫০০ যোদ্ধা নিয়ে আসে। তারা তুলাইহার গোত্র এবং তাদের অধীনস্থ গোত্রের বিরুদ্ধে লড়তে অনুপ্রাণিত ছিল। তারা সশস্ত্র হয়েই আসে। যাদিলা গোত্রও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে এসে যোগ দেয়। তুলাইহা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী আসছে শুনে অত্যন্ত ঘাবড়ে যায়। কিন্তু তৎপর হয়ে ওঠে উয়াইনা নামক এক ব্যক্তি। লোকটি ফারানা গোত্রের নেতা ছিল। তার অন্তরে এত মদীনা-বিদ্বেষ ছিল যে, সে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে যে, সে কিছুতেই মদীনা কেন্দ্রিক শাসন মানতে রাজি নয়। খন্দক যুদ্ধে যে তিন বাহিনী মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা করে তার এক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল এই উয়াইনা বিন হাসান। শত্রুদের উপরে আগে ঝাঁপিয়ে পড়’—এই নীতি অনুযায়ী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনা থেকে এগিয়ে এসে ঐ তিন বাহিনীর উপর আক্রমণ করেছিলেন। বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয় উয়াইনার নেতৃত্বাধীন সৈন্যরা। সে পরিস্থিতির চাপে পড়ে ইসলাম কবুল করেছিল। কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে তার অপতৎপরতা যথারীতি অব্যাহত থাকে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুও যথাসময়ে জানতে পারেন যে, তুলাইহার সাথে উয়াইনাও আছে। ফলে তিনি অঙ্গীকার করেন যে, তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। শায়েস্তা করে ছাড়বেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু রওনা হওয়ার পূর্বে হযরত উক্কাশা বিন মুহসিন রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত সাবেত বিন আকরাম আনসারী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে গোয়েন্দাবৃত্তির উদ্দেশ্যে অগ্রে পাঠিয়ে দেন। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল, শত্রুর গতিবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবে এবং তাদের থেকে যদি কোন অস্বাভাবিক আচরণ প্রকাশ পায় এবং তা মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের কাজে আসে তাহলে দ্রুত যেন তা সেনাপতিকে অবহিত করে। গোয়েন্দা সাহাবাদ্বয় রওনা হয়ে যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুও সৈন্য নিয়ে এগুতে থাকেন। বহুদূর গেলেও গোয়েন্দা দু’জনের একজনকেও ফিরে আসতে দেখা যায় না।
আরো এগিয়ে গেলে রক্তরঞ্জিত তিনটি লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। দুটি লাশ হযরত উক্কাশা রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু এর। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য আগে পাঠিয়েছিলেন। তৃতীয় লাশটি ছিল এক অজ্ঞাত ব্যক্তির। পরে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের পটভূমি এই জানা যায় যে, গোয়েন্দাদ্বয় সামনে এগিয়ে চলে। পথিমধ্যে হাবাল নামক এক ব্যক্তি তাদের সামনে পড়ে। ঐতিহাসিক ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে হাবাল তুলাইহার ভাই ছিল। কিন্তু তাবারী এবং কামুসের মতে হাবাল ভাই ছিল না, বরং ভ্রাতুস্পুত্র ছিল। হযরত উক্কাশা এবং হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু হুঙ্কার দিয়ে তাকে হত্যা করেন।
তুলাইহার কাছে খবর পৌঁছে যায়। সে অপর ভাই সালামাকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। ইতোমধ্যে হযরত উক্কাশা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত সাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো এগিয়ে যান। তাদের আসতে দেখে তুলাইহা ও তার ভাই ঘাপটি মেরে থাকে। সাহাবাদ্বয় কাছে আসতেই তারা কোনরূপ আত্মরক্ষার সুযোগ না দিয়ে তাদেরকে হত্যা করে ফেলে।
