“এমন দুঃসাহস আমি কস্মিনকালেও করব না।”—হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমার বুকের পাঠায় এত সাহস নেই।”
“আমার কথা শোন ইবনে খাত্তাব!” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “জাতির অবস্থার দিকে তাকাও। সমগ্র জাতি শোকাহত, বেদনাবিধূর। শোকের সাথে সাথে একটি ভীতি সকলের অন্তরে আচ্ছন্ন হতে চলেছে। এটা বিদ্রোহভীতি, যা চতুর্দিক হতে উত্থিত হচ্ছে। প্রতিদিনের শিরোনাম, অমুক গোত্র বিদ্রোহী হয়ে গেছে। অমুক গোত্র ইসলাম থেকে সরে এসেছে। ইসলাম সংকট ও ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। মদীনাও অরক্ষিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ইহুদি-খ্রিস্টানরা বিপদজনক গুজব ছড়াতে শুরু করেছে। এতে ভীতি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ মুহূর্তে রোমীয়দের উপর আক্রমণ স্থগিত করলে দ্বিবিধ ক্ষতি রয়েছে। জনতার মাঝে এ ধারণা সৃষ্টি হবে যে, আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছি। দ্বিতীয় ক্ষতি হলো, আমাদেরকে দুর্বল প্রতিপন্ন করে রোমী এবং অগ্নি উপাসকরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমি জনতাকে দেখাতে চাই যে, আমরা দুর্বল হয়ে যাইনি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুণ্যাত্মা এবং দু’আ আমাদের সাথে আছে। আল্লাহ আমাদের সর্বাত্মক সাহায্যকারী। আমি জাতির উদ্দীপনা ও প্রেরণা পূর্বের মত দৃঢ় রাখতে চাই। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ করে চলা আমার জন্য ফরয।”
সৈন্য প্রেরণের সপক্ষে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যুক্তিশীল ও নীতিপূর্ণ বক্তব্য হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে শান্ত, নিশ্চিত ও আস্থাশীল করে। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কালক্ষেপণ না করে সৈন্যদের মার্চ করে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দেন।
হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী রওয়ানা হলে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু দূর পর্যন্ত তাদের সাথে সাথে যান। সেন্যাধ্যক্ষ হওয়ায় হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের সাথে ঘোড়ায় সমাসীন ছিলেন। ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা, এক তরুণ সিপাহসালার ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলেন আর ইসলামের খলীফা তার পাশে পাশে পায়ে হেঁটে চলছিলেন। এভাবে খলীফা জনতাকে দেখাতে চান যে, হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বয়সে তরুণ হলেও তিনি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য।
‘সম্মানিত খলীফা!” হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিনীতকণ্ঠে বলেন—“আপনিও ঘোড়ায় আরোহণ করুন নতুবা আমাকে নেমে এসে আপনার সাথে পায়ে হেঁটে চলার অনুমতি দিন।”
“আমি সওয়ার হব না এবং তুমি পায়ে হেঁটেও চলবে না”—হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“আমি এ আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করছি যে, আল্লাহর রাস্তার ধুলা আমার পায়ে লাগছে।”
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ পর্যায়ে এসে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মদীনায় উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
“উসামা!” খলীফা সেনাপতিকে বলেন—“তোমার সম্মতি থাকলে আমি উমরকে মদীনায় রেখে দিতে চাই। রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে তার সাহায্য আমার লাগতে পারে।”
হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সৈন্যদের থেকে পৃথক করে তাকে মদীনায় ফিরে যাবার অনুমতি দেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বার্ধক্যের বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি এক স্থানে দাঁড়িয়ে যান। হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের থামার নির্দেশ দেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অপেক্ষাকৃত এক উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলেন :
“ইসলামের হে বীর সেনানীগণ! বিদায় মুহূর্তে দশটি নসীহত করতে চাই। এগুলো মনে রেখ, সুফল পাবে। আর তা হলো—
১. খেয়ানত করবে না অর্থাৎ রক্ষক হয়ে ভক্ষক হবে না।
২. চুক্তি লঙ্ঘন করবে না। এটা জঘন্য অপরাধ।
৩. চুরি করবে না। যে কোন মূল্যে ওয়াদা ঠিক রাখবে।
৪. শত্রুর লাশের বিকৃতিসাধন কিংবা অঙ্গহানী করবে না।
৫. নাবালেগ সন্তান এবং মহিলাদের হত্যা করবে না।
৬. খেজুর ও অন্যান্য ফল-মূলের বৃক্ষ কেটে নষ্ট করবে না।
৭. আহারের প্রয়োজন ছাড়া কোন পশু জবেহ করবে না।
৮. বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় তোমাদের সামনে পড়বে। সেখানে অনেক বৈরাগীদের দেখা পাবে। তাদের উত্যক্ত করবে না।
৯. চলতি পথে স্থানীয় বাসিন্দারা তোমাদের জন্য খাদ্যদ্রব্য আনবে। আল্লাহর নাম নিয়ে এ খাদ্য খেয়ে নিবে। এমনও লোকের সাক্ষাৎ তোমরা পাবে যাদের মাথায় শয়তানের বাসা থাকবে। তাদের মাথার তালু টাক এবং আশে-পাশের চুল অনেক লম্বা হবে। দেখা মাত্রই তাদের হত্যা করে ফেলবে।
১০..আল্লাহর উপর আস্থা রেখে নিজেদের হেফাজত করবে। রওয়ানা কর, প্রিয় মুজাহিদ বাহিনী! পরাজয় এবং বিপদাপদ থেকে আল্লাহ তোমাদের হেফাজত করুন।”
৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জুন মোতাবেক ১১ হিজরীর ১লা রবিউল আওয়াল এ বাহিনী মদীনা ছেড়ে যায়।
॥ দশ ॥
উপন্যাসটি যেহেতু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণাঢ্য জীবনভিত্তিক তাই সমগ্র ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এখানে সঙ্গত কারণেই সম্ভব নয়। উসামা বাহিনীর পরবর্তী বিবরণ একটু বলেই ক্ষান্ত করব যে, এ বাহিনী রোমীয়দের বিরুদ্ধে মাত্র ৪৩ দিনে ঐ সফলতা অর্জন করে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একান্তভাবে চেয়েছিলেন। হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু এ যুদ্ধে পূর্ণ দক্ষতা ও সফল নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি বিজয়ী বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করলে যারা তার সেনাপতিত্বে বেজার ছিল তারাও এসে তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে এবং আন্তরিক মোবারকবাদ জানান।
