সংবাদ আসে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও সংকটাপন্ন। খবর পেয়েই আমি কয়েকজন সাথী নিয়ে মদীনায় আসি। আমরা সোজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাসভবনে গিয়ে উপস্থিত হই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। মুখ ফুটে কথাও বলতে পারছিলেন না। তিনি এ অবস্থার মাঝেও হাত দু’তিন বার আকাশ পানে উঁচিয়ে আমার দিকে তাক করেন। বুঝতে পারি তিনি আমার জন্য দুআ করছেন।”
পরের দিন হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাসভবনে যান এবং তাকে বলেন—“হে আল্লাহ্র রাসূল। সৈন্য যারফে আমার অপেক্ষার্থী। যাবার অনুমতি প্রার্থনা করছি।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত উপরে উঠান। কিন্তু বেশী উঠাতে পারেন না। দুর্বলতা সীমাহীন বৃদ্ধি পায়। হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ভারাক্রান্ত হৃদয় আর অশ্রুসজল চোখে রওয়ানা হয়ে যান। এর একটু পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। হযরত উসামার উদ্দেশ্যে দূত ছুটে যায়। যারফে পৌঁছানোর পূর্বেই দূত হযরত উসামাকে পেয়ে যায়। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের খবর শুনেই দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দেন এবং সৈন্যদের কাছে গিয়ে পৌঁছান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের খবর শুনে সৈন্যদের মাঝে বিষাদের কালো ছায়া নেমে আসে। সবার চোখে-মুখে বেদনার কালো পর্দা পড়ে। চোখ ছাপিয়ে যায় অশ্রুর বন্যায়। বেদনার ছুড়ি গিয়ে বিঁধে হৃদপিণ্ডে। স্বজনের বিয়োগে মুখ হয়ে যায় মূক।
স্বাভাবিক অনুভূতি লোপ পায়। নিস্তেজ-নিঃসাড় হয়ে যায় হস্তপদ। ধমনীতে রক্তের প্রবাহ থমকে দাঁড়ায়। সহসা নীরব হয়ে যায় সরব মুখগুলো। বুকফাটা আর্তনাদ সংযত করে ঠোঁট কামড়ে বজ্রাঘাত সহ্য করতে পারে না অনেকে। ভূতলে লুটিয়ে পড়ে মূর্ছা খেয়ে। কিছুক্ষণের জন্য পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে যারফে। সবাই সোকাহত। সান্ত্বনার ভাষা কেউ খুঁজে পায় না। সেনাপতি নিজেও কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাটির দিকে তাকিয়ে তিনি শোক লাঘব ও অশ্রু লুকাবার বৃথা চেষ্টা করেন। শোক সাগরে ভাসমান থাকে সৈন্যরা কিছুক্ষণ। সেনাপতি আস্তে আস্তে পরিস্থিতি সামলে নেন। শোক সন্তপ্ত সৈন্যদের সান্ত্বনা দেন। সৈন্যদের হতাশা কিছুটা লাঘব হলে তিনি সেনাবাহিনী মদীনায় ফিরিয়ে আনেন। যুদ্ধযাত্রা স্থগিত হয়ে যায়।
বাইয়াত পর্ব শেষ। প্রথম খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অভিষেক হলো কিছুক্ষণ মাত্র আগে। অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতেই হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে জানতে চান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কি নির্দেশ দিয়েছিলেন।
“নির্দেশ সম্বন্ধে আপনিও সম্যক অবহিত” হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিনয়ের সাথে জবাব দেন—“তারপরেও আমার মুখ থেকে শুনতে চাইলে আমি বলছি শুনুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ফিলিস্তিনে বালকা এবং দাওয়াম সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আরো সামনে অগ্রসর হয়ে রোমীয়দের উপর আক্রমণ করতে। আর এ স্থান পর্যন্ত সৈন্য এমনভাবে নিয়ে যেতে হবে যেন আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত শত্রুপক্ষ টের না পায়।”
“রওয়ানা কর উসামা!” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“তোমার বাহিনী নিয়ে এখনি যাত্রা কর এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ কর।
নাজুক মুহূর্তে যুদ্ধযাত্রার নির্দেশ দিলে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হন। প্রায় সকলেই বলতে থাকে, যখন চতুর্দিক হতে বিপদের ঘনঘটা ও পদধ্বনি উঠছে ঠিক সেই মুহূর্তে এত বিরাট যুদ্ধের উদ্যোগ নেয়া তাও আবার মদীনা হতে শত-সহস্র ক্রোশ দূরে—মোটেও সমীচীন নয়। মদীনা অভিমুখে যে সমস্ত ফেৎনা ধেয়ে আসছে তা মোকাবিলার জন্য এ বাহিনীর এখানেই থাকা জরুরী।
“ঐ সত্তার কসম, যার কুদরতী হাতে আমার জীবন!”—হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “বনের হিংস্র জন্তুরাও যদি আমাকে ছিঁড়ে-ফেঁড়ে খেতে আসে তবুও আমি উসামার বাহিনীকে যাত্রা বন্ধের নির্দেশ দিব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম মুহূর্তে যে নির্দেশ দিয়ে গেছেন তার বিরুদ্ধাচরণ আমি কিছুতেই করতে পারি না। এ বাহিনী পাঠাতে যদি মদীনায় আমাকে একাও থাকতে হয় তবুও আমি তাতে পিছপা হব না।”
“আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—“অভিযোগকারীরা এ কথাও বলছে যে, সৈন্য যদি একান্তই পাঠাতে হয় তবে হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পরিবর্তে অন্য কোন অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে সেনাপতি নিযুক্ত করা হোক।”
“শোন ইবনে খাত্তাব!” হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন—“তোমার কি মনে নেই স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামাকে সেনানায়ক বানিয়েছেন। আল্লাহর রাসূলের নির্দেশ উপেক্ষা করার দুঃসাহস তোমার হবে কি?”
