হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অবাক করা এ আকস্মিক নির্দেশের পটভূমি এই ছিল যে, তাবুক এবং মুতা যুদ্ধের পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা জরুরী মনে করেন যে, রোমীয়দের প্রতি এখনই হামলা চালিয়ে তাদের শক্তিও নিঃশেষ করে দেয়া উচিত। ইতোপূর্বে তাবুক এবং মুতা যুদ্ধ এই সুফল বয়ে এনেছিল যে, এর মাধ্যমে ঐ সমস্ত গোত্র অনুগত হয়ে যায়, যাদের ব্যাপারে আশঙ্কা ছিল যে, তারা রোমীয়দের সাথে হাত মিলাবে। আর এভাবে একটি শক্তিশালী মুসলিম বিরোধী যুদ্ধফ্রন্ট খুলে যাবে। রোমীয়দের সম্ভাব্য সহযোগী শক্তি চূর্ণের পর এবার প্রয়োজন ছিল খোদ রোমীয়দের উত্থিত ফনা পিষ্ট করা ও বিষদাঁত ভেঙ্গে দেয়া। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাহসী সিদ্ধান্ত সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা ছিল না, বরং অস্তিত্ব ও মতাদর্শ রক্ষাই ছিল এর প্রধান লক্ষ্য। ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইসলামের বিরোধিতায় রোমীয়দের ক্যাম্পে গিয়ে আস্তানা গেড়েছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে রোমীয়দের উপর হামলার উপযোগী মুহাজির ও আনসারদের সমন্বয়ে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পুত্র হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু এ বাহিনীর সিপাহসালার নিযুক্ত হন। তার বয়স তখন সর্বোচ্চ হলে কুড়ি বছর ছিল। ঐতিহাসিকদের অভিমত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে এক বিশেষ উদ্দেশ্যে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। তিনি তারুণ্যের মাঝে নেতৃত্ববোধ ও উৎসাহব্যঞ্জক প্রেরণা সৃষ্টি করতে চান। মুসলিম তারুণ্য শক্তি উসামা চেতনায় উজ্জীবিত ও তার মত যোগ্যতা-দক্ষতা অর্জন করে রণাঙ্গনে সফল নেতৃত্ব দিতে অনুপ্রাণিত হবে—এই দৃষ্টিকোণকে সামনে রেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তিম মুহূর্তে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে টগবগে তরুণ হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে তার নেতৃত্ব সোপর্দ করেন।
হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি তাকে অত্যন্ত স্নেহ ও আদর করতেন। তাঁর পিতা হযরত যায়েদ বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতা যুদ্ধে শহীদ হন। শৈশবকালেই হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মাঝে সৈনিকসুলভ সকল গুণাগুণ এবং বীরত্ব এসে গিয়েছিল। ওহুদ যুদ্ধের সময় তিনি ছোট থাকায় এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন না। সেনাবাহিনী রওয়ানা হওয়ার পূর্বেই তিনি রওয়ানা হয়ে পথিমধ্যে কোথাও আত্মগোপন করে থাকেন। সেনাবাহিনী সে স্থান দিয়ে গমন করলে তিনি চুপিসারে সৈন্যদের মধ্যে ঢুকে তাদের সাথে মিশে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল যে কোন পন্থা ও মূল্যে যুদ্ধে শরীক হওয়া। কিন্তু তার এই অদম্য স্পৃহা পূরণ হয় না। ময়দানে পৌঁছে তিনি নজরে পড়ে যান। ফলে তাকে সেখান থেকেই ফেরৎ পাঠানো হয়। অবশ্য হুনায়ন যুদ্ধে তিনি দুঃসাহসিক বীরত্ব প্রদর্শন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। হার না মানা যুদ্ধ ইনিংস খেলে তিনি সকলকে দেখিয়ে দেন যে, বাহাদুরী কাকে বলে। এক তরুণ যোদ্ধা কিভাবে বজ্র হয়ে শত্রু শিবির মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারে।
রোমীয়দের মোকাবিলায় বিশাল বাহিনী গড়ে তুলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেতৃত্বভার হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাঁধে অর্পণ করলে কিছু লোক এই আপত্তি উত্থাপন করে যে, হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত শীর্ষ মর্যাদাবান এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব যে বাহিনীতে বিদ্যমান তার নেতৃত্ব সেদিনের এক বাচ্চার হাতে অর্পণ করা মোটেও সমীচীন নয়।
মানুষের এই সমালোচনা ও অভিযোগ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কানে ঐ সময় পৌঁছে যখন তিনি মৃত্যুপীড়ায় শায়িত এবং বারবার জ্বরে মূর্ছা যাচ্ছেন। এ সময় তাঁর কথা বলার শক্তিও ছিল না। জ্বরের উপশমের জন্য তিনি স্ত্রীদেরকে গোসল করিয়ে দিতে বলেন। প্রচুর পানি দিয়ে তাকে গোসল দেয়া হলে জ্বর অনেকটা নেমে যায়। অবশ্য দুর্বলতা ছিল বেশ। তারপরেও তিনি মসজিদে তাশরীফ নিয়ে যান। সেখানে বহু লোক সমবেত ছিল। সমালোচনাকারী এবং অভিযোগ আরোপকারীরাও সেখানে উপস্থিত ছিল।
“প্রিয় জনতা!” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনতার উদ্দেশ্যে বলেন—“উসামা বাহিনীকে নির্বিবাদে যেতে দাও। তার নেতৃত্বের কারণে তোমরা সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছ। ইতোপূর্বে তার পিতার উপরেও তোমরা অভিযোগ উত্থাপন করেছিলে। আমি উসামাকে এই পদের যোগ্য মনে করি। তাঁর পিতাকেও এ পদের যোগ্য মনে করেছিলাম। তোমাদের ভাল করেই জানা আছে যে, তাকে সেনাপতি বানানো আমার ভুল পদক্ষেপ ছিল না।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষণে সমালোচনা মুখ থুবড়ে পড়ে। সকল দ্বিধাদ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটে। হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই নেতা মেনে নিয়ে রোমীয়দের উদ্দেশে উসামা বাহিনী রওনা হয়ে যায়। কিন্তু এ বাহিনী যারফ নামক স্থানে পৌঁছলে সংবাদ আসে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা অত্যন্ত আশংকাজনক। যুবক বয়সেই হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মধ্যে বড়দের মত দূরদর্শীতা ও বিচক্ষণতাগুণ সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি যারফে বাহিনী থামিয়ে নিজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতে মদীনায় আসেন। এক পত্রে হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সে অবস্থার বিবরণ নিম্নরূপ পাওয়া যায় :
