“আমাদের স্বামী-স্ত্রী হয়ে যাওয়াই কি ভাল হয় না?” মুসাইলামা সায্যাহ এর চোখে আরেকবার অর্থপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করে জিজ্ঞাসা করে।
“এর থেকে উত্তম প্রস্তাব আর হতে পারে না”—সায্যাহ বিমোহিত কণ্ঠে উত্তর দেয়।
পর প্রভাতে যখন সায্যাহ বের হয় তখন মনে হচ্ছিল কনে তার পছন্দের স্বামীর সাথে বাসর রাত উদযাপন করে বের হচ্ছে। সারা কেল্লায় বিয়ের শানাই বাজে। সায্যাহ এর বাহিনী এক সময় খবর পায় যে, সায্যাহ মুসাইলামার সাথে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়েছে।
এই বিবাহ ইসলামের জন্য বিপদজনক হয়ে ওঠে। উভয় ফৌজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই ঐক্য বেশিদিন স্থায়ী থাকে না। জলদি ভেঙ্গে যায়। কারণ, মুসাইলামা সায্যাহ এর সাথে চরম প্রতারণা করে। ফলে সে ভগ্নহৃদয়ে পিত্রালয় এলাকা ইরাক চলে যায়। সায্যাহকে বিবাহ করা ছিল মুসাইলামার এক কূটনৈতিক চাল। সে শক্তিক্ষয়ের পরিবর্তে সায্যাহ এর হৃদয়জয়ের মাধ্যমে এক নিশ্চিত বিপদের মূলোৎপাটন করে। সায্যাহ মুসাইলামার কপট আচরণে মনে এত আঘাত পায় যে, নবুওয়াতের দাবী থেকেই সে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়। পরে সে মুসলমান হয়ে কুফায় চলে গিয়েছিল। সে দীর্ঘ জীবন লাভ করে এবং খোদাভীরু ও বিদূষী মহিলা হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি লাভ করে।
॥ নয় ॥
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তিকালে চতুর্দিকে বিদ্রোহ এবং চুক্তিলঙ্ঘনের প্রাদুর্ভাব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তুফানের গতিতে এসব ফিত্না মদীনাপানে ধেয়ে আসতে থাকে। একটি তুফান সাহাবায়ে কেরামের মধ্য হতেই ওঠে। প্রথম খলীফা নির্বাচনের জটিল পথ চেয়ে এ তুফানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। খেলাফতের দাবীদাররা নিজেদের সপক্ষে যুক্তি-প্রমাণ খাড়া করে ইসলামের উপর তাদের অবদান তুলে ধরে। খেলাফতের দাবীতে মুহাজির এবং আনসাররা প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে সামনে আসে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না। সমস্যা জটিল ও গুরুতর পথে মোড় নিলে প্রথম সারির প্রবীণ সাহাবায়ে কেরাম দ্রুত সমস্যা নিরসনে উদ্যোগী হন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক তর্ক-বিতর্কের পর হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উপর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ন্যস্ত করে বলেন, তারা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে যাকে প্রথম খলিফা নির্বাচন করেন, সবাই যেন তাকে মেনে নেয়।
“মুহাজিরদের মধ্যে আপনি সর্বোত্তম”—হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু পরস্পর আলোচনা শেষে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে প্রথম খলীফা মনোনীত করে বলেন—“নবীজীর হিজরতের সঙ্গী আপনি। গুহায় আপনিই ছিলেন তার সাথে। রাসূলের অসুস্থকালীন সময়ে আপনিই তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে নামায পড়িয়েছেন। দ্বীনি আহকামের মাঝে নামাযের স্থান সর্বোর্ধ্বে। আমরা আপনার থেকে অধিক মর্যাদাবান আর কাউকে দেখি না। নিঃসন্দেহে আপনিই খেলাফতের সবচে উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব।”
একথা বলেই হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাত বাড়িয়ে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। এরপরে হযরত আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু, তারপর হযরত বশীর বিন সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইয়াত হন। এরপর সর্বসাধারণ্যে প্রথম খলীফা হিসেবে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নাম ঘোষণা করা হলে মানুষ দলে দলে তার হাতে বাইয়াত হওয়ার জন্য ছুটে আসে। মসজিদে নববীতে চলে সাধারণ বাইয়াত অনুষ্ঠান। খেলাফত লাভ করে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক জনগুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দান করেন। জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রথম ভাষণে ইসলামের সর্বপ্রথম খলীফা হযরত আবু বকর ছিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
প্রিয়, দেশবাসী! আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, খেলাফতের পদে আসীন হওয়ার আগ্রহ আমার কখনো ছিল না। অন্তরে অন্তরে কিংবা প্রকাশ্যে এর জন্য কখনো আল্লাহর কাছে দু’আ করিনি। কিন্তু শুধু এ কারণে এ গুরুভার নিজ দুর্বল কাঁধে বহন করেছি যেন মতবিরোধ বিবাদের রূপ পরিগ্রহ না করে। নতুবা এটাই বাস্তব কথা যে, খেলাফত এবং শাসনকার্য উপভোগ করার মত কোন বিষয় নয়। এটা এমন এক ভারী বোঝা যা বহন করার শক্তি আমার কম। আল্লাহ পাকের সাহায্য ছাড়া এ বোঝা বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনারা আমাকে আমীর বানিয়েছেন। আমি আপনাদের থেকে উত্তম এবং মর্যাদাবান নই। কোন ভাল ও জনহিতকর কাজের উদ্যোগ নিলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। পক্ষান্তরে কোন অন্যায় ও জনক্ষতিকর পদক্ষেপ নিলে আমাকে বাঁধা দিবেন। যারা অসহায়-নিঃস্ব তাদের ন্যায্য পাওনা আমি পূর্ণমাত্রায় আদায় করব। তাদের অসহায়ত্ব ঘুচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হবে। পক্ষান্তরে যারা সচ্ছল তারা ন্যায্য হক ছাড়া কিছু পাবে না। আমি আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চললে আপনারা আমাকে মেনে চলবেন। কখনো বিপথগামী হলে আমাকে বর্জন করবেন।”
হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হয়ে সর্বপ্রথম যে নির্দেশ জারী করেন, তাতে সবাই চমকে ওঠে। সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে তিনি ঘোষণা করেন যে, হযরত উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনী অচিরেই রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে। কারণ, মদীনার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। আশে-পাশে শত্রুরা কিলবিল করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালে সকলের ডানা গজিয়েছিল। আর সে ডানায় ভর করে শত্রুরা উড়াল দিয়ে ইসলামের সাজানো বাগান লণ্ডভণ্ড ও তছনছ করে দিতে উন্মুখ ছিল। অপরদিকে রোমীয়দের সাথে যুদ্ধ ছিল এক বিরাট ও ঘোরতর যুদ্ধ। এরজন্য মুসলমানদের পূর্ণ শক্তি একত্রীকরণ ও বিপুল সমরায়োজনের প্রয়োজন ছিল। মুসলমানদের যথেষ্ট সমর শক্তি ছিল। ছিল সুসংঘটিত এবং দৃঢ়চেতা বিশাল এক বাহিনী। রোমীয়দের সাথে যুদ্ধের সম্ভাব্য রণাঙ্গন ছিল মদীনা হতে যোজন মাইল দূর। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমুদয় সৈন্য এত দূরে পাঠানো ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ মদীনার অবস্থা স্বাভাবিক ছিল না। অনেক গোত্র বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিল। মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে অনেকে সংঘটিতও হতে শুরু করে। ইহুদি-খ্রিস্টানরা অপতৎপরতায় আদাজল খেয়ে নামে। এ ছাড়া মিথ্যা নবুওয়াতের দাবীদাররা পৃথক পৃথক রণক্ষেত্র খুলেছিল। তোলাইহা বিশেষত মুসাইলামা কাজ্জাব রীতিমত এক উদ্বেগজনক সমরশক্তি রূপে আত্মপ্রকাশ করে। মোটকথা ইসলাম স্মরণকালের ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।
